প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পিনুর দেশনায়ক উপাধি নিয়ে যত বিতর্ক…..

সাইদুল ইসলাম, লন্ডন: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সিনিয়র সহ সভাপতি তারেক রহমান। যার ডাক নাম পিনু। ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর জন্ম নেয়া তারেক সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দম্পত্তির জৈষ্ঠ সন্তান। যিনি সম্পূর্ণ পারিবারিক পরিচয়ে ১৯৯১ সালে বগুড়া বিএনপির সদস্য হয়ে রাজনীতিতে আসেন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতায় আসলে ২০০২ সালে অনেক যোগ্য, ত্যাগী ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নেতাকে টপকিয়ে একলাফে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বনে যান। এ নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তুষ্টি থাকলেও ভয়ে মুখ খুলেনি কেউ। তবে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামি লীগের পক্ষ থেকে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনা হয়। ২০০৯ সালে দলের জাতীয় কাউন্সিলে নিজের অনুপস্থিতিতে হয়ে যান বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। গত বছরের ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদণ্ড হলে দীর্ঘ ১১ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা তারেক রহমান দায়িত্ব নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের। এই হলো তাঁর সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক পরিচিতি।

কিন্তু সব কিছু চাপিয়ে মি. রহমানকে দলীয় সভা-সেমিনার, বক্তব্য-বিবৃতি, ব্যানার, ফেস্টুন, পোষ্টার ও প্রচারপত্রে দেশনায়ক বলে সম্বোধন করা হয়। এমনকি একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেও কিছু অতি উৎসাহী নেতা কর্মী তাকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলে আখ্যায়িত করতেন। কিন্তু কবে থেকে, কে তারেক রহমানকে দেশনায়ক উপাধি দিলেন, তার কোন সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কিংবা কি কারনে তাকে এমন উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে তারও কোন যুক্তিসংগত তথ্য নেই। দেশ, জাতি কিংবা নিজ দলের জন্য অনুকরণীয় ও নায়কোচিত এমন কি দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন যে, তাকে দেশনায়ক উপাধি দিতে হয়েছে?

অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনিই একমাত্র সৌভাগ্যবান ব্যাক্তি, যার বাবা প্রসিডেন্ট ও মা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তীর্যক তীর সবসময় তার দিকেই। সরকারের কেউ না হয়েও ২০০১ সালের পর হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক সরকারের বিকল্প ছায়া সরকার গড়ে তোলার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আজ পর্যন্ত এই অভিযোগের কোন সদুত্তর তার কোন বক্তব্য বিবৃতিতে পাওয়া যায়নি। দলীয় রাজনীতিতে হটকারি সিদ্ধান্ত, জাতীয় নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য, ইতিহাস বিকৃতির কারনে আজ তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি সংকটের মুখে। কথিত আছে, তারেক রহমানের কারনেই আজ তার মা বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীন। তিনি রাজনীতিতে কর্তৃত্বপরায়ন হওয়ার পর থেকে বিএনপির রাজনীতি দিন দিন অধঃপতনের দিকে। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন বানিজ্যের অভিযোগ খোদ তার দলের ভেতর থেকেই উত্তাপিত হয়েছে।

অন্য দিকে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করা খোদ তার দল বিএনপিতেই গণতন্ত্র অনুপস্থিত। এমনকি তিনি নিজে দীর্ঘ ১১ বছর থেকে লন্ডনে থাকাবস্থায়ও বাংলাদেশের জেলা কমিটির সমমানের যুক্তরাজ্য বিএনপিতে একটি নির্বাচিত কমিটি দিতে পারেননি। এখানে তিনি শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র ও রুচিশীল নেতাদের উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত অর্ধ শিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির হোতা, কিংবা মদ চোর রকমের টাউট বাটপার লোকগুলোকে নেতৃত্বে নিয়ে এসেছেন সম্পূর্ণ তার নিজের পছন্দে। যুবদলের নির্বাচিত একটি কমিটি তার মনপুত না হওয়ায় তিনি বাতিল করে দিয়েছেন।

তারেক রহমানের দেশনায়ক উপাধি বিষয়ে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেকের কাছে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি উত্তেজিত হয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে অশালীন আচরন করলেও পরবর্তীতে ক্ষমা চান। তিনি বলেন তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে আসার পর থেকে আমরা উনাকে দেশনায়ক বলে থাকি। তবে দেশনায়ক বলা বিষয়ে তিনি জিয়াউর রহমান ও খালদা জিয়ার ছেলে ছাড়া অন্য কোন ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। সাধারণ সম্পাদক কয়সর আহমেদ এর কাছে কবে এবং কেন তারেক রহমানকে দেশনায়ক উপাধি দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি জানিনা, তবে বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ভাই ভালো বলতে পারবেন। কারন তিনিই এই উপাধিটা দিয়েছিলেন।”

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলামের কাছে এই প্রতিবেদক ফোন দিলে তিনি বলেন, আমি সঠিক বলতে পারবো না কবে দেওয়া হয়েছিল, ধারনা করছি উনার ৪৮ তম বা ৫০ তম জন্মদিনে দেওয়া হয়েছিল এবং আমিই তাকে দেশনায়ক উপাধি দিয়েছিলাম। কেন তাকে দেশনায়ক উপাধিতে ভূষিত করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনি একজন স্বাধীনতার ঘোষক, একজন রাষ্ট্রপতি ও একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে। তাছাড়া তিনি রাজনীতিকে তৃণমূলে বিস্তৃত করেছিলেন এবং তৃণমূলের রাজনীতির ধারণা তিনিই শুরু করেছিলেন। এছাড়া তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ জন্যই আমি উনাকে দেশনায়ক বলে সম্বোধন করেছি ।

বিএনপির কেন্দ্রীয় একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি মনে করিনা যে তারেক রহমান দেশনায়ক উপাধি পাওয়ার মত কোন কিছু অর্জন করেছেন। আমি আমার বক্তৃতা বিবৃতিতে এই শব্দটা উচ্চারণও করি না।

ছাত্রদলের সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক নসরুল্লাহ খান দাবি করেছেন যে, এই উপাধিটি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিয়েছেন। তবে কবে ও কেন দিয়েছেন তা তিনি জানেন না।

বিএনপির হয়ে বৃটিশ পার্লামেন্টের বিভিন্ন সদস্য ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে লবিং করেন এমন একজন ব্যাক্তি এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর, তাই এ ব্যাপারে অনেকেই মুখ খুলবে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত