প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নেতৃত্ব সংকটে জনতা ব্যাংক

যুগান্তর :  সরকারি খাতের জনতা ব্যাংক বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে। পরিচালনার ক্ষেত্রে সঠিক নির্দেশনা না পেয়ে ব্যাংকটির প্রায় সব সূচকে নেতিবাচক অবস্থা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়েছে পাগলা ঘোড়ার গতিতে। মূলধন ঘাটতি বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে।

লাভজনক অবস্থা থেকে লোকসানে চলে গেছে ব্যাংকটি। ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে পর্ষদ সদস্যদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। পর্ষদ সভাগুলোতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে পর্ষদ সদস্যরা ভিন্নমত উপস্থাপন করলেও সেগুলো আমলে নিচ্ছেন না চেয়ারম্যান।

একতরফাভাবে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সদস্যদের আপত্তি সত্ত্বেও বিতর্কিত গ্রুপকে বড় অঙ্কের ঋণ দিচ্ছেন। আবার ভালো গ্রাহকদের ভোগান্তির শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় প্রাপ্যতা অনুযায়ী ঋণ পান না। এসব একতরফা নেতিবাচক সিদ্ধান্ত ব্যাংকের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নিয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।

পর্ষদ সভায় চেয়ারম্যান ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ করার প্রস্তাব তুলেছেন। পর্ষদ সদস্যরা বিরোধিতা করায় সেটা সম্ভব হয়নি। তবে চেয়ারম্যান পর্ষদ সদস্যদের সম্মতি ছাড়াই একক ক্ষমতাবলে এমডির বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি দিয়েছেন।

এদিকে জনতা ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জনতা ব্যাংকের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর অসন্তোষ। ২০১৮ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংকে এ বছর যে তদন্ত হবে তাতে সব সূচকের অবস্থা তীক্ষèভাবে পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বিভিন্ন পর্যায়ের ভুক্তভোগীরা বলছেন, অদক্ষ ও বিতর্কিত এই চেয়ারম্যানকে বহাল রেখে জনতা ব্যাংককে আর সঠিক পথে আনা সম্ভব হবে না। সংকট নিরসন করতে হলে অবিলম্বে লুনা সামসুদ্দোহাকে অপসারণ করে অধিকতর দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে যেসব অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে সে বিষয়ে কার্যকর তদন্ত কমিটি করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বিশ্লেষক ও ব্যাংকটির দু’জন সিনিয়র কর্মকর্তা তাদের মূল বক্তব্য হিসেবে  বলেন, গাছের গোড়া কেটে দিয়ে এখন পানি ঢেলে কোনো লাভ নেই। কেননা কোনো মানদণ্ডে যার জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার যোগ্যতা নেই তাকেই বসানো হয়েছে এ পদে।

ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। যাদের হীন স্বার্থে তাকে প্রভাব বিস্তার করে এখানে বসানো হয়েছে শুধু তাদের স্বার্থ ছাড়া ব্যাংক কিংবা দেশের জনগণের কোনো লাভ হচ্ছে না। স্বেচ্ছাচার সিদ্ধান্তে ব্যাংকটি ডুবতে বসেছে। এক সময়ের লাভজনক বৃহৎ ব্যাংকটি দ্রুতগতিতে খেলাপি ঋণের খাদে পড়ে গেছে।

তারা বলেন, এজন্য প্রথমত দায়ী সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যারা রাতারাতি চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। তারা মনে করেন, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ. হ. ম. মুস্তফা কামাল এখন পর্যন্ত ব্যাংকিং সেক্টরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতা অপব্যবহার নিয়ে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা অনেককে আশান্বিত করেছে। এখন বাস্তবে দেখার বিষয়, তিনি শক্ত হাতে কতখানি ভূমিকা রাখতে পারবেন।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহার সঙ্গে কথা বলার জন্য তার মুঠোফোন ও অফিসের টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম  বলেন, জনতা ব্যাংকে উচ্চ খেলাপি ঋণই বড় সমস্যা। এর ফলে অন্য সব সূচক নিম্নমুখী হচ্ছে। ব্যাংকটির নাজুক পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখানে পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা ও সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব- সব পক্ষই দায়ী। ব্যাংকটিকে উদ্ধারের জন্য বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো উচিত।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে পর্ষদ সদস্য, চেয়ারম্যান ও এমডির দায়-দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওইসব বিধি মেনে কাজ করছেন না। বিধি অনুযায়ী চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পর্ষদ ব্যাংক পরিচালনার জন্য নীতি প্রণয়ন করবে।

এমডির নেতৃত্বে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সেটি বাস্তবায়ন করবে। জনতা ব্যাংক এক বছর ধরে বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে গেলেও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পর্ষদ ব্যাংকটি উদ্ধারের জন্য কোনো অ্যাকশন প্লান তৈরি করেনি। যদিও কয়েকজন পর্ষদ সদস্য এ বিষয়ে পর্ষদ সভায় জোরেশোরে কথা বলেছেন। কিন্তু সেগুলো আমলে নেয়া হয়নি।

ব্যাংকটি নেতিবাচক অবস্থার দিকে যাত্রা এবং এ নিয়ে সমালোচনা হতে শুরু হলে গত মাসে ব্যাংকের পর্ষদ সভায় চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা ব্যাংকের এমডির বিরুদ্ধে কাজ না করার অভিযোগ আনেন। তিনি তাকে অপসারণ করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এ বিষয়ে পর্ষদ সদস্যরা বলেন, এমডির বিরুদ্ধে কি ধরনের অভিযোগ রয়েছে সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করার জন্য। কিন্তু সেটি না করে চেয়ারম্যান অর্থ মন্ত্রণালয়ে এমডির বিরুদ্ধে একটি চিঠি লেখেন। এমডি পর্ষদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে না বলে চিঠিতে অভিযোগ করেন।

এর আগে গত বছরের আগস্টে ক্রিসেন্ট গ্রুপকে বেআইনিভাবে ঋণ দেয়ার দায়ে পর্ষদ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুস সালামসহ তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের (ডিএমডি) বিরুদ্ধে চরম দায়িত্বহীনতার অভিযোগ এনে ব্যাখ্যা তলব করেন। ব্যাখ্যার জবাব গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখে পর্ষদ।

গত বছরের শেষদিকে একটি শিল্প গ্রুপের সহযোগী কোম্পানি ৪৭৫ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করে জনতা ব্যাংকে আবেদন করে। পর্ষদ এ নিয়ে কয়েক দফায় আলোচনা করে ৪৫০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে। এর বিপরীতে অপর একটি কোম্পানির শেয়ার বন্ধক রাখা হয়। পরে বিষয়টি ওই গ্রুপের মালিক পক্ষ জেনে প্রবল আপত্তি তোলে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ৪৭৫ কোটি টাকারই ঋণ লাগবে। পরের পর্ষদ সভায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা কোনো আলোচনা না করেই ঋণটি পাস করে দেন।

এ বিষয়ে কয়েকজন পরিচালক আপত্তি উপস্থাপন করলেও সেগুলো আমলে নেয়া হয়নি। বরং চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে পর্ষদ সভায় আর কোনো আলোচনার প্রয়োজন নেই। একজন পরিচালক কথা বলতে চাইলে তাকে এক রকম ধমকের সুরে বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনি আর কোনো কথা বলবেন না।’

একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, সম্প্রতি একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে ৩৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর খুব চাপ সৃষ্টি করে। যদিও পর্ষদের অন্য ভালো সদস্যদের জোরালো সম্মতি না থাকায় শেষ পর্যন্ত তা পাস হয়নি। এছাড়া আরও একটি বড় গ্রুপকে সম্প্রতি পর্ষদ সদস্যদের আপত্তি উপেক্ষা করে ঋণ দেয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা আরও জানান, সরকারি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংক ছিল একটি মডেল। সব সূচকে এর উন্নতি ছিল। খেলাপি ঋণ দেড় শতাংশে নেমে এসেছিল। প্রতি বছর মুনাফা করত। এখন সব সূচকে দেখা দিয়েছে ঘাটতি। ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের বড়ই অভাব চলছে। এ কারণে এখন এটি দুরবস্থায় পতিত হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি সাবেক সিনিয়র সচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুনকে জনতা ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ করে আদেশ জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি পেলেই তার যোগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি নেয়ার ব্যাপারে জনতা ব্যাংক কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে লুনা সামসুদ্দোহাকে চেয়ারম্যান করে একটি চিঠি দেয়া হয়। এ

ই চিঠির আলোকে ওইদিনই তিনি পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। একজন ব্যবসায়ী প্রভাব খাটিয়ে সাবেক সিনিয়র সচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুনকে বাদ দিয়ে লুনা সামসুদ্দোহাকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করে। এর আগে তিনি ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্যাংকের পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

বিশ্লেষকদের কয়েকজন বলেন, ব্যাংকের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে বড় ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা পর্ষদ সভায় ব্যাংকটি খারাপ অবস্থা থেকে উদ্ধারের কোনো নির্দেশনাও দিতে পারছেন না। তার অতীত কাজের সঙ্গে ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার মতো কোনো দক্ষতার সম্পৃক্ততা নেই। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি মহলবিশেষের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। বলা হয়, তিনি পতুলমাত্র। মূলত এসব কারণে জনতা ব্যাংকের দুর্গতি কাটছে না।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন  বলেন, এখানে পরিচালনা পর্ষদের দায় বেশি। সরকারি ব্যাংকের পরিচালক এবং ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। নানা উদ্যোগের কথা শোনা যায় কিন্তু কার্যকর হতে দেখা যায় না। সে কারণে পরিস্থিতি বদলায়নি। না ঋণদাতা, না ঋণগ্রহীতা; কেউ বদলায়নি। জনতা ব্যাংকে সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি আছে। তা না হলে এক বছরে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বাড়ে না।

এদিকে বড় ধরনের জালিয়াতির ফাঁদে পড়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বের করে নেয়া ঋণ আদায় হচ্ছে না। ওইসব ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে পাগলা ঘোড়ার গতিতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমান চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেয়ার ১১ মাসের মাথায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ এক বছরের ব্যবধানে এত বেশি পরিমাণে বাড়েনি। এর আগে বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতির ঘটনার পর তাদের খেলাপি ঋণ এক বছরে বেড়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩০৫ কোটি টাকায়। গত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় তিনগুণ।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদ  বলেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপকে দেয়া ঋণের পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে। এর সঙ্গে নতুন করে সুদ যোগ হয়ে খেলাপির পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে।

ব্যাংকিং খাতে শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় জনতা ব্যাংকেরই ১৮টি প্রতিষ্ঠান। এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির এমডি বলেন, কিছু ছিল পুরনো। নতুন করে ক্রিসেন্টসহ কয়েকটি গ্রুপের কারণে শীর্ষ খেলাপির তালিকায় জনতার খেলাপি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম  বলেন, জনতা ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। নিশ্চয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কোনো দুর্বলতা আছে, তা না হলে এক সময়ের ভালো ব্যাংক বর্তমানে এত খারাপ হতো না। এর দায় পর্ষদও এড়াতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি দ্রুত নজরে এনে ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ৩১ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অনুষ্ঠিত সরকারি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা বিষয়ক এক সভায় জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকটি এখন লোকসানের খাতায় চলে গেছে। যদি আগের বছরগুলোতে বেশ মুনাফা করত জনতা ব্যাংক।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো জনতা ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকটি গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রায় সব সূচকেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এমনকি কোনো কোনো সূচকে তাদের অবনতি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খেলাপি ঋণের টাকা আদায় করতে পারেনি। গত বছর তাদের ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তারা আদায় করতে পেরেছে ১৫৮ কোটি টাকা। একইভাবে অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০ কোটি টাকা। ছয় মাসে আদায় হওয়ার কথা ছিল ৭৫ কোটি টাকা। কিন্তু এই সময়ে আদায় করেছে মাত্র ১৯ কোটি টাকা।

২০১৫ সালে ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছিল ৪৬২ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে এর পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২৫১ কোটি টাকায়। ২০১৭ সালে আরও কমে মুনাফা দাঁড়ায় ৯৭ কোটি টাকায়। ২০১৮ সালে ব্যাংকটির আর মুনাফা নেই। তারা এখন লোকসানে চলে গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে ১০ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। কিন্তু ব্যাংকটি রাখতে পেরেছে ৫ শতাংশ। এ হিসাবে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

সূত্র জানায়, সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ও জনতা ব্যাংকই এক সময় লাভজনক অবস্থায় ছিল। জালিয়াতির কারণে ২০১৪ সাল থেকে বেসিক ব্যাংক লোকসানে চলে যায়। একই কারণে গত বছর থেকে লোকসানে গেল জনতা ব্যাংক।

প্রতিবেদন থেকে আরও দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে তারা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কৃষি, এমএমই ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়নি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী লোকসানি শাখার সংখ্যাও কমাতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলেন, জনতা ব্যাংকে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। সুশাসনের ঘাটতি চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। ফলে বেপরোয়া ব্যাংকিং হয়েছে। তিনি বলেন, জনতা ব্যাংকে বছরে যে পরিমাণ খেলাপি হয়েছে, সে পরিমাণ ঋণও অনেক ব্যাংক বিতরণ করতে পারে না। এটি খুবই দুঃখজনক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত