প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি জামায়াত কার্যত বিচ্ছিন্ন

ডেস্ক রিপোর্ট : দীর্ঘ দুই দশক জোটবদ্ধ রাজনীতির পর বিএনপি-জামায়াতের বন্ধন এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে দুইটি দল মিলেছিল এক প্ল্যাটফরমে। জোটবদ্ধ রাজনীতিতে সাফল্য দ্রুত ধরা দিলেও তাদের রাজনীতির ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ছিল মেঘাচ্ছন্ন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় গিয়ে জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতাকে মন্ত্রী করার পর প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিল বিএনপি। তারই ধারাবাহিকতায় বিগত একযুগ ধরে এক বৈরী পরিস্থিতি পার করছে বিএনপি-জামায়াত। বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রম সংকুচিত ও জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়ে পড়েছে অঘোষিতভাবে নিষেধাজ্ঞার বন্দি। দুই দলই এখন রাজনীতিতে ব্যাপক কোণঠাসা। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার নানামুখী খেসারত দিচ্ছে বিএনপি।

জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য দীর্ঘদিন থেকেই দলটির ওপর চাপ দিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মহল।

দলের অভ্যন্তরীণ ফোরামেও এ নিয়ে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। বিশেষ করে মহাজোট আমলে স্থানীয় নির্বাচনসহ নানা ইস্যুতে জামায়াতের বারবার স্ট্যান্ড বদল বিএনপির তৃণমূল নেতাদের করেছে বিক্ষুব্ধ। কিন্তু সমস্ত চাপ এড়িয়ে জোটের ঐক্য ধরে রেখেছিল বিএনপি। অবশ্য বিএনপি নেতৃত্বেরই একটি অংশ জামায়াতকে ছাড়াই পথ চলতে চাইছিলেন ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে তাই অনেকটা গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টাও করেছে দলটি। অন্যদিকে জামায়াতের একের পর এক কেন্দ্রীয় নেতার যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর, উপরন্তু জোটেও দিন-দিন দলের গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ায় জামায়াতও ছিল মনঃক্ষুণ্ন। সরকারের সঙ্গে জামায়াতের একটি অংশের আঁতাত আছে বলে মনে করেন বিএনপি নীতিনির্ধারকরা।

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত পৃথক প্রার্থী দেয়ার পর বিএনপি-জামায়াত দূরত্ব বাড়তে থাকে। জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলেও জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়ার ব্যাপারে একমত ছিলেন না বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতিতে বিকল্প কোনো পথ না পেয়েই তাদের ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতের সঙ্গে সাম্প্রতিককালে বিএনপির সম্পর্ক ছিল অনেকটাই শীতল। আর একাদশ জাতীয় নির্বাচন বদলে দিয়েছে সবকিছু। নির্বাচনের পর ট্রাইব্যুনালে মামলা নিয়ে প্রার্থীদের মতামত সংগ্রহের যে বৈঠক করেছিল বিএনপি সেখানে অংশ নেয়নি জামায়াতের কোনো প্রতিনিধি। জামায়াতকে দূরে রাখতে ঐক্যফ্রন্টের অন্য শরিকদেরও ব্যাপক চাপ ছিল ফ্রন্ট গঠনের শুরু থেকেই। নির্বাচনের পর সে চাপ নতুন করে বেড়েছে। এখন পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে বিএনপি।

রাজনীতির মাঠে জোটসঙ্গী, ভোটসঙ্গীর ২০ বছরের পারস্পরিক নির্ভরতার ইতি ঘটছে নীরবে। সম্প্রতি দলটির শুভাকাঙ্ক্ষিদের একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠান হয়। সেখানে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ইস্যুতে ‘সম্পর্ক ছিন্ন’র পক্ষে মতামত আসে প্রায় শতভাগ। এমন পরিস্থিতিতে, বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। তবে দুই দলের সম্পর্ক ছিন্নের বিষয়টি ঘটেছে নীরবে। অনেকটাই পারস্পরিক বোঝাপড়ায়। কোনো দলই আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেয়নি এখনো। কিন্তু রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জরিত আলোচনাটিও উড়িয়ে দেয়নি। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ব্যাপারে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ‘রাজনীতিতে কোনো জোটই চিরস্থায়ী নয়।’ দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, দুই দলের সম্পর্কের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য আমার জানা নেই।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি এ ধরনের কোনো তথ্য জানি না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জোটের রাজনীতি করেও নানা সময়ে পলিটিক্যাল স্টান্ড চেঞ্জ করেছে জামায়াত। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে তারা বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করেও কোথাও কোথাও সেটা রক্ষা করেনি। এ ছাড়া রাজনীতিতে বিএনপির মতো আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে সহমত পোষণ ও যৌথ আন্দোলন করার ইতিহাসও আছে দলটির। অতএব, তারা তাদের রাজনৈতিক বিবেচনাবোধ অনুযায়ী যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা বলেন, দুই দলের মধ্যে সম্পর্ক এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জামায়াতের জোটে থাকা না-থাকা একই কথা। তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সারাবিশ্বে সরকার পরিবর্তনের দুইটি স্বীকৃত হচ্ছে- নির্বাচন ও গণআন্দোলন। বাংলাদেশে সম্প্রতি যে নির্বাচন হয়ে গেছে তারপর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। এখন গণআন্দোলনের পথে যেতে হবে।

তিনি বলেন, ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি দেশের মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্বৈরসরকারের পতনে দলমত নির্বিশেষে গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের বিকল্প নেই। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে না পারলে স্বৈরসরকারের পতন হবে না। ফলে এখানে দলের লাভ-ক্ষতির বিষয়টি বড় নয়, বড় হচ্ছে কিভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা যায়। মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্রের লড়াই করছে। এ লড়াই করতে গিয়ে খালেদা জিয়া কারাভোগ করছেন। বিএনপিসহ জোট ও ফ্রন্টের নেতাকর্মীরা ত্যাগ শিকার করেছে। এখন গণতান্ত্রিক শক্তিকে আগের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। এখানে জাতীয় ও দেশের স্বার্থকে বড় করে না দেখে, সে নিরিখে চিন্তা না করলে সমস্যা আরো বাড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিএনপির সঙ্গে আর থাকবে না দলটি। এরই ধারাবাহিকতায় এখন থেকে ২০-দলীয় জোটের কোনো কর্মসূচি ও বৈঠকেও অংশ নেবে না জামায়াত। তবে আপাতত তারা বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে না। তবে জামায়াতের সব ইউনিটকে মজলিসে শূরার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে দলীয় নেতাদের কিছু দিকনির্দেশনাও দিচ্ছে জামায়াত। এদিকে রাজনীতিতে প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে আপাতত জোটের কর্মসূচি থেকে নিজেদের বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

তবে এককভাবে দলীয় কর্মসূচিগুলো পালন করবে তারা। এ ছাড়াও দলের মূল কার্যক্রম আরো গতিশীল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এজন্য দলের শীর্ষ দশজন নেতাকে অঞ্চল ভাগ করে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দলটি একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে দলের একজন কর্মপরিষদ সদস্য মানবজমিনকে বলেন, দেশের সার্বিক রাজনীতির পরিবেশ সন্তোষজনক না। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার পাশাপাশি রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে থাকতে চাই। এটাকে যদি জোটের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বুঝায় তাহলে তাই। তিনি বলেন, স্বাভাবিক রাজনীতি করার পরিবেশ যেখানে নেই সেখানে ‘রাজনীতি’ বাদ দিয়ে দলীয় মূল কাজ ইসলাম প্রচার ও দীনি কাজ করার দিকে মনযোগ বেশি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের সর্বোচ্চ ফোরামে জোটের রাজনীতি থেকে আপাতত বিরত থাকার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। তবে সেটি এজেন্ডা হিসেবে ছিল না।

দলের কর্মপরিষদ সদস্য এসএম সানাউল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, দেশে যেখানে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ নেই সেখানে জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে এতো কথা উঠছে কেন? তিনি বলেন, নির্বাচন আন্দোলন ইস্যুতে চারদলীয় জোট করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি বড় হয়েছে। এখন জোটের নির্বাচন ও আন্দোলনের কোনো ইস্যু নেই তাই আপাতত নীরব থাকা উত্তম। জামায়াতের ইসলামী মূল কার্যক্রম ‘দীনি’ কাজের দিকে এখন বেশি মনযোগ দেয়া হবে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত দল কোনো নির্বাচনে অংশ নিবে না। এটা যদি জোটের সঙ্গে মিলে যায় তবে তা হবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত