প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরস্বতী পূজার একাল-সেকাল

চিররঞ্জন সরকার

মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি। দেবী সরস্বতীর পূজার দিন। সরস্বতী শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থে ‘সরস্+বতু’ স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত যোগে ‘সরস্বতী’। ‘সতত রসে সমৃদ্ধা’। তিনি শুক্লবর্ণা, শুভ্র হংসবাহনা, ‘বীণা-রঞ্জিত পুস্তক হস্তে’ অর্থাৎ এক হাতে বীণা ও অন্য হাতে পুস্তক। শিক্ষার্থীরা দেবী সরস্বতীর পূজা বেশি করে। কেন? কারণ তিনি জ্ঞানদায়িনী বিদ্যার দেবী। বিদ্যা দান করেন তিনি। মানুষ জ্ঞান পিপাসু। সর্বদা জ্ঞানের সন্ধান করে। ‘নহি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে’ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-৪/৩৯) অর্থাৎ ‘জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছু নেই’।
ছোটবেলায় দেখতাম সরস্বতী পূজার সঙ্গে কৈশোরের একটা গভীর সংযোগ আছে। আর সব পূজা বড়দের, কেবল বাড়িতে সরস্বতী পূজার সকালে ছোটদের বইপূজা, অঞ্জলি দেয়া, প্রসাদে বীরখ-ি (কেউ বা বলে তিলে পাটালি) আর বছরের প্রথম কুল (বরই) খাওয়া। গুরুজনদের সতর্কবাণী থাকতো সরস্বতী পূজার আগে কুল খেলে বিদ্যে হবে না। ঔপনিবেশিক এই দেশে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত পরিবার কাঠামোয় ‘বিদ্যা’ সম্পর্কে বড্ডই স্পর্শকাতরতা ছিলো। সকল পড়ুয়া-কিশোরদের কাছে, গাধার সামনে মুলার মতো ওই একটা আপ্তবাক্য অদৃশ্য অক্ষরে লেখা থাকতো লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে।
কথাটা এখন ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু সে কালে ওইটাই কিন্তু ছিলো উজ্জীবনের মূলমন্ত্র। সরস্বতীর বরপুত্র বলে একটা কথা শোনা যেতো। কিন্তু অভিজ্ঞতা ঘেঁটে দেখছি, মা সরস্বতী সম্পর্কে গভীর আস্থা ছিলো ততোটা গুডবয়দের নয়, যতোটা ছিলো ক্লাসের ব্যাক-বেঞ্চারদের। তারাই নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীকে ডাকতো, খুব চেষ্টা করতো কুল (বরই) না খেতে, কিন্তু খেয়ে ফেলতোই বনে-বাদাড়ে বা বেপাড়ায় গাছ ঝাঁকিয়ে, অবশ্য স্বীকার করতো না। সারা বছর যাদের হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসে চোখ জুড়ে যেতো শ্রান্তিতে, সারা বিকেল ধরে বল পেটানোর চোটে- তারাই এই অনধ্যায়ের একটি মাত্র দিনে ছিলো মা সরস্বতীর একনিষ্ঠ ভক্ত। ওই দিন পড়া নিষেধ। পড়তে বসতে বললে যাদের জ্বর আসতো, বইয়ের পাতার অক্ষরের জঙ্গলে যারা পথ হারাতো, তারাই সরস্বতীর মূর্তির পায়ের কাছে ভক্তিভরে রেখে দিতো ক্লাসের পাঠ্যবই ডাঁই করে- যদি দেবী দয়া করে ওই দুর্বোধ্য বিষয়গুলো কোনোভাবে বিদ্যার্থীর স্থবির মগজে অন্তঃপ্রবিষ্ট করিয়ে দেন, সেই ভরসায়।
পূজার পর মূর্তির পদতল থেকে গাদাফুলের ছেঁড়া টুকরো বইয়ের পৃষ্ঠার মধ্যে গুঁজে রেখে সে কী আত্মপ্রসাদ! ভাবটা, এবার কে আর ঠেকায় আমাকে। বাবার হাতের চড়, দাদাদের কানমলা, ক্লাসটিচারের বেত বা নিল-ডাউন করানো, এতো সব আয়োজন দিয়েও যাদের বিদ্যে ব্যাপারটা গেলানো যেতো না কিছুতেই, তাদের কিন্তু দেবীর ওপর আস্থা টলতে দেখিনি কোনোদিন। তারাই রাত জেগে লাল নীল হলদে রঙের কাগজ কেটে শিকলি বানাতো, দিদিদের বা পিসিদের দিয়ে আলপনা দেয়াতো মেঝেয়, জোগাড় করে আনতো গাছে চড়ে পলাশফুল, কাঁধে করে কুমোরপাড়া থেকে ঠাকুর আনাতে বা বিসর্জন দিতে তাদের উৎসাহের কিছু কমতি দেখিনি। অবশ্য পূজার চেয়ে প্রসাদ ভক্ষণের টানটা ছিলো বেশি। কখনও লুচি-লাবড়া-পায়েস, পিতলের ডেগে রাঁধা মুগের ডালের খিচুড়ি, বাঁধাকপির তরকারি আর কুলের চাটনি – আহ, এখনও যেন জিভে জল আসে। ভাবতে ভাবতে মনে এলো, এসব দিন কী একেবারেই পাল্টে গেছে? সরস্বতী পূজার দিনটা নিয়ে বড্ড যে আনন্দ আর মাতামাতি ছিলো আমাদের। সেই ভোরে ওঠা, ছাদের রোদে দাঁড়িয়ে খালি গায়ে তেল-হলুদবাটা মাখিয়ে মায়ের স্নান করিয়ে দেয়া হি-হি করা শীতে- তার রোমাঞ্চ কী আজকে আর নেই? কিংবা দিদি বা ছোট বোন যে আবদার করে শাড়িতে হলুদ রং মাখিয়ে নিতো, তার পরে সেই হলুদ শাড়ি আধগোছানো করে পরে সে কী ছুট স্কুলের দিকে। ‘কৈশোর-যৌবন যবে দোহে দেখা দিলো’, সেই সময়ে পথে বেরিয়ে বন্ধুদের নিয়ে মেয়ে-স্কুলে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সেই অদম্য টানটা আজও কী ছেলেদের আছে? মাঘের উতলা হাওয়ায় কলেজের সহপাঠিনীদের শ্যাম্পু করা চুলের ছড়ানো সুবাসে বুকের মধ্যে দামামা বাজার প্রহর কী আজও নেই? কী জানি।
শ্বেতপদ্মাসনা দেবীর দিকে চাইলে এখনও কতো মধুর মধুর ধ্বনি বাজে। নিভৃতবাসিনী বীণাপাণির অমৃতমুরতিমতি বাণীর চেয়ে অনেক সজীব আমাদের সেই অভিমানী বিদ্যার্থী জীবনের শুভ্র স্মৃতি। শুভ্রই তো, তাতে এক ফোটা স্বার্থকলঙ্কের দাগ লাগেনি আজও। আমাদের ছোটবেলায় সরস্বতীর মূর্তিপূজা কলেজে বা স্কুলে হলেও বাড়িতে হতো বইপূজা। একটা কাঠের জলচৌকিতে আসন পেতে তাতে রাখা হতো বই, দোয়াতে দুধ ভরে তাতে থাকতো খাগের কলম আর যবের শিষগাছ। পুরুতমশাই এসে সংস্কৃত মন্ত্র পড়ে তাতেই আবেশ তৈরি করতেন। তিনবার পুষ্পাঞ্জলি দেবার জন্য ঝুরো ফুলের আয়োজন থাকতোই। দূর থেকে যারা ফুল ছুড়তো বইকে লক্ষ্য করে, তাদের কারও কারও লক্ষ্য থাকতো ঠাকুরমশাইয়ের মাথার দিকে। ফলে গাঁদাফুলের পাপড়িশোভিত সেই মানুষটিকে দেখে ভারি কৌতুক লাগতো। আমাদের নজর থাকতো অবশ্য বড় পরাতের প্রসাদের থালার দিকে। পরে তার থেকেই হবে প্রসাদ বিতরণ, যাতে থাকবে খই-চিঁড়ে-আখের টুকরো-খেজুর-কুল-সাদা বীরখ-ী-সাদা কদমা-সন্দেশ-মুড়কি। এই মুড়কি আবার দু’রকম। কনকচূড় ধান থেকে খই বানিয়ে তাতে চিনির রস আর এলাচের গন্ধ দিয়ে চিনির মুড়কি। আরেক রকম মুড়কি হতো নতুন খেজুর গুড় দিয়ে। এখন আর এসব ভক্ষ্যের কী-ই বা মহিমা আছে? ক্যাডবেরি-কোক-চিপস-চিকেন ফ্রাইয়ের স্বাদে একালের বাচ্চাদের রুচি পাল্টে গেছে। নতুন গুড়ের পায়েসের সাধ্য কী যে, নবীন কিশোরদের আকর্ষণ করে। তবে কী সরস্বতী পূজা আজ কেবল আমাদের দুর্মর স্মৃতিকাতরতা? সত্যিই বছরে এই একটা দিনের সকাল দেখবার মতো। দ্রুত ভ্রাম্যমাণ বা সাইকেলবিহারী পুরোহিত মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটছেন বাড়ি-বাড়ি আর তাকে আকশির মতো আটকে ধরে কাতরকণ্ঠে মিনতি: প্লিজ, ঠাকুরমশাই একটুখানি ফুল ফেলে যান, প্লিজ, বাচ্চাগুলো অঞ্জলি দেবে বলে উপোস করে আছে। একদিকে অনিচ্ছুক পূজারী, আর একদিকে অসহায় গৃহস্থ। দেখবার মতো সেই টানাপড়েন। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের লেখা ‘সরস্বতী’ বইটিতে আছে, ‘সরস্বতী নিজে স্ত্রী দেবতা, কিন্তু স্ত্রীলোকেরা অঞ্জলি দিতে পাইতো না। বাঙালির বোধহয় ভয় ছিলো, পাছে মেয়েরা দেবীর অনুগ্রহে লেখাপড়া শিখিয়া ফেলে।’ এখন বিদ্যাদেবী কম্পিউটার-ট্যাব-ল্যাপটব-মোবাইলের রূপ ধরে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এখনকার বিদ্যা ইন্টারেনেটের বিশ্ববিদ্যা। তার কৃপায় কিন্তু লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে একইসঙ্গে লাভ করা যায়। কাজেই একালের মা সরস্বতীর পদতলে আর বই রেখে লাভ নেই, কারণ ভেতরে ভেতরে এই হংসবাহনা মা যা হয়েছেন, তার বিগ্রহ হলো কম্পিউটার-ট্যাব-ল্যাপটব-মোবাইল বাহনা বিশ্ববিদ্যাদায়িনী। আসুন সরস্বতী পূজার দিনে কম্পিউটার-ট্যাব-ল্যাপটব-মোবাইল-ইন্টারেনটসহোযাগে একটা নতুন অধ্যায় শুরু করি।
বাংলাদেশে এখন প্রায় চার কোটি মানুষের হাতের মুঠোয় দুনিয়া। এই মানুষগুলো স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। একটি ফোন সম্পূর্ণ জীবনকে কীভাবে বদলে দিতে পারে, কয়েক বছর আগে তা কল্পনারও অতীত ছিলো। বস্তুত, স্মার্টফোন কেড়ে নিলে এখন অনেকেরই জীবন থমকে যাবে। এখন অনেকেই নিজ নিজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে অনলাইন কেনাকাটা করছেন, নানা তথ্য আদান-প্রদান করছেন, দেশে-বিদেশে কথা বলছেন, এর সবই তো মা সরস্বতীর কৃপা। একালের ছেলেমেয়েরা মা সরস্বতীর কাছে আর বিদ্যা প্রার্থনা করে না। তারা প্রার্থনা করে : মা, দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট পরিষেবা দাও, বিনা পয়সায় ইন্টারনেট সেবা দাও, ওয়াই-ফাই দাও, মোবাইল ডাটা সস্তা করে দাও। এখন ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে বিদ্যা, কম্পিউটার-ট্যাব-ল্যাপটব-মোবাইল হয়ে উঠেছে বিদ্যার বাহন! আগামী দিনে শিশুরা দেবী সরস্বতীকে কম্পিউটার-ট্যাব-ল্যাপটব- মোবাইলের অবয়ব দিয়ে পূজা করলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না!

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত