প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনিসুজ্জামান বললেন, সব মিলিয়ে একটি পরিতৃপ্তির জীবনযাপন করেছি

আমিরুল ইসলাম : ‘আত্মভোলা নন তিনি, নন অচেতন সমাজের/ কল্যাণ কি অকল্যাণ বিষয়ে কখনো যতোদূর/ জানি দৃষ্টি তার সদা মানবের প্রগতির দিকে/ প্রসারিত। কী প্রবীণ, কী নবীন সকলের বরেণ্য নিয়ত’- কবিতার লাইনগুলো শ্বেতশুভ্র এক অমলিন মানুষকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন কবি শামসুর রাহমান। সদা প্রগতির দিকে যার দৃষ্টি তিনি আর কেউ নন, আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের ধ্যানী পুরুষ জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি, বাঙালি মনীষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ৮৩তম জন্মদিন। ১৯৩৭ সালের আজকের দিনে কলকাতার ৩১ ক্যান্টোফার লেনের বাড়িতে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এক পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মদিনে আমাদের নতুন সময় পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের কাছে জীবন নিয়ে তার উপলব্ধি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক দিন বাঁচলাম, অনেক কিছু দেখলাম। এটা আমার সৌভাগ্য। সব মিলিয়ে আমি একটি পরিতৃপ্তির জীবনযাপন করেছি, এটাই বলার।’

মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী পাঁচ দশক এ দেশের মানুষের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অকুতোভয় ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। পুরো নাম আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। শৈশবেই সাহিত্য-ভাবনামুখর এক পরিবেশে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বেড়ে ওঠেন। তার বাবা ডা. এ টি এম মোয়াজ্জম ও মা সৈয়দা খাতুন। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে আনিসুজ্জামান ছিলেন তিন বোনের ছোট। বাবা ছিলেন পেশায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক এবং মা গৃহিণী। বাবা চিকিৎসক এবং মা গৃহিণী হলেও দু’জনেরই ছিলো লেখালেখির অভ্যাস। আনিসুজ্জামানের পিতামহ শেখ আবদুর রহিমও ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। তিনি ১৮৮৮ সালেই হজরত মুহাম্মদের (সা.) জীবনী রচনা করেছিলেন। এটি ছিলো কোনো বাঙালি মুসলমানের লেখা হজরত মুহাম্মদের (সা.) প্রথম জীবনী। তার বড় বোন নিয়মিত কবিতা লিখতেন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের শৈশব এবং শিক্ষাজীবনের প্রথমভাগ কাটে কলকাতায়। কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর দেশভাগের সময় বাংলাদেশের খুলনা জেলায় চলে আসে তার পুরো পরিবার। খুলনা জিলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পরবর্তী সময়ে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় এসে তৎকালীন প্রিয়নাথ হাইস্কুল থেকে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকারের গৌরব নিয়ে। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য যোগদান করেন এবং ১৯৬৫ সালে ‘উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস : ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল’ বিষয়ে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৫৯ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ একাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেন ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় বিশ বছরের মতো শিক্ষকতার পর ২০০৩ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ২০০৫ সালে আবার সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে দুই বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। এছাড়া তিনি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ (কলকাতা), প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। বর্তমানে তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

বর্ণিল কর্মজীবনে শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও গবেষণার কাজে ব্রতী ছিলেন সর্বদা এই প্রাজ্ঞজন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে তার রচিত ও সম্পাদিত বাংলা ও ইংরেজি গ্রন্থগুলো উজ্জ্বল আলোকরেখা হয়ে বর্তমান প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে। তার প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, মুনীর চৌধুরী, স্বরূপের সন্ধানে, Social Aspects of Endogenous Intellectual Creativity, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পুরনো বাংলা গদ্য, মোতাহার হোসেন চৌধুরী,Creativity, Reality and Identity; Cultural Pluralism; Identity, Religion and Recent History অন্যতম।

ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বাংলাদেশের জন্মলগ্নকাল থেকে প্রতিটি আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫২ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে আনিসুজ্জামান ‘রাষ্ট্রভাষা কী ও কেন?’ শিরোনামের একটি পুস্তিকা রচনা করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ওপর এটিই ছিলো প্রথম পুস্তিকা। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এছাড়াও ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামেও তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বক্তৃতা লেখার কাজে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তেমনি বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে কাজ করে গেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংগঠনিক কাজে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় অবদানের জন্য তাকে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদক প্রদান করা হয়। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়া তিনি ১৯৯৩ ও ২০১৭ সালে দু’বার আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক প্রদত্ত আনন্দ পুরস্কার, ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট. ডিগ্রি এবং ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক লাভ করেন। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত