প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বিচারে মামলা : থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স কার স্বার্থে ?

যায়যায়দিন : ট্রাফিক আইন অনুযায়ী যেকোনো যান্ত্রিক যানবাহন রাস্তায় নামাতে হলে নূ্যনতম থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স করতে হবে। তা না হলে ট্রাফিক পুলিশ সংশ্লিষ্ট যানের বিরুদ্ধে নির্বিচারে মামলা ঠুকে দেবে। এতে প্রতিবারই প্রায় বীমার সমপরিমাণ টাকা জরিমানা হিসেবে গুনতে হবে। অথচ এ বীমার বিপরীতে দুর্ঘটনায়কবলিত ব্যক্তিকে (তৃতীয় পক্ষ) ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোনো নজির নেই। যদিও থার্ড পার্টি বীমাকৃত গাড়িতে সংঘটিত দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত ব্যক্তিকে নির্ধারিত অংকের অর্থ দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কার স্বার্থে এ ধরনের বীমা বাধ্যবাধকতামূলক করা হয়েছে- তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবিক অর্থে থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্সের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। স্রেফ বীমা কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে লাভবান করতে এটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স করা গাড়ির সঙ্গে সংঘটিত দূর্ঘটনায় আহত এবং নিহত ব্যক্তির জন্য যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা আছে, তা শুধু সামান্যই নয়; বরং রীতিমতো হাস্যকর। তিন যুগ আগে মোটর ভাহিকেল অ্যাক্ট-১৯৮৩ তৈরির সময় দূর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের জন্য ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে তা কেন আর বাড়ানো হয়নি তা-ও রহস্যজনক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

এদিকে ফার্স্ট পার্টি ইন্সুরেন্স বা কম্প্রিহেনসিভ বীমা পলিসিতে যানবাহনের যন্ত্রাংশের খুটিনাটি ত্রম্নটি পর্যালোচনা করা হলেও থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্সে এসবের কোনো বালাই নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট যানের ফিটনেস আছে কিনা, তা-ও বীমা কোম্পানিগুলো কোনোভাবে বিবেচনায় নেয় না। কেননা, এ ধরনের বীমায় ক্ষতিপূরণ পরিশোধের যেমন কোনো নজির নেই; তেমনি ক্ষতিপূরণ দাবির হারও অনেকটা শূন্যের কোটায়।

এর কারণ হিসেবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, বীমা কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেও অধিকাংশ সময় তা পাওয়া যায় না। এ কারণেই ক্ষতিগ্রস্তরা সাধারণত ‘ক্লেইম’ করেন না। তা ছাড়া একটা ক্লেইম প্রমাণ করতে থানা-পুলিশ থেকে শুরু করে যেসব তথ্যের যোগান দিতে হয়, তাতে ২৫-৩০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়। এ কারণে কেউ এসব ঝামেলার মধ্যে যেতে চায় না। অনেকে বিষয়টি জানেও না।

তাদের ভাষ্য, যখন মোটর ভেহিকল অ্যাক্ট তৈরি করা হয় তখন ২০ হাজার টাকার মূল্য ছিল অনেক। কিন্তু বর্তমান সময়ে ২০ হাজার টাকা দিয়ে সাধারণ আহতের চিকিৎসাও হয় না। অথচ উন্নত দেশগুলোতে দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারকে ৭০-৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। যদিও ৫/৬শ’ টাকা দিয়ে থার্ড পার্টি পলিসি করে এই বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ পাওয়াও সম্ভব নয় বলে স্বীকার করেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বেশকিছু বীমা কোম্পানিও এখন থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স উঠিয়ে নেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশের একটি খ্যাতনামা বীমা প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষকর্তা বলেন, ‘থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স হলো রাস্তায় গাড়ি নামানোর জন্য একটি আইনি স্বীকৃতি। এখানে কোনো দাবি পূরণ হয় না। ফলে এ ধরনের বীমার কোনো ভিত্তি নেই। বিশ্বের অনেক দেশে এই ধরনের বীমা নেই। কারণ যারা সচেতন, তারাই এটি উঠিয়ে নিচ্ছেন। আর আমরা নিজেরাও এটি উঠিয়ে নেয়ার পক্ষে।’

প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে যানবাহনের থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স চালু থাকলেও এ পলিসি করার সময় সংশ্লিষ্ট যানবাহনের ফিটনেস থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে যান্ত্রিক ত্রম্নটিসহ মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স করতে পারছে না। যার ফলশ্রম্নতিতে সেখানকার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া ভারতের বীমা কোম্পানিগুলো সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করছে বলে জানা গেছে।

এদিকে আইনি দুর্বলতার সুযোগে প্রতি বছর বীমা কোম্পানিগুলো থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স বাবদ কী পরিমাণ অর্থ আয় করছে এবং দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের তারা ক্ষতিপূরণের কত টাকা থেকে বঞ্চিত করছে তার কোনো হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। তবে মোটা দাগে এর পরিমাণ যে একেবারে কম নয় তার একরকম হিসাব পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালে দেশজুড়ে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে মোট ৭ হাজার ২২১ জন। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৭ হাজার ৩৯৭ জন। আর আহতের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১৯৩ জন।

থার্ড পার্টি বীমার সুবিধা অনুসারে ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭ হাজার ২২১ জনের পরিবার সর্বমোট ১৪ কোটি ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা। দুর্ঘটনায় প্রত্যেক আহতের বিপরীতে ৫ হাজার টাকা হিসাবে ৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, আর ১০ হাজার টাকা হিসেবে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা। অথচ তারা কেউ বীমা বাবদ কোনো টাকা পাননি।

অপর এক সূত্রে দেখা গেছে, গত ১৪ বছরে দুর্ঘটনায় ৬৯ হাজার ৪২৬ জন নিহত হয়েছেন। বীমা সুবিধা অনুসারে ক্ষতিপূরণের অংক দাঁড়ায় ১৩৮ কোটি ৮৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর ১ লাখ ২৫ হাজার ১৬৫ জন আহতের বিপরীতে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬ কোটি ৫৮ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১২৩ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু বীমা দাবি না দেয়া বা দাবি উত্থাপন না করায় অ্যাক্ট লায়াবিলিটি ইন্সুরেন্সের বিপরীতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতে পায়নি ক্ষতিগ্রস্তরা।

অথচ গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬২০টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ২২ লাখ ৬ হাজার ১৫৫টি। এসব যানবাহনের এক-তৃতীয়াংশ ফার্স্ট পার্টি ইন্সুরেন্সের আওতায় এবং কিছু সংখ্যক যান ইন্সুরেন্স না করে থাকলেও বাকি ২৩ লাখ ৩২ হাজার ৪১৩টি যান থার্ড পার্টি বীমা গ্রহণ করেছে। যার পলিসি বাবদ গড়ে ৪শ’ টাকা হিসেবে এক বছরে ৯৩ কোটি ২৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকার বেশি বীমা কোম্পানিগুলোতে জমা হয়েছে।

দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সুবিধা পাওয়া নিয়ে কথা বলা হয়, যাত্রি, বীমা নির্বাহী ও পরিবহন মালিকদের সঙ্গে। তাদের মতে, আইনি জটিলতা, সচেতনতা না থাকা ও আইনের সংস্কার না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট আইনটি সংশোধনের প্রয়োজন বলে তারা সবাই মত প্রকাশ করেছেন।

তবে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বলছে, আইনটি সংশোধনের চেয়ে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি আরো বেশি জরুরি। কেননা থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্সে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেয়া বিষয়টি বেশিরভাগ মানুষেরই অজানা। তাই কেউ কোনো ক্ষতিপূরণ চায় না। থার্ড পার্টি ইন্সুরেন্স করা কোনো গাড়িতে দূর্ঘটনার শিকার কেউ ক্ষতিপূরণ দাবি করলে বীমা কোম্পানিগুলো তা দিতে বাধ্য বলে দাবি করে আইডিআরএ।

তবে বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চুয়াডাঙ্গাগামী এক বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং এটিএন নিউজের সিইও ও চিত্রগ্রাহক-সাংবাদিক মিশুক মনিরসহ ৫ জন নিহত হন। এর দেড় বছর পর নিহতের পরিবার মানিকগঞ্জে বাস মালিক, চালক ও বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চেয়ে দুটি মামলা করে। ২০১৪ সালে মামলা দুটি জনস্বার্থে হাইকোর্টে স্থানান্তর করা হয়। ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর তিন মাসের মধ্যে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দেন আদালত। অথচ আদালতের বেঁধে দেয়া সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেলেও সে ক্ষতিপূরণ মেলেনি।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্ববাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বে বীমা খাতে ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বীমা খাতের প্রতি মানুষের এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর বড় কারণ- বীমা কোম্পানিগুলো শুধু প্রিমিয়াম নিতে অভ্যস্ত। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি অজুহাতের শেষ থাকে না। তিনি বলেন, এ সংকট কাটানোর দায়িত্ব এ খাতের উদ্যোক্তাদের। মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, এজন্য একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাও রয়েছে। কোনো অনিয়ম হলে তদন্ত করে তাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ