প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিসের অবদান

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী : ইংরেজি বর্ষপঞ্জির হিসেবে আমরা এখন যে মাসটি অতিবাহিত করছি, তার নাম ফেব্রুয়ারি। আর ফেব্রুয়ারি মানেই ভাষার মাস। আমাদের মাতৃভাষার বিজয়ের মাস। তাই ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের মাঝে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখা যায়। ভাষার মাস নিয়ে, একুশের চেতনা নিয়ে সারাদেশে বয়ে যায় আলোচনা- সেমিনারের জোয়ার। দেশের বুদ্ধিজীবী ও লেখকশ্রেণীও ব্যস্ত হয়ে ওঠেন মিডিয়া পাড়ায়।

রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যে সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল তার নাম- তমদ্দুন মজলিস। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের তরুণ অধ্যাপক আবুল কাসেম। ভাষা আন্দোলনে বহু সংগঠন ও ব্যক্তির অবদান থাকলেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তমদ্দুন মজলিসের অবদান ছিল অপরিসীম। অথচ আমাদের আজকের লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বলতে বা লিখতে গেলে এই ঐতিহাসিক সত্যকে চেপে যান। তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শুরু করেন সালাম-রফিকের শহীদ হওয়া দিয়েই। অথচ ১৯৪৭-এর দেশবিভাগের বছরেই ভাষা আন্দোলন শুরু হয় তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে।

মূলত তমদ্দুন মজলিস ছিলো একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বও এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে এ সংগঠনটির নাম ‘তমদ্দুন মজলিস’ হলেও পাকিস্তানে এর নাম ছিল পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস। ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন ছিল এই সংগঠনের স্বপ্ন। তাই ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সাথে যোগ হওয়া বাঙালিরা যখন বুঝতে পারে বৃটিশদের ভূত পাকিস্তানি শাসকদের ঘাড়েও চেপেছে। অর্থাৎ মুসলিম হয়েও পাকিস্তানিরা অপর মুসলিম বাঙালিদের উপর জুলুম-অত্যাচার চালাচ্ছে, মাতৃভাষা বাংলাকে গলা টিপে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে, তখনই তমদ্দুন মজলিস নড়েচড়ে উঠে। কারণ, তমদ্দুন মজলিসের নেতৃবৃন্দ ছিলেন সাচ্চা মুসলমান। তারা জানতেন পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষাই আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি। তিনিই সকল ভাষার স্রষ্টা। বৈচিত্র্যময়ী এইসব ভাষা মানুষের জ্ঞানভাণ্ডারকে করে সমৃদ্ধ ও গতিশীল। কেননা, এতে রয়েছে চিন্তকদের অনন্য উপাদান।

পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তায়ালা সে কথাই বলছেন, ‘আর তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্রতা। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শনাবলী।’ (সূরা রূম : ২২) এ জন্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর পয়গাম্বরদের মাতৃভাষাভাষী করেই পাঠিয়েছেন। এর প্রমাণস্বরূপ রয়েছে পবিত্র কোরআনের ইরশাদ, ‘আমি সব পয়গাম্বরকেই তাঁদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি। যেন তাদের পরিষ্কার বুঝাতে পারেন…।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪)

সুতরাং বাংলাভাষা চর্চা যে পাপের চর্চা নয়, তা তারা ভালো করেই জানতেন। আর জানতেন বলেই ১৯৪৭ এর ১৫ ই সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস ভাষা আন্দোলনের উপর প্রথম বই ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা- না উর্দু?’ প্রকাশ করে। তারপর ১৯৪৭ সালে ১২ নভেম্বর ফজলুল হক হলে সভা ডাকে। (বরাত : আজাদ, ১৫ নভেম্বর ১৯৪৭)

তমদ্দুন মজলিশ শুধুমাত্র পুস্তিকা প্রকাশ আর সভা-সেমিনার করেই ক্ষান্ত থাকেনি। বরং সরকার পর্যন্ত তাদের দাবিদাওয়া পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। তমদ্দুন প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম ও তার সহযোগীরা মাতৃভাষা বাংলার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্বাক্ষর নিয়ে ১৪ নভেম্বর ১৯৪৭ এ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে আলোচনা করে আশ্বাস লাভ করেন। যদিও পাকিস্তান সরকার তাদের কথা রাখেনি।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকা সফরে এসে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলে বসেন, ‘পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ নাজিমুদ্দিনের এই বিশ্বাসঘাতকতায় পূর্ববাংলার জনতা ফুঁসে উঠে। এই ফুঁসে ওঠার পেছনে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। কিন্তু আফসোসের কথা, যে সংগঠনটির মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে ওঠে, সেই তমদ্দুন মজলিসের কথাই আজকের বুদ্ধিজীবীদের কথায়, লেখায় ও আলোচনায় কম উচ্চারিত হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত