প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজ্জাকের দল ত্যাগে মর্মাহত জামায়াত

বিভুরঞ্জন সরকার : জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি গত ক’বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। লন্ডন থেকেই দলের আমিরের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে তা একইসঙ্গে গণমাধ্যমেও দিয়েছেন। জামায়াত নিজেদের ভেতরের সমস্যা বাইরে খুব একটা প্রচার করে না। এটা একটি সুশৃঙ্খল দল। তারা অনেক কিছুই রেখেঢেকে চলে। অন্য দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কথা, মতভেদ-মতপার্থক্যের কথা বাইরে যতোটা চাউর হয়, জামায়াতের কথা ততোটা হয় না। তবে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দলত্যাগের কথা গোপন করার চেষ্টা হয়নি। বরং এটাকে হাটে হাঁড়িভাঙার মতোই জানান দেয়া হয়েছে। দেশের রাজনীতিতে এটাই এখন আলোচিত বিষয়। গণমাধ্যমেও এটাকে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। জামায়াত আবার আলোচনায় এসেছে। নানা ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীও করা হচ্ছে জামায়াত সম্পর্কে। দলটি বিলুপ্ত হবে, নাকি নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ইসলামের ‘দাওয়াত’ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কৌশল নেবে এসব নিয়ে জামায়াতের ভেতরে যেমন তর্ক-বিতর্ক চলছে, বাইরেও এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। ব্যারিস্টার রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্বই নয়, পরবর্তী প্রজন্মকে দায়মুক্ত করার জন্যও জরুরি’। এটা সবারই জানা যে, জামায়াত ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনীর দেশীয় সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। পাকিস্তান রক্ষার জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াত কখনো অনুতাপ-অনুশোচনা করেনি বরং প্রকাশ্যে গৌরব করেছে। একাত্তরের দুষ্কর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার গরজ বোধ করেনি জামায়াত। এখন নানা কারণে জামায়াত একটি খারাপ সময় পার করছে। জামায়াতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র, পৃষ্ঠপোষক বিএনপিরও যাচ্ছে খারাপ সময়। জামায়াত নিষিদ্ধের একটি আইনি প্রক্রিয়া চলছে। অনেকের বিশ্বাস, এতোদিন জামায়াত নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সরকার কিছুটা রাজনৈতিক কৌশলের খেলা খেললেও এবার হয়তো জামায়াতের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানেই যাবে সরকার এবং আওয়ামী লীগ।

জায়ামাতের দুর্দিনে, বিপদের দিনে পাশে না দাঁড়িয়ে দলের শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক দল ছাড়ার ঘোষণা আজান দিয়ে জানান দিলেন কেন?

এই প্রশ্নের নানা রকম উত্তর বাতাসে ভাসছে। কেউ বলছেন, এটা জামায়াতের একটি নতুন কৌশল এবং চালাকি। জামায়াতকে দিয়ে একাত্তরের ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইয়ে তাদের নিষিদ্ধ হওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা করা। জামায়াত নিষিদ্ধ হলে নতুন নামে নতুন দল খোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা অথবা সরকারের হয়ে কাজ করা। এই তিনটির কোনো একটি কারণে, নাকি সবগুলো কারণ সামনে রেখে ব্যারিস্টার রাজ্জাক জামায়াত ত্যাগ করেছেন সেটা পরিষ্কার হতে আরো কিছুটা সময় লাগবে।

তবে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয় : ১. আব্দুর রাজ্জাক একাত্তের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়াকে জামায়াতের মস্ত ভুল বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি নিজেও তো জামায়াতের ভুলের অংশীদার। ২. মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হলে ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাদের আইনি সহায়তা দিয়েছেন। তাদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি তার এই কাজকে কী সঠিক মনে করেন? জামায়াতকে নৈতিক দায়িত্ব পালনের আগে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের তো উচিত ছিলো নিজের নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করা। নয় কী? ৩. ব্যারিস্টার রাজ্জাক দল ত্যাগ করায় জামায়াত ‘ব্যথিত’ ও ‘মর্মাহত’ হয়েছে। তার অতীত অবদানের কথাও জামায়াত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে। একজন দলত্যাগীর প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই, ক্রোধ, তার ভূমিকার জন্য সমালোচনা নেই এটা কী খুব স্বাভাবিক? জামায়াতের এই নমনীয়তা কী বিশেষ কিছুর ইঙ্গিত দেয়। ব্যারিস্টার রাজ্জাককে আরো বড় কোনো রাজনৈতিক বাণিজ্যে ‘ইনভেস্ট’ করার পরিকল্পনা জামায়াতের নেই তো? ৪. ব্যারিস্টার রাজ্জাকের নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? তিনি নতুন দল করার কথা চিন্তা করছেন না বলে জানিয়েছেন। তবে ‘একজন নাগরিক হিসেবে দেশের সেবায় কাজ করে’ যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি জামায়াত ছাড়ার কথা বলেছেন কিন্তু জামায়াত যে রাজনৈতিক দর্শন বা আদর্শে বিশ্বাস করেন সেটা পরিত্যাগের কথা বলেননি।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক নতুন দল করবেন না, কিন্তু দেশের সেবা করবেন। দল ছাড়া কী দেশ সেবা করা যাবে? তাহলে কী তিনি পুরনো কোনো দলে যোগ দেবেন? দিলে কী বিএনপি হবে সেই দল? নাকি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এনে তিনি যেহেতু ‘হিরো’ হওয়ার চেষ্টা করছেন সেহেতু আওয়ামী লীগ হবে তার অনিবার্য ঠিকানা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

পাদটীকা : জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে, ‘ইসলামী আন্দোলনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি পথ বন্ধ হলে দশটি পথ খোলার মতো যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে। বাস্তবে একটি পথ বন্ধ হওয়ার আগে নিজেদের পক্ষ থেকে পথ বন্ধ করে কোনো কৌশল অবলম্বনের চিন্তাভাবনা হীনম্মন্যতার পরিচয় বহন করে’। জামায়াত কোন পথ অবলম্বন করবে সেটা নির্ধারিত হবে নিষিদ্ধ সংক্রান্ত আদালতের রায়ের ওপর। তবে চাণক্য নীতি অনুসরণ করে জামায়াত যে এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখে না, সেটাও সবারই মনে রাখা দরকার।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত