প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গহন অগ্নিতে পোড়া অসীম সাহার রতিতৃপ্ত কবিতা

মেঘনাদ ঘোষাল : বাংলাদেশের ষাটের দশকের প্রতিনিধি স্থানীয় কবি অসীম সাহা কবিতার এই শরীরী বিন্যাস ও নান্দনিক অনুশীলনে একনিষ্ঠ। তিনি ষাটের দশকের কবি হয়েও এখনো সমান দক্ষতায় নিরলসভাবে কবিতা লিখে চলেছেন। কবিতার এই নান্দনিক পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের একটি দর্শনও রয়েছে। এই দর্শনের দ্বারা চালিত হয়ে তিনি রাষ্ট্রের বিপর্যয় ও পারিপার্শ্বিক, আর্থিক, সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যেও অযথা উত্তেজিত না হয়ে সৌন্দর্যবোধের মার্জিত বিন্যাসে অন্তরকে নিষ্ঠ রাখেন। নেতিবাদের নৈরাশ্যে আবার কবির অন্তর্লোক সেই অন্ধকারেই দেখেন আনন্দের ফুল ফুটছে। শুনছেন রূপ-অরূপের উদয়-অস্তের নানা সুরের আবহ। এই নানান স্বরের ও সুরের, সঙ্গোপন স্নিগ্ধ অনুভূতি প্রকাশের বাসনাকে কবি সেই স্নিগ্ধ কুটিরে বসে বুনতে থাকেন। বাসনার এই অব্যক্ত বুননকে ব্যক্ত করার জন্যে রূপদক্ষ কবি ছন্দের আশ্রয় নেন, আর এই কাজে কবিকে নিয়ত আলো দেখায় তাঁর ভেতরকার প্রদীপের স্নিগ্ধ সলতের মতো উসকে দেওয়া মানবিকতা। তাতেই তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ মনোরম। সৌন্দর্যের কুটিরে পঞ্চেন্দ্রিয়ের আস্বাদনে তাঁর মন কখনো স্নিগ্ধ প্রজাপতি হয়ে মধু সংগ্রহের লীলায় নিজের সৃষ্টিকে লীলায়িত করে, আবার কখনো পলাতক মৌমাছি হতে চায়। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সখ্য গড়ে তোলার এই ব্যাকুলতা থেকেই তাঁর কবিমন স্নিগ্ধ প্রজাপতি হতে চায়। একটু তলিয়ে দেখলে তাঁর কবিতার বিশেষত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। প্রেমেন্দ্র মিত্র চেয়েছিলেন সুদূরের আহ্বানে সাড়া দিতে, সমর সেন তাঁর নাগরিক কৃত্রিম জীবনের গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে কৃষ্ণচূড়ার চকিত রূপের স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু অসীম সাহা এক পলাতক মৌমাছি হয়ে শীতের মৌসুম ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন নিজস্ব শহর থেকে একা একা অন্ধকারে।
এই অন্ধকার স্মৃতির ভেতর অতলস্পর্শ গভীরতায় নিহিত পাতাল-ছায়ায় ঘেরা স্নিগ্ধতার মধ্যেই আলো-অন্ধকারের বৈপরীত্যেরই নিত্যলীলা চলছে। কবিতা-শরীর সেই অধরা মাধুরীর লীলাকে আত্মস্থ করে বৃক্ষের স্বভাবে ধাতস্থ হয়েছে মিশ্রবৃত্ত ছন্দে মুক্তকের স্পন্দনে। তবে এই শিকড় প্রত্যাশী কবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিসর্গ-চেতনা থেকে রসদ নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর নিজস্ব দার্শনিকতাবোধে পল্লীবাঙলার নিসর্গ প্রকৃতি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে উপমা অলংকারের আশ্চর্য ব্যবহারে।
কবির নিভৃতচারী মন কিন্তু রাজনৈতিক চেতনায় তীক্ষè, তাই অন্তরের নিভৃত বসতিতে থেকেও তিনি অনুভব করেন একটি সাপ দুশো বছর ধরে কবির ঘরের সামনে ফণা তুলে রয়েছে। সাপভ্রষ্ট অজগরের মতো সেই সাপটিকেই অনেকে মহামান্য অতিথির মতো কুর্নিশ করছে। ‘সাপ’ কবিতায় রূপকের মধ্য দিয়ে কবির সেই রাজনৈতিক অবক্ষয়জনিত যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে।
মানুষের শরীরে সাপের বিষ ঢুকলে সেই বিষরক্ত বের করে দিতে হয় যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাবার জন্য। রাজনীতির অজগরের বিষাক্ত ছোবলে সমাজশরীরে রক্তের ভেতর শুরু হয়েছে বিষক্রিয়া। কবি সেই বিষরক্ত বের করে সমাজকে শিশুর বাসযোগ্য করতে চান।
তিনি যুদ্ধ-বিপর্যয়ের বিরোধী। কিন্তু দুর্নীতি-জর্জরিত সমাজের নিরাময়ের জন্যে ন্যায়যুদ্ধে রক্ত ঝরাবার প্রয়োজনকে তিনি স্বীকার না করে পারেন না। কিন্তু তিনি মনে করেন ন্যায়যুদ্ধে শিল্পই একমাত্র অস্ত্র। তাই এই যুদ্ধের জন্য স্বপ্ন ও সত্যের শাশ্বত রসটুকু নিংড়ে নিংড়ে গড়ে তোলেন তাঁর নিজস্ব অস্ত্রাগার, যেখানে চলে যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি। গদ্য-পদ্য ছন্দের অতিনিরূপিত বিন্যাসের সঙ্গে গদ্যছন্দের অনিয়ন্ত্রিত যতির সংস্থাপনের সমন্বয়ে সেই প্রস্তুতিতে শব্দরা আরও বেঁধে বেঁধে তৈরি হয় একে অন্যের বদান্যতায়।
এই পৃথিবীর প্রাত্যহিক জীবনে মানবতাহীন কর্কশ ঘৃণ্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় কবিকে প্রত্যহ। তবুও কবি অনন্তকে ভুলে এই পৃথিবীর মধ্যেই থেকে যেতে চান প্রকৃতির নিবিড় সখ্যে। সামনের শূন্যতার নৈরাশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কবি প্রাণভরে নিয়ে নেন নদীর বিশুদ্ধ বাতাস।
বাংলা পদ্যছন্দের মিশ্রবৃত্ত, কলাবৃত্ত ও দলবৃত্ত এই তিন রীতির ছন্দের ব্যবহারে তাঁর দক্ষতা যেমন কবিতাকে সংযত মার্জিত স্থিরতা দিয়েছে, তেমনই গদ্যছন্দে রূপকল্পের ও উপমার ব্যবহারে তাঁর কবিতা স্বতন্ত্র। পদ্যছন্দের তিন রীতির মধ্যে কলাবৃত্ত ছন্দের মুক্তক বন্ধেই তিনি সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছেন। মিশ্রবৃত্ত ও দলবৃত্তের তুলনায় কলাবৃত্ত ছন্দের মধ্যম লয়ের স্পন্দনেই তিনি অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন।
প্রথম কাব্য ‘পূর্ব পৃথিবীর অস্থির জ্যোৎস্নায়’-তে কলাবৃত্ত ছন্দের প্রয়োগ বেশি থাকলেও দলবৃত্তের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়। এই কাব্যের ‘দৃষ্টি’ কবিতাটি দলবৃত্তের সমমাত্রিক ৪/৪/২ বিন্যাসে রচিত। তবে তার প্রেম ক্লাসিক সংহতি পায় নারীর শরীরী রূপের প্রতœরূপায়ণে। কামুক অস্থিরতা শিল্পীত ক্লাসিক দৃঢ়তা পায় প্রতœরূপকল্পের নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রচ্ছায়ায়।
প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে, স্থাপত্যের শরীর থেকে তাঁর কবিতা-মৌমাছিরা খুঁজে ফেরে শৃঙ্গারের রসদ। কিন্তু দেশে অবক্ষয় আর রাজনৈতিক নেতাদের উন্মাদনায় যখন স্থাপত্য ধ্বংসপ্রাপ্ত, তখন কবি ফিরে আসেন তাঁর হৃদয়ের অপরূপ আবাসে মানবিকতার স্নিগ্ধ আকুলতা নিয়ে মোড়া বাসনার কাছে। তারই সঙ্গে রাত্রিবাসে রতিক্লান্ত মৌমাছি-মন অনুভব করে সূর্যের প্রবল তেজে কামনা-কম্পিত দেহের উর্ধ্বমুখ স্তনের সকাল। এই বৈপরীত্য জীবনে সংহতি পায় মিশ্রবৃত্তের ছান্দিক স্পন্দনে।
কবিতাটি মিশ্রবৃত্ত ছন্দের ধীর লয়ের মুক্তকের বিন্যাসে রচিত। কবিতাশরীরে অন্তঃমিল নেই, প্রতœসম্পদ বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গতি রেখেই কবিতা শরীরে এসেছে ভাঙনের আদল। কবি অসীম সাহা কবিতায় দেশি-বিদেশি পুরাণ, পুরাণ-কল্প, ইতিহাস, ও লোককথার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নানান-উপকাহিনীর চূর্ণকে আশ্চর্য উত্তেজে সম্পৃক্ত করে নেন আশাবাদী প্রত্যাশায়। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিদিব্যতা থেকে যে ক্রমমুক্তির আকাক্সক্ষার ঢেউয়ে বাঙালির চেতনাকে ধনতান্ত্রিক সুনিয়ম ও সুকৃতির পথে চালিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বৈজ্ঞানিক প্রবর্তনার পথেই মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তনের সম্ভাব্যতায় তিনি আস্থাশীল। তাই বিপন্নতাবোধ তার অন্তরকে আলোড়িত করলেও খড়কুটোর মতো তিনি আঁকড়ে ধরতে চান, আরও কিছুকাল কাটিয়ে যেতে চান এই পৃথিবীতে। সেই আর্তি প্রকাশ পেয়েছে অসীম সাহার ‘সতর্ক-সংকেত’ কবিতায়ও।
ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকেন যা কবি পারেন না, কিন্তু কেন ? ‘দেহের খোলস’ নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থ কী ? এই শ্বাপদশঙ্কুল পৃথিবীতে কবিকে নিরুপায় বেঁচে থাকার জন্য নয় বরং জৈব অস্তিত্বকে কোনক্রমে টিকিয়ে রাখার জন্য বারে বারে খোলস ত্যাগ করতে হয়। কবি দেখেছেন তারই ঘরের দরজার পাশে দুশো বছর ধরে একটা সাপ সেভাবেই বেঁচে আছে। তার খোলশের আড়াল তাকে এনে দিতে পারে ফল-অর্থ প্রভাব-প্রতিপত্তি, যা খোলসহীন জীবনযাপনে সম্ভব নয়। আর তাই খোলশের আবরণে থেকেই তিনি পৌঁছে যান প্রার্থিত বন্দরে। তবু তিনি কবি। তাই আত্মসমালোচনায় দগ্ধ হতে থাকেন ভেতরে ভেতরে। কারণ যে স্নিগ্ধ প্রদীপের সলতের ন্যায় চেতনাকে তিনি সঙ্গোপনে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন তা কুটিল ফনা হয়ে জন্ম দেয় এক বিষময় অস্থিরতার; আর তখনই তার চিরচেনা মাটি অচেনা হয়ে যায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত