প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকার যানজট নিরসন : দশ বছরে ৪৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ

বণিক বার্তা : দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখাসহ রাজধানীবাসীকে যানজটের দুর্বিষহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে গত ১০ বছরে সরকার কী কী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে, গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে জানতে চান ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা মহানগরীর যানজট সমস্যা নিরসনে গত ১০ বছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।

এসব প্রকল্প ও ব্যয়ের তথ্যও জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪২ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাদানী এভিনিউর পূর্বমুখী সম্প্রসারণের (প্রগতি সরণির ইন্টারসেকশন থেকে বালু নদ পর্যন্ত) কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। একই মন্ত্রণালয়ের অধীন বেগুনবাড়ি খালসহ হাতিরঝিল এলাকার সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে (কুড়িল থেকে বোয়ালিয়া পর্যন্ত) ১০০ ফুট প্রশস্ত খাল খনন ও উন্নয়নে বিনিয়োগের পরিমাণ ১০ হাজার ৩২৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়নে ৪১০ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। আর ৩৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে উত্তরা লেক উন্নয়ন প্রকল্পে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, মাদানী এভিনিউ থেকে বালু নদ পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও বালু নদ থেকে শীতলক্ষ্যা পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ (প্রথম পর্ব) প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ১ হাজার ২৫৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

রাজধানীর যানজট নিরসনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মাধ্যমে নেয়া প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউলুপে বিনিয়োগ হয়েছে ২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যয়ের পরিমাণ ৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া বিমানবন্দর থেকে মিরপুর সড়ক নির্মাণে ১৪৬ কোটি, মিরপুর সার্কেল ১০ থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নে ২১ কোটি ৮৭ লাখ ও মিরপুর গ্রামীণ ব্যাংক থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়ক নির্মাণে ২৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। সংসদে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, এর বাইরে ৪১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে মিরপুর সেনানিবাস বাইপাস সড়ক ও ৪৮৫ কোটি টাকা মিরপুর দারুস সালাম সড়ক নির্মাণে। এছাড়া শাহবাগ, শেরাটন, বাংলামোটর ও সোনারগাঁও ইন্টারসেকশনে আন্ডারপাস নির্মাণে ১৬৫ কোটি, রোকেয়া সরণি থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণে ২৫ কোটি ৭৬ লাখ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক উন্নয়ন, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণে বিনিয়োগের পরিমাণ ১ হাজার ২৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এছাড়া ইসিবি চত্বর থেকে মিরপুর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন এবং কালশী মোড়ে ফ্লাইওভার নির্মাণে বিনিয়োগ ৬১২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীন যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে ত্রিমুখী রাস্তা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ১৫৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এছাড়া সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও দয়াগঞ্জে রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত উন্নয়নে ২১ কোটি ৩০ লাখ, হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত উন্নয়নে ২৪ কোটি, শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল ও সারুলিয়ায় সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে ৭৩৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।

এরই মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে ডিএসসিসি। সদ্য ডিএসসিসিতে যোগ হওয়া শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল ও সারুলিয়ায়ও পুরোদমে চলছে উন্নয়নকাজ।

ঢাকার যানজট নিরসনে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের। মাত্র দুটি প্রকল্পেই প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সেতু বিভাগ। এর মধ্যে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায় হচ্ছে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর সড়কে বাসের জন্য পৃথক লেন (বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি) নির্মাণে ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

ঢাকার যানজট নিরসনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ও। এরই মধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মিটার গেজ রেলপথের সমান্তরালে একটি ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রায় অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ৩৭৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর বাইরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকায় ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে আন্ডারপাস ও ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

সব মিলিয়ে ঢাকার যানজট নিরসনে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪২ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। এ বিনিয়োগ সত্ত্বেও ঢাকার যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়নি। বরং যানবাহনের গতি আরো কমেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০০৪ সালে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। ২০১৮ সালে তা ঘণ্টায় সাত কিলোমিটারের নিচে নেমে এসেছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, যথাযথ পরিকল্পনা না করে শুধু একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পসর্বস্ব এসব উন্নয়ন দিন শেষে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ফ্লাইওভারগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এত টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার বানানো হলো। এখন দেখা যাচ্ছে, ফ্লাইওভারের উপরেও যানজট হচ্ছে। প্রকল্পসর্বস্ব উন্নয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করছেন তিনি।

ঢাকার উন্নয়নে কাজ করছে সরকারের আট মন্ত্রণালয়ের ২৬টি বিভাগ। এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের আরেক প্রতিবেদনে। বিশ্বব্যাংক বলছে, সংখ্যাটি বড় হলেও এগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের ঘাটতি। ফলে জলাবদ্ধতা, যানজট ও অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না ঢাকাবাসী।

তবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবস মো. নজরুল ইসলাম বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, ঢাকায় মেট্রোরেল, বিআরটির মতো বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে যানজট নিরসনে তা অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি আরো বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। সবক’টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকার যানজটের চিত্র একেবারে বদলে যাবে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত