প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাই

সমকাল : জনগণের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে চান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনে করেন, জোরালো ‘সুপারভিশন’ ও ‘মনিটরিংয়ের’ মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে। অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ আছে, তাও বন্ধ হবে। মনিটরিং টিম ইতিমধ্যেই গঠন করা হয়েছে। এই টিমের মাধ্যমে চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি মনিটর করা হবে।

গত পাঁচ বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চাইছেন স্বাস্থ্য খাতকে জনবান্ধব খাতে পরিণত করতে। তিনি বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকেও নজরদারির আওতায় আনা হবে। পুরনো প্রকল্পের কাজে গতি আনার পাশাপাশি ইশতেহার অনুযায়ী নতুন প্রকল্প নিয়ে তা দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি। বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, সেগুলোকে তিনি সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে চান বলে জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক  একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে কোন কাজটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করতে চান- এমন প্রশ্নের জবাবে জাহিদ মালেক বলেন, সবার জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছি। এ জন্য এই খাতকে জোরালো সুপারভিশন ও মনিটরিং ব্যবস্থার মধ্যে আনাই তার প্রধান লক্ষ্য। এর ফলে কোনো চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তা বের করা যাবে। হাসপাতালে যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে আছে কি-না, নতুন কোনো যন্ত্রপাতি লাগবে কি-না, ওষুধ আছে কি-না তা তাৎক্ষণিকভাবেই জানা যাবে। এভাবে অনেক আর্থিক অপচয় ও দুর্নীতি-অনিয়মও বন্ধ করা যাবে।

মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কী কী বিষয় প্রয়োজন তা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। সরকারি খাতে যে মানবসম্পদ আছে, তার সঠিক বিন্যাস করতে হবে। স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কোথায় কতজন সার্জন প্রয়োজন, কতজন গাইনি, চর্ম ও যৌন, অ্যানেসথেসিয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ের চিকিৎসক প্রয়োজন, বর্তমানে এসবের কোনো সঠিক অনুপাত নেই। এই আনুপাতিক বিন্যাস নির্ণয় ও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসক ও নার্সের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বর্তমান পদ্ধতিতে হাসপাতাল পরিচালকের নার্সের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নার্সের পদোন্নতি, বদলি কোনো কিছুর জন্যই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হয় না। এটি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে ন্যস্ত রয়েছে। এর ফলে কোনো কর্মী কথা না শুনলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কিছু করার থাকে না। এ ক্ষেত্রে সমন্বয় আনা প্রয়োজন।

জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নমূলক যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে, আরও গতি সঞ্চার করে সেগুলোকে দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা মন্ত্রী হিসেবে তার আশু টার্গেট। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে যেসব প্রকল্প ও সেবার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোও দ্রুত শুরু করবেন তিনি। বিশেষ করে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে একটি করে ক্যান্সার হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট গড়ে তোলা হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে নতুন করে গড়ে তোলার একটি প্রকল্পও চলমান আছে। এটি সম্প্রসারণ করে পাঁচ হাজার শয্যার হাসপাতাল হবে। বিশ্বের কোথাও এতবড় হাসপাতাল নেই। ঢামেক হাসপাতাল হবে অত্যাধুনিক মানের। যেখানে সব ধরনের চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষা, নার্সিং শিক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সব ধরনের সুবিধা বিদ্যমান থাকবে। এটি দ্রুততম সময়েই শুরু করা হবে। একইসঙ্গে সরকারি নতুন পাঁচটি মেডিকেল কলেজের নির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু করা হবে। আরও ৫-৬টি মেডিকেল কলেজের নির্মাণ কাজ চলছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্পের কাজও দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা হবে।

মেডিকেল শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান এই জনবল তৈরি করেন, তাদের সক্ষমতার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে আগে। সে জন্য সরকারি মেডিকেল, ডেন্টাল ও নার্সিং কলেজের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। অনেকগুলো বেসরকারি মেডিকেল, ডেন্টাল ও নার্সিং কলেজ আছে, যেগুলো সত্যিকার অর্থে মানসম্পন্ন নয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান সরকার নির্ধারিত নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করছে। এগুলো নিয়মনীতির আওতায় আনা হবে।

গ্রামের কর্মস্থলে চিকিৎসকরা উপস্থিত থাকছেন না- এটি বেশ পুরনো অভিযোগ। গ্রামের কর্মস্থল, বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসকদের ধরে রাখার পরিকল্পনা সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকদের কর্মস্থলে ধরে রাখতে উৎসাহিত করা হবে। এ জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যেমন, উপজেলায় চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের এখন গাড়ি দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় গাড়ি দেওয়া হবে। তাদের ওপর থাকবে জোরালো মনিটরিং। সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেও যেসব চিকিৎসক পুরোদমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, তাদের তালিকা করা হয়েছে। তাদের খুঁজে বের করা হবে।

বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক সেবা পাচ্ছে। সরকার চায়, এটি মানসম্মতভাবে অব্যাহত থাকুক। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানও নিয়মমাফিক চলতে হবে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সবকিছু নিয়মমাফিক আছে কি-না, যন্ত্রপাতি সঠিক আছে কি-না, এসব দেখার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আনা চার্জগুলো মনিটর করা হবে। তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে কি-না তা দেখতে হবে। যদি আইন অনুযায়ী সেগুলো না চলে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনে অনেক রকম বিধান আছে, সেগুলোর মধ্যে জেল-জরিমানা এবং সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। এসব পদক্ষেপ ধাপে ধাপে গ্রহণ করা হবে।

হাসপাতালে বরাদ্দ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে জাহিদ মালেক বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনা হবে। প্রয়োজন নেই, এমন কোনো যন্ত্রপাতি কেনা হবে না। ক্রয়ের পদ্ধতি সরকার প্রণীত নিয়মনীতির শতভাগ প্রয়োগ করা হবে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয়তা সাপেক্ষে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হবে। সংশ্নিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চাহিদা পাঠাবে। যার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে বরাদ্দ দেওয়া হবে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় অংশ কমিউনিটি ক্লিনিক। এটির কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারের (সিএইচসিপি) পাশাপাশি একজন করে পরিবার পরিকল্পনা সহকারী এবং স্বাস্থ্য সহকারী কমিউনিটি ক্লিনিকে কাজ করেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণকে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রায় ৩০ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। পুরনো মডেলের কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিবর্তে নতুন মডেলের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কমিউনিটি এসব ক্লিনিকের প্রশংসা করেছে। সংস্থাটি বিশ্বের অন্যান্য দেশকে এই মডেল অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে। সুতরাং বলা যায়- কমিউনিটি ক্লিনিক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সহায়তা চান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আশা করি শুধু পদোন্নতি, পদায়ন এসব বিষয় নিয়ে বিএমএ এবং স্বাচিপ থাকবে না। বরং জনগণের মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য তারা অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত