প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জামায়াতে পরিবর্তন নাকি কূটকৌশল!

স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে কিংবা বিলুপ্ত করে নতুন নামে দল গড়ার উদ্যোগকে রাজনৈতিক কূটকৌশল হিসেবে দেখছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনরা। তাঁরা বলছেন, নাম পরিবর্তন হলেও তাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা নীতি পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা বর্তমান প্রতিকূল সময়ে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে আগের মতোই নতুন নামে দল গড়ার কথা ভাবছে। জিয়াউর রহমানের আমলেও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামে দল গড়েছিল জামায়াত। কিন্তু তারা অনুকূল সময়ে আবার জামায়াত নামে কার্যক্রম শুরু করেছিল। এবারও একই কৌশল নিয়ে দলটি অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদ থেকে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুকে দল থেকে বহিষ্কার করার পর নেতাকর্মীদের উদ্দেশে একটি নির্দেশনা পাঠিয়েছে জামায়াত। এতে বলা হয়েছে, দলের সব সিদ্ধান্ত আমির, সেক্রেটারি জেনারেল এবং জেলা ও মহানগর আমিরদের মাধ্যমে জানানো হবে। এর বাইরে কারও ডাকে সাড়া না দিতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে জামায়াত। নির্দেশনায় আরো বলা হয়, দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যদের বিবেচনার জন্য পাঠানো হলো। শুরা সদস্যদের মতামত পর্যালোচনা করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সুনির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেখানে একটি নতুন সংগঠনও গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের জন্য জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে।

জামায়াতের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, আপাতত দলকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে সামাজিক কাজে মন দেওয়ার কথা বলা হলেও নিকট ভবিষ্যতে জামায়াত বিলুপ্ত করে নতুন নামে দল গড়ার পরিকল্পনা আছে কেন্দ্রীয় নেতাদের।

তবে জামায়াতের সব পরিকল্পনা ও উদ্যোগই সাময়িক কূটকৌশল বলে মনে করেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘নতুন বোতলে পুরাতন পানীয়, এমন যদি হয়, নাম পরিবর্তন করবে কিন্তু আদর্শ একই এবং অটুট থাকবে তাহলে সেটা পরিবর্তন কি? নাম পরিবর্তন করলেন কিন্তু নীতি আদর্শ পরিবর্তন করলেন না, তাহলে পরিবর্তন কী হলো? এটাকে পরিবর্তন বলা চলে না।’ গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়াম লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের সব নাগরিকের রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকারটি সংবিধানে স্বীকৃত। জামায়াতে ইসলামী একাত্তর সালে ভুল করেছে ও বর্বরোচিত ভূমিকা রেখেছে। তাদের নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়াটি এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জনগণের একটি বিজয় ও জামায়াতের নৈতিক পরাজয়। তারা মুখে ভুল স্বীকার না করলেও আজকে জনপ্রত্যাশার কাছে পরাজিত হয়ে নৈতিকভাবে তাদের ভুল স্বীকারে বাধ্য হয়েছে।’

বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাম বদলানো হলো জামায়াতের আত্মরক্ষামূলক কৌশল। এর মধ্য দিয়ে তারা টিকে থাকার চেষ্টা করবে। এটি তাদের নীতিগত পরিবর্তন নয়। এই পরিবর্তন কৌশলগত। তাদের অতীত কৃতকর্ম ঢাকতে হয়তো নতুন দলের ঘোষণায় কিছু ভাষাগত ও শব্দগত পরিবর্তন থাকবে। কিন্তু তাদের মূল নীতি অপরিবর্তিত থাকবে।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াতের নাম পরিবর্তন হলো অস্তিত্ব বাঁচানোর কৌশল। আগেও তারা এমন কৌশল নিয়েছে। স্বাধীনতার পর তারা ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগ নামে দল গড়েছিল। আবার আওয়ামী লীগ, বিএনপির মধ্যেও আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তাদের যে মূল আদর্শ তা থেকে কিন্তু তারা সরে যায়নি।’

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নামে কী এসে যায়! জামায়াতকে যে নামেই ডাকেন তাদের আদর্শ একই থাকবে। যে নামেই দল করুক, তারা তো মওদুদীবাদ ছাড়বে না। কেউটে সাপ খোলস বদলালেও যেমন তার বিষ কমে না, তেমনি জামায়াত তাদের নাম বদলালেও রাজনৈতিক ধারা বদলাবে না। তাদের নাম পরিবর্তন হলো রাজনীতিতে টিকে থাকার বৃহত্তর কূটকৌশল। এখন দেখা যাবে কেউ পদত্যাগ করবে, কেউ অন্য দলে ভিড়বে। এটা আমরা অতীতেও দেখেছি। আশির দশকে জিয়াউর রহমানের আমলে তারা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে দল করেছে। পরে সুবিধাজনক সময়ে জামায়াত নামে ফিরে গেছে। এটা শুধু জামায়াতের কৌশল নয়, বিশ্বজুড়ে জামায়াতের যেসব জ্ঞাতি ভাইরা আছে তারাও একই কৌশল অনুসরণ করে। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড নাম পাল্টে জাস্টিস পার্টি হয়েছে। ভারতে নাম বদলেছে। তুরস্কেও একই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তারা কেউই আদর্শ বদলায়নি।’

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে কয়েক দশক আন্দোলনের মাঠে থাকা শাহরিয়ার কবির আরো বলেন, ‘জামায়াতের নতুন দল করা নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন। আমার মতে, এতে উল্লাসের কিছু নাই, বরং উদ্বেগ আছে। জামায়াত তাদের একাত্তরের রাজনৈতিক ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু তারা যে যুদ্ধাপরাধ করেছে তা এখনো স্বীকার করেনি। যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে যেন জামায়াতের বিচার না করা যায় সেজন্য তারা দল বিলুপ্ত করতে চাইছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াত সব সময় ষড়যন্ত্র ও গলাকাটার রাজনীতি করেছে। তারা পুরনো নামে রাজনীতি করবে নাকি নতুন নামে মাঠে নামবে তাতে কিছু এসে যায় না। নাম বদলালেও লোকগুলো তো একই থাকবে। গ্রাম বাংলার প্রবাদ হলো—কয়লা ধুলে তো ময়লা যায় না। জামায়াতও সংশোধন হবে না। আমরা চাই, জামায়াত নিষিদ্ধ হোক, একাত্তরের গণহত্যার জন্য দল হিসেবে জামায়াতের বিচার হোক, একই সঙ্গে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হোক।’

ট্রাইব্যুনালের রায়েও জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা স্পষ্ট : মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলার রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিমত দিয়ে বলেন, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয় পদ থেকে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের সরিয়ে দিতে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মামলার রায়ে বলা হয়েছে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা দিতে এবং পাকিস্তান রক্ষা করতে আলবদর, আলশামস, রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলে। আলবদর ও আলশামস বাহিনী ছিল রাজাকার বাহিনীর দুটি শাখা। এ বাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের শেষ মুহূর্তে আলবদর বাহিনী দেশের শত শত বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করে। রায়ে বলা হয়, এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়। এ ছাড়া জামায়াতের সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয় রাজাকার বাহিনী। এ আধাসামরিক দুটি বাহিনীর মধ্যে রাজাকাররা পাকিস্তান সরকারের বেতনভুক্ত ছিল। এসব বাহিনীর মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, দেশান্তরের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে।

ওই সব বাহিনী নিয়ন্ত্রিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী দিয়ে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত