প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আর প্রধানমন্ত্রী হতে চান না শেখ হাসিনা

বিভুরঞ্জন সরকার : প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পঞ্চমবারের মতো দায়িত্ব নিতে চান না শেখ হাসিনা । সম্প্রতি ডয়েচে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার এই ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এর আগে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। টানা তৃতীয়বারসহ মোট চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন।

বাংলাদেশে এর আগে নির্বাচিত-অনির্বাচিত কোনো সরকারপ্রধানই এতো দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ক্ষমতার রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের দেশে প্রচলিত সব ধারণা ও বিশ্বাস ভুল প্রমাণ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। তার নেতৃতে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির পটপরিবর্তন হয়। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখার উদ্যোগ-আয়োজন চলে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেলখানার অভ্যন্তরে তার চার বিশ্বস্ত সহকর্মী, জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিলো আওয়ামী লীগকে দুর্বল করা, রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে রাখা।

দলের জন্য এক চরম দুঃসময়ে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেন এবং বলা যায়, তিনি কার্যত অসাধ্য সাধন করেন। আওয়ামী লীগকে আবার পুনর্গঠিত করা যাবে, শেখ মুজিবের অনুসারীরা আবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারবেন এটা ছিলো অনেকেরই ধারণার বাইরে, হিসাবের বাইরে। আওয়ামী লীগকে দুর্বল করার জন্য, ভাঙার জন্য, ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চললেও তা সফল হয়নি শেখ হাসিনার সাহস, দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতার কারণে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার এক বিরল গুণ আছে শেখ হাসিনার। তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন। অন্য সবাই যেটা অসম্ভব মনে করেন শেখ হাসিনা সেটাই সম্ভব করে তোলেন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায় ১৯৯৬ সালে।

বঙ্গবন্ধুর নাম বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র তা রুখে দেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় গিয়ে ইতিহাসের দায় শোধের কাজ শুরু করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখার দেশি-বিদেশি চক্রান্ত সফল হয়। শেখ হাসিনা বুঝতে পারেন কোন সুড়ঙ্গ দিয়ে বেনো জল ঢুকে নৌকাকে বিজয়ের ঘাটে পৌঁছতে দেয় না। তিনি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন। রাজনীতিতে তিনি শত্রু-মিত্র বাছাইয়ে সনাতনী পদ্ধতি পরিহার করেন। চিরদিনের শত্রু, চিরদিনের মিত্র এই চিরায়ত ধারণা থেকে তিনি বের হয়ে আসেন। তিনি তার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি পরবর্তী সময়ে তার কৌশল নির্ধারণ করতে থাকেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোকাবেলার এক অসামান্য দক্ষতা তিনি অর্জন করেছেন। আর তাই তিনি টানা তৃতীয়বার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

ডয়েচে ভেলেকে শেখ হাসিনা বলেছেন, এটা আমার টানা তৃতীয় মেয়াদ। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী হয়েছি। সব মিলিয়ে চতুর্থবার। আমি আর চাই না। তিনি আরো বলেছেন, একটা সময়ে এসে সবারই বিরতি নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি, যেন তরুণ প্রজন্মের জন্য জায়গা করে দেয়া যেতে পারে। এর আগে দলের একটি বৈঠকে শেখ হাসিনা অবসরকালে গ্রামে গিয়ে কাটানোর কথা বলেছেন। এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে, শেখ হাসিনা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে শুরু করেছেন। তবে শেখ হাসিনার জীবন এখন শুধু তার একার নয়। তিনি এখন সবার। তাই তিনি একা কোনো পরিকল্পনা করলে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি এখন একা নন। তার দল আছে। আছে দলের কর্মী-সমর্থক। এর বাইরে আছে তার এক বিরাট ব্যক্তিগত সমর্থক গোষ্ঠী। এরা তার, তিনি সবার। কাজেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সবার কথা ভেবে, সবাইকে নিয়ে।

তিনি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগতভাবে নেবেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি যখন নেত্রী তখন তার সিদ্ধান্ত হতে হবে জনতার মতামতের ভিত্তিতে। দেশের জনগণ শেখ হাসিনাকে পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান কিনা সেটা জানা বা যাচাইয়ের সময় এখনও আসেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘একটা সময়ে এসে সবারই বিরতি নেয়া উচিত’ বলে যে মন্তব্য করেছেন তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাছাড়া ‘তরুণ প্রজন্মের জন্য জায়গা করে দেয়া’র কথাটিও প্রণিধানযোগ্য। আমাদের সমস্যা হলো আমরা থামতে জানি না এবং কেউ একবার জায়গা পেলে আর নতুনদের জন্য জায়গা ছাড়তে চাই না। শেখ হাসিনা সেখানে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তরুণ প্রজন্মের জন্য জায়গা ছাড়ার কথা বলে আসলে অনেকের ভাবনার জায়গায় কড়া ঘা দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অবশ্য বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ছেড়ে যেতে চাইলেও দল তাকে ছাড়বে না’। তিনি আরো বলেছেন, আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। আবার পাঁচ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও সরকার ও দলের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকেই আমরা চাইবো । ওবায়দুল কাদের বলেছেন, শেখ হাসিনা এর আগেও বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দলের কাউন্সিলর এবং নেতাকর্মীদের চাপের মুখে তিনি ঘোষণা দিয়েও সরে যেতে পারেননি।

ওবায়দুল কাদের অসত্য কিছু বলেননি। শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে দল কিংবা সরকার চলবে- এটা কেবল আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মনোভাব নয়। আওয়ামী লীগের বাইরেও কেউ হয়তো সে রকম ভাবেন না। শেখ হাসিনা এখন বিশ্বনেতৃত্বের সম্মান অর্জন করেছেন। তিনি অবসরে যাওয়ার কথা বলে আওয়ামী লীগকে বিপাকে ফেলে দিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে এই প্রশ্নটাও সামনে আসে যে, প্রায় চল্লিশ বছর দলের নেতৃত্ব দিয়ে, পনেরো বছর সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেও দলে কেন উপযুক্ত নেতৃত্ব তৈরি হলো না? এ ব্যর্থতা বা অসফলতার দায় কার?

শেখ হাসিনা চিরদিন আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না এটা যেমন ঠিক, তেমনি আবার এটাও ঠিক যে রাজনীতিতে অনেক দেশেই স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের রেওয়াজ নেই। কিছু কিছু উন্নত দেশে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের মেয়াদকাল নির্ধারিত থাকায় বাধ্য হয়ে অবসরে যেতে হয়। শেখ হাসিনার বয়স এখন ৭২। পাঁচ বছর পর হবে ৭৭। এর চেয়ে বেশি বয়সে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন পৃথিবীতে অনেকেই করেছেন। কাজেই শেখ হাসিনার জন্য এখনই রাজনীতি থেকে চলে যাওয়াটা জরুরি নয়। ওবায়দুল কাদের একটি চমৎকার কথা বলেছেন, ‘রাজনীতিবিদরা ভাবেন পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে। আর শেখ হাসিনা ভাবেন পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে’। এ রকম ভাবেন বলেই শেখ হাসিনা আর পাঁচ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চান না। নতুনদের জায়গা করে দিতে চান। তবে কাজটা খুব সহজ নয়। তিনি ছাড়তে চাইলেই তার সমর্থকরা সেটা চাইবে কেন?

পৃথিবী যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে ,আওয়ামী পৃথিবীও তেমনি শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়, হচ্ছে। এখানে হঠাৎ ছন্দপতন কঠিন কাজই। শেষ করছি ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য দিয়েই। তিনি বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাকে দক্ষতা, যোগ্যতা, সততায় কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। ও. কা সবাইকে অতিক্রম করে গেছেন। এমনকি তিনি নিজেকেও নিজে অতিক্রম করে গেছেন’। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করেই বলতে চাই, শেখ হাসিনার বিচারবুদ্ধির প্রতি আস্থা রাখতে হবে সবাইকে। কখন কী করলে সেটা দেশ ও দলের জন্য ভালো হবে সেটা তিনি নিশ্চয়ই ভালো বুঝবেন। তার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া যাবে না। আবার তিনিও নিশ্চয়ই তার সিদ্ধান্ত সবার ওপর চাপিয়ে দেবেন না। পাঁচ বছর একটি দেশের জন্য খুব বড় সময় নয়, আবার একেবারে কম সময়ও নয়। এই সময়ে নদীতে অনেক জল গড়াবে। আমরা বরং অপেক্ষা করতে থাকি নতুন প্রজন্ম শূন্যতা পূরণে উপযুক্ত হওয়ার প্রতিযোগিতায় কতোটাএগিয়ে আসে।

লেখক: যুগ্ম স্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত