প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধর্ষণ-গণ ধর্ষণ বাড়ছেই, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিতের দাবি বিশেষজ্ঞদের

এস এম নূর মোহাম্মদ : ধর্ষণ, গণ ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যা। বিষয় গুলো শুনতে বা বলতে কারো ভাল লাগার কথা নয়। কিন্তু পত্রিকার পাতা খুললে প্রায় প্রতিদিনই এসব ঘটনার শিরোনাম চোখে পড়ছে। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে পত্রিকা পড়তে বসলে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। তবে গণ মাধ্যমে যা প্রকাশিত হচ্ছে বাস্তবতা তার চেয়েও ভয়াবহ। কেননা ধর্ষণের শিকার হলে মান-সম্মানের চিন্তা করে অনেকেই ঘটনা প্রকাশ করতে চান না। ঘটনা জানা-জানি হলেই কেবল বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর তখনই বিষয়টি গণ মাধ্যমে শিরোনাম হয়। অবশ্য অনেকে মান-সম্মানের কথা না ভেবেই বিচারের উদ্যোগ নেন।

ধর্ষণ, গণ ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বিশেষ আদালত গঠন করার পরও এসব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একজন গৃহবধু ক্ষমতাসীন দলের একজন স্থানীয় নেতার নেতৃত্বে গণ ধর্ষণ এবং নির্যাতনের শিকার হন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এ নিয়ে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। তবে এর রেশ না কাটতেই ওই এলাকায় আবারও গণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তবে কেবল নোয়াখালীর ঘটনাই নয়। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছে। আর রাজধানীসহ সারাদেশের চিত্র প্রায় একই রকম।

মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫২টি। এরমধ্যে গণ ধর্ষণ ২২টি। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে। এর মধ্যে ১৫ জনই শিশু-কিশোরী। এর মধ্যে দুই বছরের শিশুও রয়েছে। মহিলা পরিষদের মতে, গত বছর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৪২ টি। এরমধ্যে গণ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮২ জন নারী। আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬৩ জনকে।

আসকের হিসাব মতে, গত পাঁচ বছরে ধর্ষণজনিত হত্যার শিকার হয়েছে ২৭৮ জন। ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে ৪২ জন। আর আত্মহত্যাকারীদের ৮৬ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের মধ্যে। আসকের হিসাবে ২০১৪ সালে ৬২৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। আর ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮১৮।

তবে ধর্ষণ ছাড়াও নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হন নারীরা। অনেক সময় আপনজনের হাতেই নির্যাতিত হতে হয়ে তাদের। সুপ্রিম কোর্ট থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৫৬৫ টি মামলা। এরমধ্যে ৫ বছরের অধিক সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে ৩৯ হাজার ৮২১ টি মামলা। আর উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে ৯৯৫টি মামলা।

এদিকে এসব ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাকদের মধ্যে। তারা বলছেন, সরকারকে দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে সমাজে অপরাধ বাড়বে, বাড়বে বিশৃঙ্খলা। আর বিশেজ্ঞরা বলছেন এ সমস্যা সমাধানে আইনের যথা-যথ প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মূলত মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারনেই এসব অপরাধ বাড়ছে। তাই সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরিতে উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্রকে।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ঘটনার সঠিক তদন্ত করে সঠিক রিপোর্ট দিলে এবং দণ্ডাদেশ নিশ্চিত করতে পারলে এসব অপরাধ দমন করা সম্ভব হবে। তদন্ত কর্মকর্তা-বিচারকদেরকে সচেতন থাকতে হবে যাতে আইনের বিধান সঠিকভাবে পালন হয়। আর অভিভাবকদেরকেও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, দুই-তিন বছরের শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এসব বিকৃত মানসিকতা। এর জন্য ক্যামেরা ট্রায়াল হওয়া উচিৎ। যাতে অন্যরা বিচার দেখে অপরাধ করতে উজ্জিবিত না হয়।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, সব কিছুর ঊর্দ্ধে হলো সুশাসন-গণতন্ত্র। যে দেশে সুশাসন-গণতন্ত্র নেই, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিরা মিথ্য কথা বলে সে দেশ এসব ঘটেই থাকে। সব কিছুর আগে দেশে সুশাসন আনতে হবে, বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতি থাকতে পারবে না- তাহলে এসব দমন করা সম্ভব। শাস্তি বাড়ানো নয়, শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, দ্রুত বিচার শেষ করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যবোধের যে অবক্ষয় হয়েছে, তা থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হবে। সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে জেলা, উপজেলা-গ্রাম পর্যায়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। স্বপ্ন দেখাতে হবে জাতিকে উল্লেখ করেন তিনি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত