প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পোশাক শিল্পে নিয়োজিত ১ লাখ ১৩ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস

সুজন কৈরী : গত বছর পোশাক শিল্পে নিয়োজিত ১ লাখ ১৩ হাজার ৩২০ জনকে অগ্নি নিরাপত্তা বিষয়ক ২ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এই শিল্পের ৮৪৬টি প্রতিষ্ঠানে মহড়া ও ৭৯টিতে সার্ভে করা হয়েছে। শিল্পখাতে নিরাপত্তা জোরদার করতে কর্মকর্তাদের জন্য ৬ মাসের ‘ফায়ার সেফটি ম্যানেজার কোর্স’ ও ‘ফায়ার সায়েন্স অ্যান্ড অকুপেশনাল সেফটি কোর্স’ নামের দুটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছে ফায়ার সার্ভিস বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান।

রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইসাব) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। ৬ষ্ঠ ইন্টারন্যাশনাল ফায়ার সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি এক্সপো-২০১৯ সামনে রেখে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, তিন দিনব্যাপী (১৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে এক্সপোটি। এবারের এক্সপোতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মান, ইতালী, তাইওয়ান, তুরস্ক, চীন, ভারতসহ ২৬টি দেশের ফায়ার সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটির খ্যাতিমান ব্রান্ড প্রতিষ্ঠানের পণ্য প্রদর্শিত হবে। এক্সপোতে মোট স্টল থাকছে ৭০টি। মেলার কো-পার্টনার ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, অ্যাসোসিয়েট পার্টনার বিটিএমএ, কল কারখানা অধিদপ্তর ও এনএফপিএ (ইউএসএ)। সাপোর্ট পার্টনার র‌্যাব ফোর্সেস। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি বেলা আড়াইটায় এক্সপোর উদ্বোধন করবেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রি: জেনারেল আলী আহমেদ খান, এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ও বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি বলেন, এটি একটি উদ্বেগের বিষয় যে, দেশে প্রচলিত দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, নতুন ধরনের দুর্ঘটনা যোগ হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। বলা যায়, দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে একটি বহুমাতৃকতা যোগ হয়েছে। বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তাতে আধুনিক ডেকোরেশনে মানুষ বিপুল পরিমাণ উচ্চদাহ্য ব্যবহার করছে। ফলে আধুনিকতার সঙ্গে বা উন্নয়নের সাথে সমানভাবে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। তবে আশার কথা হলো, এসব দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ কিন্তু সমান হারে বাড়েনি, বরং কমেছে। ফায়ার সার্ভিসের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে সচেতনতা যত বৃদ্ধি পাবে, অগ্নি নিরাপত্তা তত বৃদ্ধি পাবে এবং সংঘটিত দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত কমানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাস এবং সংঘটিত দুর্যোগে জান-মালের ক্ষতি সহনীয় পর্যায়ে রাখাতে ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। তবে এককভাবে শুধু ফায়ার সার্ভিসের জন্য এটি একটি দুরূহ কাজ। বেসরকারি উদ্যোগ একে সহজসাধ্য করে তুলতে পারে। দেশব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সেবা সংগঠনসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইসাব আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ফায়ার সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি এক্সপো পথপ্রদর্শকের ভ‚মিকা পালন করছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অগ্নি নির্বাপণের আধুনিক সরঞ্জাম ও টেকনোলজি সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভের ক্ষেত্রে এক্সপোটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

আলি আহাম্মেদ খান বলেন, সকল দুর্যোগে লাইফ সেভিং ফোর্স হিসেবে কাজ করে ফায়ার সার্ভিস। বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম একটি করে ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যে আমরা তিনটি প্রকল্প গ্রহণ করেছি। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগে সারা দেশে চালু ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ছিল ২০৬টি। আর এখন এ সংখ্যা ৪০২টি। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ৫৫৪টি হবে। এই সংখ্যা পর্যায়ক্রমে আট শতাধিকে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। আমাদের আশা, ২০২০ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম একটি করে ফায়ার স্টেশন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ^মানের আধুনিক অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম সংগ্রহ, পেশাগত বিষয়ে বিদেশে উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ, ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব বার্ন ট্রিটমেন্ট হাসপাতাল স্থাপন, ট্রেনিং সাপোর্ট ফায়ার স্টেশনের জন্য পূর্বাচলে ১৭ একর এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ৫ একর করে জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এসব কারণে আমাদের সেবার সামর্থ্য আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা এখন বহুমাত্রিক সেবাকাজে নিয়োজিত। অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধার কাজের পাশাপাশি জঙ্গি দমন অভিযানে অংশগ্রহণ, রেসপন্স টাইম কমিয়ে আনতে সারা দেশের হাইওয়েসহ ৯০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে র‌্যাপিড রেসকিউ ইউনিট মোতায়েন, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পরিচালনা, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ সংযুক্তি, পোশাক শিল্পের অগ্নি নিরাপত্তা প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি আমরা।

সংবাদ সম্মেলনে দেয়া ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে ২০১৮ সালে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯ হাজার ৬শ ৪২টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। এতে নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছে ১৩০ জন আর আহত হয়েছেন ৬৬৪ জন মানুষ। আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৮৬ কোটি টাকা। তবে বিগত পাঁচ বছরে এ ক্ষতির পরিমান প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। রাজধানী, বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জে আগুনে পুড়ছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, অফিসসহ অন্যান্য স্থাপন। সচেতনতা ও অগ্নিকান্ডের কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশিক্ষণসহ নির্বাপনের সরঞ্জাম রাখলে আগুনের ভয়াল থাবা থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, ক্রেতাদের চাপে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার বেশিরভাগই অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ব্যক্তি মালিকানাধিন অনেক ভবন, প্রতিষ্ঠান এখনো পিছিয়ে আছে। দশ বছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, কেবল রাজধানীতে এই সময়ে উচ্চ ভবনের হাড় বেড়েছে ৫১৪ শতাংশ। এসব ভবনে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা কতটুকু জোরদার করা গেছে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বিদ্যমানসহ নির্মিত সকল উচ্চ ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সম্পদ ও নিরাপত্তার স্বার্থে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব বলেই মনে করে সংস্থাটি। ডিজিট্যাল বাংলাদেশে ডিজিটাল সিকিউরিটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নানামূখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এতে অপরাধ প্রবনতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি আইনের আওতায় আনা গেছে অপরাধিদের। বর্তমান সময়ে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। যার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত গতির গাড়ি। সেইফটি ইকুইপম্যান্ট ব্যবহারের মাধ্যমে সড়কে নজরদারি বাড়ানো ও পরিবহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যা এখন সময়ে দাবি।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, অগ্নি নিরাপত্তা ও সিকিউরিটি ব্যবস্থা নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তারাও এগিয়ে এসেছেন। এখাতের ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ইসাব। যা ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। ফায়ার সেফটি এন্ড সিকিউরিটি ব্যবস্থার বিষয়ে সম্যক ধারণা দেয়ার আদর্শ স্থান হয়ে উঠবে এবারের এক্সপো। জনসাধারণ এই মেলা থেকে জানতে পারবেন আন্তর্জাতিক বিশ্বে ফায়ার সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটির খাতের উদ্ভাবিত সর্বশেষ প্রযুক্তি ও পণ্যের বিষয়ে। এছাড়া এসব ব্যবহারের জ্ঞান অজর্ন ছাড়াও মেলা থেকে অগ্নি নির্বাপন ও সিকিউরিটি পণ্যের স্থাপন বিষয়ে ধারণা পাবেন এক্সপো থেকে। মেলায় অগ্নি-নির্বাপনের মহড়া থাকবে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে। এছাড়া এবারের এক্সপোতে ৪টি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এবারের এক্সপো সামনে রেখে তারুণ্যের সৃজনশীল মেধা ও বিজ্ঞান মনকে কাজে লাগাতে ইসাবের পক্ষ থেকে আমরা আবিস্কারের খোঁজে নামে একটি ক্যাম্পেইন করেছি। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ক্যাম্পেইনে ফায়ার সেফটি, সিকিউরিট, রেস্কিউসহ এখাত সংশ্লিষ্ট ৭০টি প্রজেক্ট জমা পড়েছে। এর মধ্য থেকে অভিজ্ঞ বিচারিক প্যানেলের মাধ্যমে নির্বাচিত দশটি প্রজেক্ট এক্সপোতে প্রদর্শন করা হবে। আর সেরা ৩ টি প্রজেক্টকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিজয়ী ঘোষণা করে পুরস্কৃত করা হবে এক্সপোর সমাপনি অনুষ্ঠানে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত