প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস, দেশের সর্বোচ্চ করদাতা এলাকার জনগণের

আসিফুজ্জামান পৃথিল : পুরান ঢাকা নিজের বুকে শুধু শতশত বছরের ঐতিহ্যই লালন করে না, বুকে ধারণ করে রেখেছে হাজারো উৎপাদনমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন শত কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। সৃষ্টি হয়েছে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। লালবাগ, বংশাল, চকবাজার আর কোতোয়ালি এই ৪ থানা থেকে সরকারের আদায়কৃত কর এবং মূসকের পরিমাণ দেশের যে কোন অঞ্চল থেকে বেশি। কিন্তু পুরান ঢাকার জনগণ প্রচুর কর দেওয়ার পরেও অধিকাংশ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অপরিসর রাস্তা, মাথার উপর বৈদ্যুতিক তারের জঙ্গল আর বোমা সদৃশ কেমিক্যাল জারকিন, এই নিয়েই বসবাস তাঁদের। সামান্য স্ফুলিঙ্গও তাদের জন্য মৃত্যুবান নিয়ে আসে। এভাবেই জীবন চলে, চলে পণ্যের উৎপাদন আর চলে কর প্রদান করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ।

বুধবার রাতে যখন চুরিহাট্টা মসজিদের পাশের ভবনে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ে, স্থানীয়রা বুঝতে পেরেছিলেন রাতটা তাদের নির্ঘুম যাবে। পরদিনের ছুটির সকালটা তাদের জন্য কোন সুখবর বয়ে নিয়ে আসবে না। কারণ, চুরিহাট্টা, উর্দু রোড, চাঁদনি ঘাট আর লালবাগ রোডের প্রায় প্রতিটি ভবনেই বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য মজুদ থাকে। এই এলাকায় মূলত রয়েছে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন পিভিসি, ইভা দানা আর সিলিকনের গুদাম। রয়েছে প্লাস্টিক সামগ্রী উৎপাদনের বেশকিছু কারখানা। সিলিকন প্রচ- দাহ্য পদার্থ। আর এই দাহ্য তরলটি রাখা হয় প্লাস্টিকের জারকিনে। ইভা আর পিভিসি ধিকিধিকি ধিকি জ্বলে আর প্রচুর ধোঁয়া উৎপাদন করে। স্থানীয়রা জানতেন আরেকটি লাশের মিছিল দেখতে হবে। রাতেই কথা হয়, মকিম কাটারার নিবাসী স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ তোতা মিয়ার সঙ্গে। তোতা মিয়া জানিয়েছেন, প্রতি মুহুর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে তাকে। স্থানীয়দের অগ্নি সতকর্তা আর অগ্নি নির্বাপনের সাধারণ কোন জ্ঞানই নেই। এ কারণে তারা সাধারণ কোন সতর্কতাও অবলম্বন করেন না। সাধারণ কয়েল, সিগারেট বা ছোট্ট শর্টসার্কিট থেকেও আগুন লেগে যায়। আর কোন ভবনেই দাহ্য বস্তুর অভাব নেই। তোতা মিয়া বলেন, ‘আমরা স্ত্রী সন্তান নিয়ে কতটা ঝুঁকির মধ্যে থাকি তা বলাই বাহুল্য। আমাদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। এই ঝুঁকি কিভাবে মোকাবেলা করবো সরকার থেকে কেউ এসে কখনই আমাদের জানায়নি। আমারা শুধু সেসব সরকারি কর্মকর্তাকেই দেখতে পাই যারা কর আদায় করতে আসেন।’

পুরান ঢাকায় কেমিক্যালের গুদাম সরানো প্রয়োজন তা কমবেশি সবারই জানা। উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন জানয়েছেন, গত সোমবারই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে রাসায়নিক বস্তুর গুদাম অপসারণ শুরু হয়েছিলো। অভিযান চলাকালেই ঘটলো এই মন্তানিক দূর্ঘটনা। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, পুরান ঢাকা থেকে সকল রাসায়নিক গুদাম অপসারণ করা হবেই। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান কতটুকু হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ রাসায়নিকই একমাত্র দাহ্য বস্তু নয়। চক সার্কুলার রোডের এক পাশে মৌলভীকবাজার, মকিম কাটারা আর বেগম বাজার জুরে রয়েছে মসলাজাত দ্রব্যের গুদাম। আগা নওয়াব দেউরি, বিকে রয় লেন আর বেচারাম দেউরি জুরে রয়েছে সারিসারি কার্টুন নির্মান কারখানা। নলগোলা, মিটফোর্ড জুরে রয়েছে প্লাস্টিক পণ্যের গুদাম। আরমানি টোলা আর বাবুবাজারে রয়েছে পারফিউম আর আতরের গুদাম। এর কোনটাই কম দাহ্য নয়। যদি গুদাম অপসারণকেই সমস্যার সমাধান বলে মনে করা হয়, তবে সব কারাখানা আর গুদাম অপসারণ করতে হবে। যা কার্যত অবাস্তব। এই এলাকার ব্যবসায়ী হাজী আবুল হোসেন মনে করেন, এই গুদাম অপসারণের ঘোষণার চাইতে পুরান ঢাকায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ আর রাস্তাঘাট সুপরিসর করা জরুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে প্রচুর পরিমাণ শুল্ক দেই। অথচ নাগরিক সুবিথা বলে কিছুই নেই। এই ধরণের দুর্ঘটনায় শুধু প্রানহানি ঘটে তাই নয়। সেই সঙ্গে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এই ক্ষতিও অপূরনীয়। আমাদের এখানে রাস্তাঘাটগুলো চওড়া করা অত্যন্ত জরুরী। প্রতিটি মোড়ে অগ্নি নির্বাপনের হাইড্রেন্ট নির্মান করতে হবে। অপসারণ করতে হবে বৈদ্যুতিক তার। আর সরকার যদি আমাদের ব্যবসা সরিয়ে নিতে চায়, সেটি সময়ের ব্যাপার। সেজন্য সবার আগে আমাদের ভালো কোন স্থানে পুর্ণবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’

পুরাতন ঢাকায় যেমন নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা জরুরী, ঠিক তেমনি জরুরী ব্যবসার নিশ্চয়তাও। এই এলাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে একে অবহেলা করার কোন সুযোগ নেই। ব্যবসার ক্ষতি না করে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা এখন পুরান ঢাকার মানুষের গণদাবি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত