প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ছুটে পালানোর উপায়ও ছিল না, মুহূর্তে পুড়ে ছাই

ডেস্ক রিপোর্ট : কুচকুচে অন্ধকারে ভবন থেকে আগুনের মুহুর্মুহু ঝলকানি। দ্রুম, দ্রুম আওয়াজ। মনে হচ্ছিল ভবনের ভেতর থেকে কেউ বোমা ফোটাচ্ছে। আগুনের শিখা দেখে বিকট আওয়াজ শুনে নাসির উদ্দিন কেঁদে উঠে বলছিলেন, ‘আমার ভাই আলমগীর কী ওই আগুনে জ্বলছে?’

নাসিরের পানের দোকান চকবাজারের চুড়িহাট্টার গলিতেই। নিজের দোকানে বসেছিলেন। হঠাৎ বিকট আওয়াজ শোনেন। দোকানের সামনে দেখেন আগুনের কুণ্ডলী। প্রাণ বাঁচাতে দোকান খোলা রেখে দেন দৌড়। পেছনে ফিরে দেখেন রাস্তায় জ্বলছে আগুন, ভবনে আগুনের লেলিহান শিখা। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল এক ভবন থেকে আরেক ভবনে।

নাসিরের মতো চুড়িহাট্টার গলির মুখে কেঁদে চলছিলেন আরও অনেকে। কাজ শেষে দুই ভাই নাজমুল আর এনামুল দুই রিকশায় করে চুড়িহাট্টা গলি হয়ে বাসায় ফিরছিলেন। আগে ছিল নাজমুলের রিকশা, পেছনে এনামুলের। গলির যানজট ঠেলে কিছু দূর যেতেই নাজমুল শোনেন প্রচণ্ড আওয়াজ। পেছনে ফিরে দেখেন রাস্তায় আগুনের কুণ্ডলী। জ্বলছে রিকশা, জ্বলছে গাড়ি, জ্বলছে ভবন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, বুধবার রাত ১০টার দিকে চুড়িহাট্টা গলির মসজিদের সামনে ছিল যানজট। গলিতে মুখোমুখি দুটি হোটেল। নাম রাজমহল ও আনাস। বুধবার সকাল থেকে গ্যাস না থাকায় ওই দুটি খাবার হোটেলে স্থানীয়দের ভিড় ছিল। রাজমহল হোটেলের গা ঘেঁষে ওয়াহেদ ম্যানশন। এর সামনে রাখা ছিল একটি পিকআপ, তাতে ছিল গ্যাস সিলিন্ডার।

স্থানীয় বাসিন্দা শামসুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বুধবার রাত সাড়ে ১০টার পর পিকআপের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। আগুনের গোলা গিয়ে পড়ে ওয়াহিদ ম্যানশনের রাসায়নিক দোকানে। ৫ সেকেন্ডের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে সব ভবনে। বুধবার দিবাগত রাতে ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত ১০ জন ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে একই কথা বলেন।

চুড়িহাট্টায় আগুন লাগার সাত ঘণ্টার মাথায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

লাশ খুঁজে বের করা
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বুধবার রাতেই জানানো হয়, আগুন লাগার খবর তাঁরা পেয়েছিল রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে। খবর পাওয়ার পর একমুহূর্ত দেরি না করে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট চুড়িহাট্টার গলির মুখে চলে আসে। ততক্ষণে আগুনের শিখা ভবন থেকে ভবনে ছড়িয়ে পড়ছে। চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে চুড়িহাট্টা গলির দুই পাশের সড়কে স্থানীয় লোকজন ভিড় করেছেন।

রাত ১টার সময় ঘটনাস্থলে গেলে চকবাজার থানা-পুলিশের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানালেন, ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ আকারে আগুন লেগেছে। পাশের আরও চারটি ভবনে আগুন জ্বলছে। আগুন লাগার পর বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় সেখানে সৃষ্টি হয় ভুতুড়ে পরিবেশ। ওয়াহেদ ম্যানশনের আনুমানিক ২০০ হাত দূর থেকে তিনি দেখেন, ভবনের জানালা দিয়ে আগুনের ফুলকি, আর শোনা যাচ্ছিল দ্রুম দ্রুম আওয়াজ। লোকজন বলাবলি করছিল, ভবনে রাখা বডি স্প্রের কৌটা আগুন পেয়ে বোমার মতো ফুটছে। আগুন লাগা ভবনগুলোর চারপাশে পুলিশের সতর্ক পাহারা।

রাত দেড়টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইব্রাহীম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওয়াহেদ ম্যানশনে কোনো লোক আটকা পড়েনি। সবাই বের হয়েছেন।’ তবে সেখানে উপস্থিত স্থানীয়রা বলছিলেন, ‘অনেক লোক আগুনে পুড়ে মারা গেছে।’

আগুন লাগা ভবনগুলোর জানালা দিয়ে লাল আভা দেখে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই আগুন অন্য ভবনে ছড়িয়ে পড়ে কি না। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আগুনের লাল আভা কমে আসতে থাকে। বাড়তে থাকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী।

রাত তখন সাড়ে ৩টা। ওয়াহেদ ম্যানশনে আগুনের চেয়ে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল বেশি। ওই ভবনের কাছাকাছি গিয়ে দেখা যায়, রাস্তায় পিকআপ, মোটরসাইকেল, রিকশা পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে টর্চের আলো ফেলে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় লোকজন এই দৃশ্য দেখে বলতে থাকেন, লাশ খুঁজছে ফায়ার সার্ভিস। এরপর রাস্তায় গাড়ির স্তূপ থেকে, রাসায়নিক দোকান, ওষুধ ফার্মেসির ভেতর থেকে একে একে লাশ বের করে নিয়ে যেতে থাকেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আনাস হোটেলের পাশে একটি ওষুধের ফার্মেসি। সেখান থেকে অন্তত পাঁচটি লাশ বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাজমহল হোটেলের পাশের বাড়িওয়ালা আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আহা রে, লোকগুলো সব পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। ওরা কেউ বের হতে পারেনি।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাইফুল বলেন, ওয়াহেদ ভবনের সামনের হায়দার ফার্মেসির মালিক হায়দারের বাড়ি নোয়াখালী। আগুনে পুড়ে দোকানেই মারা গেছেন তিনি। সাইফুলসহ আরও কয়েকজন জানান, নিহত ব্যক্তিদের অনেকের বাড়িই নোয়াখালী। চকবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা একই কথা বলেন।

টর্চের আলোয় দেখা গেল, আগুনে পুড়ে ওয়াহেদ ম্যানশনের দেয়াল রাস্তায় ধসে পড়েছে। এর উল্টো দিকে আনাস হোটেলের ভবনের সামনের অংশও খসে পড়েছে। ধসে পড়া পিলারের ইটের তলে পুড়ে যাওয়া মৃত লাশ খুঁজে বের করতে থাকেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। দূর থেকে লাশ বের করার এমন দৃশ্য দেখে অনেকে চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন। এমন সময় সেখানে আসেন স্থানীয় সাংসদ হাজি সেলিম। ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে গেলে তাঁর সঙ্গীরা বলতে থাকেন, ‘স্যার, এখান থেকে চলেন, যেকোনো সময় ভবন ভেঙে পড়তে পারে।’

ঠিক এমন সময় চুড়িহাট্টা গলির পূর্ব দিকের রাস্তার লোকজন জোরেশোরে বলাবলি করতে থাকেন, ‘আরে, ওই ভবনেও তো আগুন লেগেছে।’ তখন সেখান থেকে দ্রুত চলে যান হাজি সেলিম। দেখা যায়, ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে আগুনের আভা আসছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা চলে আসেন। তখন স্থানীয় লোকজনের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। বাড়ির গেটে গেটে জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে অনেকে বলতে থাকেন, ‘বাড়িতে কেউ থাকলে বের হয়ে আসেন।’

আতঙ্কিত লোকেরা গলি দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে থাকেন। তখন আবারও ওয়াহেদ ম্যানশনের আশপাশ থেকে বিকট আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। চকবাজার মোড়ে অবস্থান করা লোকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

দিনের আলোয় দুঃখ দেখা
ফজরের আজানের পর চকবাজারের স্থানীয় লোকজন দলে দলে চুড়িহাট্টার গলির মুখে ছুটে আসতে থাকেন। পুলিশ, র‍্যাবের সতর্ক পাহারায় নিরাপদ দূরত্বে উৎসুক জনতার ভিড় বাড়তে থাকে। তখনো ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় আগুনের হালকা শিখা দেখা যায়।

ভোরের আলোয় দেখা যায়, চুড়িহাট্টার গলির বীভৎস দৃশ্য। রাস্তায় পুড়ে কয়লা হয়ে পড়ে আছে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, পিকআপ, ঠেলাগাড়ি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আবার লাশের খোঁজ শুরু করেন। প্রথমে মসজিদের পশ্চিম পাশের গলির সড়ক রিকশা, ভ্যানের স্তূপ থেকে একে একে লাশ খুঁজে বের করে নিয়ে যেতে থাকেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

রাস্তায় লাশ খোঁজা শেষ হলে ওয়াহেদ ম্যানশনের পশ্চিম অংশের সামনে থেকে ফার্মেসির দোকান থেকে লাশ বের করা হয়। এই ফার্মেসির উল্টো দিকে ডেকোরেটর দোকান। দোকানের শাটার ছিল আটকানো। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এই দোকান থেকে অন্তত সাতটি লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

এর আগে দোকানের সামনে বাবার লাশ খুঁজতে আসেন আসিফ নামের এক যুবক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বাবা গতকাল রাতে এই দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কিংবা মিটফোর্ড সব হাসপাতালে গিয়েছি, কিন্তু বাবাকে খুঁজে পাইনি।’

লাশ খুঁজে বের করার সময় ফায়ার সার্ভিসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা র‍্যাব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘ওরা মানুষ না। বাসায় বাসায় কেমিক্যালের গোডাউন।’

সকালে দেখা যায়, রাস্তাজুড়ে পড়ে আছে বডি স্প্রের কৌটা। আর ওয়াহেদ ম্যানশনের ভেতরের দোকানগুলোতে দেখা গেল, রাসায়নিক উপাদান। এর রং সাদা।

যানজট ও হঠাৎ আগুনের কুণ্ডলী
সময় তখন সকাল সাড়ে ৮টা। ওয়াহেদ ম্যানশনের ছাদ থেকে উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কর্মকর্তাকে বলতে থাকেন, ‘ওপরে কোনো লাশ নেই।’ তখন নিচে থাকা কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার, তার মানে ওপরে লাশ নেই, সেটাই আপনি বলছেন?’
চুড়িহাট্টার গলিতে পুড়ে যাওয়া যানবাহন দেখে স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, বিকট আওয়াজ হওয়ার পর সেকেন্ডের মধ্যেই আগুন এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে প্রায় সবাই হতাহত হন।

আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া সার্জেন্ট তৈয়েবুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেকেন্ডের মধ্যে এমনভাবে আগুনের কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে, তা না দেখলে কাউকে বিশ্বাস করানো যাবে না। ভাগ্যগুণে আমি বেঁচে গেছি।’

লাশগুলো পড়ে ছিল রাস্তায় যানবাহনের ধ্বংসস্তূপে। এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয় বাসিন্দা আতাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, যে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যে যে গাড়িতে ছিলেন, তিনি সেখানেই আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছেন।

রাস্তায় ধসে পড়েছে বিদ্যুতের খুঁটি, বিদ্যুতের মোটা তার।

ওয়াহেদ ম্যানশনের এই ডেকোরেটরের কক্ষ থেকে কয়েকটি লাশ উদ্ধার করা হয়। ছবি: আসাদুজ্জামান
ওয়াহেদ ম্যানশনের এই ডেকোরেটরের কক্ষ থেকে কয়েকটি লাশ উদ্ধার করা হয়। ছবি: আসাদুজ্জামান
আর কবে শিক্ষা হবে?
রাত ৪টার পর আগুন নিয়ে যখন আতঙ্কিত চকবাজারের লোকজন তখন চকবাজার মোড়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বেলাল হোসেন। সত্তর বছর বয়স্ক বেলাল বললেন, ‘আমাদের দোষে আমরা মরছি। আগেও পুরান ঢাকার মানুষ কেমিক্যালের আগুনে পুড়ে মরেছে। শিক্ষা হয়নি।’

প্রায় ৯ বছর আগে নিমতলীতে রাসায়নিকের আগুনে প্রাণ যায় ১২৪ জনের। চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুন দেখে রাতভর লোকে বেলালের মতো বলতে থাকেন, নিমতলীর আগুন থেকে শিক্ষা নিলে আজ এমন অবস্থা হতো না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত