প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উদযাপন

আমান-উদ-দৌলা, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর: শিল্পাঙ্গন “Center for Bangla Creative Works Inc.” হিসেবে নিউ ইয়র্কে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ধর্ম, বর্ণ ও রাজনীতির উর্দ্ধে থেকে বাংলায় সৃজনশীল চর্চায় নিমগ্ন রয়েছে। ইতিমধ্যে পেশাদার শিল্পীদের সমন্বয়ে একাধিক শিল্পোত্তীর্ণ অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল ধারায় নিয়মিত শিক্ষা, সাধনা ও প্রসারে শিল্পাঙ্গন নিয়োজিত রয়েছে। নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে উদ্বুদ্ধ ও শিক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে আদান প্রদানও শিল্পাঙ্গনের অন্যতম লক্ষ্য।

নিউ ইয়র্কের বাঙ্গালির প্রাণকেন্দ্র জ্যাকসন হাইটসের জনপ্রিয় মিলনায়তন, PS-69-এ গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখ রবিবার শিল্পাঙ্গনের উদ্যোগে আয়োজিত হলো আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানমালা।

অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, সুসংগঠিত ও উন্নত পেশাদার পরিবেশনা হলভর্তি দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে, যেখানে বহু সাংবাদিক ও শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। বিকেল ৫:৩০-এ শুরু হয়ে রুদ্ধশ্বাসে গান, কবিতা ও নাটকের পরিবেশনা চলে রাত ৮:০০ পর্যন্ত যা নিউ ইয়র্কের সাংস্কৃতিক চর্চায় এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অনুষ্ঠানে ছিল না কোন তথাকথিত বিরক্তিকর বক্তৃতা, এক পরিবেশনা থেকে অন্য পরিবেশনায় যাওয়ার মাঝে বিলম্ব, এবং সর্বোপরি সঠিক সময়ে অনুষ্ঠান শুরু করতে পারা ছিল দর্শকদের জন্য এক পরম পাওয়া, যদিও কিছু দর্শক চিরাচরিত নিয়মে দেরীতে আসায় অনুষ্ঠানের শুরুর কিছু পরিবেশনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বীর বাঙ্গালিদের যাদের দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও প্রগতিশীলতায় আজ আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি।

সম্প্রতি প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও সঙ্গীতজ্ঞ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলসহ সকল জীবিত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয় এবং তাঁদের সম্মানে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সংগঠনের সভাপতি আমর আশরাফ উপস্থিত সুধীবৃন্দকে সংক্ষেপে স্বাগত জানা এবং সংগঠনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যাখ্যা করেন।

অনুষ্ঠানের প্রথম পরিবেশনা ছিল সঙ্গীতালেখ্য, “বাংলাদেশের হৃদয় হতে”। কবিতায় ও গানে উপস্থাপন করা হয় আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের গৌরবময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। মেধাবী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিদিশা দেওয়ানজীর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় একক

যুগল ও সমবেত কণ্ঠে গান পরিবেশন করেন মৌসুমী বড়ুয়া, সামিনা আশরাফ, ইশরাত আহমেদ পরশিয়া, মাহনাজ হাসান, ফারজানা সুলতানা শরমিন, শাহপার ইসলাম সিমি, ইশরাত কুমু, সোনিয়া হক, তাসফিয়া রুবাইয়াৎ কৈশি, সোনিয়া পান্না, দীপ্তি বড়ুয়া, সায়েম শাহরিয়ার অন্তু, মাহমুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ শানু, আরিবা আহমেদ, সামায়রা মাহিবা, রাই সরকার, নুসায়বাহ কবির, আয়না মাহিবা ও লিয়ানা মাহবিন। আবৃত্তি করেন সাবিনা হাই উর্বি, মোহাম্মদ শানু ও মো: নজরুল ইসলাম। সঙ্গীত তত্বাবধানে ছিলেন সৌগত সরকার, কী বোর্ডে মো: রিপন, তবলায় পিনাক পানি গোস্বামী, এবং গীটারে মোহাম্মদ শানু ও আকাশ আহসান। গ্রন্থনা ও আবৃত্তিতে মো: নজরুল ইসলাম।

সঙ্গীতালেখ্য-র পর ছিল নাটিকা “বাংলা মা”। ১৯৫২ সালে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরো অনেক বীর বাঙ্গালী বুকের রক্তে প্রতিষ্ঠিত করেছে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা। তাঁদের পেছনে ছিল তাঁদের পরিবার, ছিল সারা দেশ। এ আত্মত্যাগ শুধু ক’জন শহীদেরই নয়, গোটা জাতির। বাংলা মায়ের কথা, শহীদের কথা, দামাল ছেলেদের কথা বলা হয়েছে নাটিকায়। ম. ম. জসীমের রচনা ও নির্দেশনায় “বাংলা মা” নাটিকায় অভিনয় করেছে জিনাতুন নাহার হেরা এবং নেপথ্যে কণ্ঠে মো: নজরুল ইসলাম।

অসাধারণ অভিনয়ের পর আবারও গান পরিবেশিত হয়। ১৯৫২ সালে বাংলা মায়ের যেসব দামাল ছেলেরা ভাষার দাবিতে এবং জাতিসত্ত্বার দাবিতে মাঠে নেমেছিল তাঁদের বীরত্বগাঁথা সুরে সুরে পরিবেশন করেন মেধাবী ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত শিল্পী সাইফুল্লাহ পারভেজ। গানের পর কবিতা। আমাদের অহংকারের একুশ, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, ও দেশের কথা পরিবেশিত হয় কবিতার ছন্দে। নিউ ইয়র্কের চারজন বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী পরিবেশন করেন, “অহংকারের পঙতিমালা”। শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ও শহীদ কাদরীর কবিতা নিয়ে এক অসাধারণ আবেগময় ও উদ্দীপনামূলক পরিবেশনা করেন শরফুজ্জামান মুকুল, নীরা কাদরী, গোপন সাহা এবং ফারুক ফয়সাল।

অনুষ্ঠানের সর্বশেষ আকর্ষণ ছিল বিশেষ নাটক “এখানে দরজা ছিল”। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত আমর আশরাফের ভাবনা ও প্রয়োগে এবং মো: নজরুল ইসলামের রচনা ও নির্দেশনায় “এখানে দরজা ছিল” নাটকে প্রাণবন্ত অভিনয় করেন দুই তারকা শিল্পী শিরীন বকুল এবং মিলা হোসেন। তাঁদের সঙ্গে অভিনয়ে আরো যোগ দেন প্রতিষ্ঠিত রূপসজ্জাশিল্পী ও অভিনেতা ম. ম. জসীম, শওকত রিমন, মোহাম্মদ শানু, মোস্তফা মোর্শেদ মানু, লতিফ রহমান, মো: আওকাত খান, সামায়রা মাহিবা, সোনিয়া হক, ইশরাত কুমু ও মো: নজরুল ইসলাম। মাসুদুল ইমামের অসাধারণ মঞ্চ, মো: নজরুল ইসলাম ও মাহবুব রশীদের অপূর্ব আবহ, আমার আশরাফের আলোক নিয়ন্ত্রণ ও শিল্পীদের অনবদ্য অভিনয় হলভর্তি দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে ফেলে। নেপথ্য ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ইকবাল ইসলাম, সোনিয়া হক, ইশরাত কুমু ও সালেহা।

আমর আশরাফের সার্বিক সমন্বয়ে, ফালাহ আহমেদ ও আকতার কামালের সুযোগ্য ব্যবস্থাপনায়, মো: নজরুল ইসলামের গ্রন্থণায়, এবং বেবী আজিজের উপস্থাপনায় শিল্পাঙ্গনের ভাষা ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান নিউ ইয়র্কে এক মাইলফলকের সূচনা করে। নিউ ইয়র্কের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতের প্রচুর সুধীজনের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। মঞ্চসজ্জার নকশা প্রণয়ন করেন টিপু আলম। শব্দ ও আলোক নিয়ন্ত্রণ করেন বিডি সাউন্ডের নিবিড় খান।

(সোনিয়া ও মাহবুব প্রেরিত তথ্য থেকে।)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত