প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চোখে দেখা সত্যই রাজনীতিতে সত্য নয়

বিভুরঞ্জন সরকার : ঘটনাটি ২০০৫ সালের। প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে আজ পুনরায় উল্লেখ করছি। আমার সঙ্গে একদিন আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের একজন নেতার দেখা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা গড়ায়। এক পর্যায়ে আমি তার কাছে জানতে চাই, আপনাদের দলীয় সভায় সংগঠন বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় না? তিনি যে জবাব দিলেন তা আমার কাছে ছিলো বিস্ময়কর। প্রথমে বললেন, যদি আমার নাম উল্লেখ করে কিছু লিখতে চান তাহলে আপনার প্রশ্নের কোনো জবাবই দেবো না। আর নাম-পরিচয় যদি গোপন রাখেন তাহলে বলবো, আমাদের দলীয় কোনো সভা নিয়মিত হয়ই না। বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে জেলা কমিটির সভা ডাকা হলেও তাতে সংগঠন নিয়ে তেমন কিছু আলোচনা হয় না। কেউ আলোচনা উত্থাপন করলে নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আলোচনা করা যাবে। আজ যে জরুরি বিষয় নিয়ে বসেছি, সে বিষয়ের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাক।

আমি জানতে চাই, আপনাদের নিয়মিত কোনো সাংগঠনিক কাজ-কর্ম নেই? তিনি বলেন, থাকবে না কেন? প্রত্যেক জেলায় আমাদের দলের মধ্যে একাধিক গ্রুপ আছে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে কুৎসাসহ নানা রকম রটনায় লিপ্ত আছি। এক গ্রুপ কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করলে অন্য গ্রুপ তা ভ-ুল করার চেষ্টা করি। মানুষের কাছে দলের আদর্শ প্রচারের চাইতে দলের ভেতর আমরা একে অপরকে কোণঠাসা করার কাজে বেশি উৎসাহী। বলা যায়, এটাই আমাদের সাংগঠনিক কাজ। এ নিয়ে আমরা ব্যস্ত আছি।

আমাকে বিস্মিত হতে দেখে তিনি আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, ঘাবরানোর কিছু নেই। আওয়ামী লীগ কোনো দল নয়, এটা হলো একটা জাতি। একটি দল ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু জাতি তো ধ্বংস হতে পারে না। কাজেই আওয়ামী লীগ নিয়ে আপনি কোনো দুর্ভাবনা করবেন না। বাংলাদেশের প্রত্যেক বাড়িতেই এক বা একাধিক বঙ্গবন্ধুর সৈনিক পাবেন। এদের কারো কোনো জ্ঞান দেয়ার প্রয়োজন নেই। এরা নিজেরাই আওয়ামী লীগের জন্য জান দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে।

তার দৃঢ় বিশ্বাসের মুখে আমার আর বলা হয় না যে, বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই এখন ‘শহীদ জিয়া’ অথবা ইসলামি জিহাদের সৈনিক পাওয়াও তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। এখন আর একতরফা কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। এখন শুধু জাতীয়ভাবে নয়, বাড়িতে বাড়িতে দল এবং দলাদলি।

প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে আরো একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে আমি আমার পরিচিত এক বিএনপি নেতার বাসায় গিয়েছিলাম। সেখানে আরো বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সবাইকে আমি চিনি না। আর আমাকে চেনেন না তাদের কেউই। ফলে আমার উপস্থিতি উপেক্ষা করে অথবা আমাকেও তাদের সমর্থক ভেবে খোলা মনে কথা বলছিলেন বিএনপির ভেতরের উপদলীয় কোন্দল নিয়ে। বোঝা গেলো, তারা সবাই একপক্ষ। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছিলেন। বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব-বিরোধের এ বিষয়টি আমার একটি লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম। আমার পরিচিত বিএনপির সে নেতা লেখাটি পড়ে ভীষণ ক্ষিপ্ত হন। টেলিফোনে আমাকে বেশ কর্কশ কণ্ঠে বলেন, কাজটি আপনি মোটেও ভালো করেননি। বিএনপির মধ্যে কোনো দলাদলি নেই। আমরা সবাই শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এখন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।

এরপর তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, ভবিষ্যতে যা দেখবেন বা শুনবেন তাই লিখে দেবেন না। চোখে দেখা সত্যকেই সব সময় রাজনীতিতে সত্য বলে ধরলে বিপদে পড়বেন।

আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য নিয়ে লিখলেও একই রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হতো। তবে আমি তারপর থেকে যা শুনি বা যা দেখি তা না লেখার চেষ্টা করি।

লেখক : গ্রুপ যগ্মসম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত