প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পুরান ঢাকায় আগুনে আর কতো প্রাণ যাবে?

আশীষ কুমার দে : গোটা জাতি যখন শোক-বিহ্বল পরিবেশে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের শেষমুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখনই রাজধানী ঢাকায় ঘটে গেলো বড় ধরনের ট্রাজেডি। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার পুরানা ঢাকার চকবাজারে সংঘটিত হলো ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। ২০ ফেব্রুয়ারি ১০টার কিছুক্ষণ পর অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত ঘটলেও দমকল বাহিনী, পুলিশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় মানুষ আপ্রাণ চেষ্টা করে পরেরদিন (আজ) ভোরে তা নিয়ন্ত্রণে আনে। ততোক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। নিহতের সংখ্যা এক শ’র কাছাকাছি পৌঁছেছে; এছাড়া অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আরো অনেকে।

পুরানা ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। গতকাল চকবাজার থানার চুড়িহাট্টার নন্দ কুমার দত্ত লেনের রাজ্জাক ভবন ও তৎসংলগ্ন সড়কের এই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ নিমতলী ট্রাজেডির কথাই মনে করিয়ে দেয়। ২০১০ সালের ৩ জুনের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় রাসায়নিকের আগুনে জ্বলে উঠেছিল নিমতলী; যাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১২৪ জন। মুহূর্তেই ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়েছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটি। লাশগুলো চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। ঘনবসতিপূর্ণ ও ঘিঞ্জি অলিগলিতে ভরা এলাকায় রাসায়নিক ব্যবসা বা শিল্পকারখানা কতোটা বিপজ্জনক, মানুষ সাড়ে আট বছর আগেই তা দেখেছে। কিন্তু শিক্ষা হয়নি।

ওই দুর্ঘটনার পর পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ক্লাব অব বাংলাদেশ (জিসিবি), সিটিজেনস রাইট্স মুভমেন্ট (সিআরএম), পরিবেশসম্মত বাসযোগ্য ঢাকা বাস্তবায়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দ্রুত স্থানান্তরের জোর দাবি তুলেছিল। এছাড়া জিসিবি ও সিআরএম- এ সংগঠন দুটি প্রতিবছর নিমতলী ট্রাজেডির দিনে সেখানে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে একই দাবি জানিয়ে আসছে। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা চিহ্নিত করে সেগুলো পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে শেষপর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।

গতকাল নিমতলীর এক কিলোমিটারের মধ্যে চকবাজার চুড়িহাট্টার নন্দ কুমার দত্ত লেনের শাহী মসজিদের পাশের কয়েকটি ভবনে যে আগুন লাগে, তা ভয়াবহ রূপ নেওয়ার জন্য দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ গুদামকেই দায়ী করছেন স্থানীয়রাসহ দমকল বাহিনীর কর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য মতে, রাত ১০টার কিছুক্ষণ পর প্রথমে আগুন লাগে ওয়াহিদ চেয়ারম্যানের চারতলা ভবনে, তারপর পাশের আরো চারটি ভবনে তা ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াহিদ চেয়ারম্যানের ওই ভবনের নিচে ছিল দোকানপাট, দোতলাজুড়ে ছিল প্রসাধন সামগ্রিসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্যের গুদাম। আর ওপরের দুটি তলায় ছিল মানুষের বসবাস (সূত্র: বিডি নিউজ২৪.কম)।

নিমতলী ট্রাজেডির পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের তখনকার প্রতিবেদনগুলোতে জানা যায়, অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে দমকল বাহিনী দ্রুত আসলেও পুরান ঢাকার ওই ঘিঞ্জি এলাকায় তাদের গাড়িগুলো ঢুকতে পারছিল না। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয়েছিল দমকল বহিনীর সদস্যদের। প্লাস্টিক কারখানায় দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন লাফিয়ে বাড়তে থাকে তখন। আহতদের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছিল নিমতলীর বাতাস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিমতলীর ওই দুর্ঘটনায় আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন। ৫ জুন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল সরকার। সব হারানো তিনজন অসহায় মেয়েকে প্রধানমন্ত্রী নিজের মেয়ের মর্যাদা দিয়ে তাদের গণভবনে বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন (সূত্র: সমকাল অনলাইন, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)।

বুধবার চকবাজারের নন্দ কুমার দত্ত লেনের এই অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত কোথা থেকে- তা এখনও দমকল বাহিনীর বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ার জন্য রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ এবং আগুন নেভাতে বিলম্বের জন্য ঘনবসতি ও ঘিঞ্জি অলিগলিকেই দায়ী করেছেন তাঁরা। স্থানীয় হায়দার বক্স লেনের বাশার নামে এক বাসিন্দার বরাত দিয়ে বিডিনিউজ.২৪কমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুনের সময় রাজমনি হোটেলের সামনের রাস্তায় কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিল।

ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণের পর ওই গ্যাস সিলিন্ডারেও আগুন লেগে ভবনে ও রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. জাবেদ পাটোয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে অনেক কেমিক্যালের গোডাউন ছিল। তাছাড়া (বিভিন্ন দোকানে সরবরাহের জন্য) গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে একটি পিকআপও ছিল।” ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, রাসায়নিকসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন পুরোপুরি নেভাতে অনেক সময় লাগছে।

নিমতলী ট্রাজেডির পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে পুরান ঢাকায় ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা চিহ্নিত করা হয়েছিল। তখন সেগুলো স্থানান্তরের কথাও বলেছিল সরকার। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন দুই বছর আগে গুদামগুলো সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সে ঘোষণাও কার্যকর হয়নি। গতকাল চকবাজারে দুর্ঘটনাস্থলে এসে মেয়র সাঈদ খোকন জানান, তাঁর চেষ্টা থাকলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণে তিনি পারেননি। একটি প্রবাদ বাক্য আছে- ‘অন্ধ হলে তো আর প্রলয় বন্ধ হবে না’। বাক্যটি এখানে যথাযথভাবেই প্রযোজ্য।

রাসায়নিকের গুদাম সরাতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ নেই কিংবা তারা উদাসীন, তাই বলে কী দুর্ঘটনা ঘটবে না? বুধবার রাতের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ আবারো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যে, আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নেইনি।

সচেতন মানুষ পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ঘিঞ্জি এলাকায় বিপজ্জনক রাসায়নিকের গুদাম ও প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের কারখানা আর দেখতে চান না, এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না। আমরাও কোনো পিতৃহারা সন্তান কিংবা সন্তানহারা বাবা-মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, স্বামীহারা স্ত্রী বা স্ত্রীহারা স্বামীর গগণবিদারী আহাজারি, ভ্রাতৃহারা বোনের ক্রনন্দন শুনতে চাই না। তাই পুরান ঢাকার এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৮ বছরের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও দীর্ঘ লাশের মিছিলের পর সরকারকে আর হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। ব্যবসায়ীদের স্বার্থের চেয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে। এ কারণেই পুরান ঢাকার রাসায়নিকের গুদামগুলো জরুরি স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা দরকার। সকলের প্রত্যাশা- সরকার জনস্বার্থে সে কাজটিই দ্রুত করবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত