প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : মেগা প্রকল্পে নেই জীবনদায়ী চিকিৎসাসেবা

বণিক বার্তা : পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীরে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আর্থিক ব্যয়ের দিক থেকে বৃহত্তম এ প্রকল্পে চিকিৎসাসেবার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি উপেক্ষিতই থেকে গেছে। প্রকল্পে কর্মরত দেশী-বিদেশী কেউ আকস্মিক দুর্ঘটনার শিকার হলে বা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের জীবন রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কোনো ব্যবস্থা নেই এখানে। জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন পড়লে পাড়ি দিতে হয় সাত-নয় কিলোমিটার দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আরো গুরুতর অবস্থার ক্ষেত্রে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল বা রাজশাহী নিয়ে যাওয়ার পথে রোগীর মৃত্যু ঘটারও নজির রয়েছে।

২০২৩ সালের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট চালুর লক্ষ্য নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করছেন সাড়ে ছয় হাজার থেকে সাত হাজার কর্মী। প্রকল্পে কর্মরত রুশ কর্মকর্তার সংখ্যা সহস্রাধিক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটিতে বর্তমানে রুশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আওতায় নির্মাণকাজে নিয়োজিত রয়েছেন বাংলাদেশী ৫ হাজার ২০০ শ্রমিক। রুশ নাগরিক কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৩৬২ জন। এছাড়া রুশ প্রকৌশলীদের সহযোগিতার জন্য দোভাষীসহ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কয়েকশ কর্মকর্তাও রয়েছেন এখানে।

বিশাল এ কর্মযজ্ঞে প্রায়ই ঘটছে নানা রকম দুর্ঘটনা। কখনো ক্রেন ভেঙে পড়ছে। আবার নির্মাণাধীন অবকাঠামোর ইট, রড পড়ে নির্মাণ শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের আহত-নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অচেনা আবহাওয়ায় নানা কারণে মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন রুশ কর্মকর্তারাও। কিন্তু প্রকল্পে দেশী-বিদেশী শ্রমিক-কর্মকর্তাদের জীবন রক্ষায় পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় কেউ আহত বা অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে যেতে হয় সাত-নয় কিলোমিটার দূরের ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সেখানেও চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়ে পরিচালিত উন্নতমানের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকও নেই। ফলে যেসব রোগীর অবস্থা খুব বেশি আশঙ্কাজনক, তাদের নিয়ে যেতে হয় রাজশাহী বা অন্য কোনো স্থানে। এতে করে দূরের হাসপাতালে নেয়ার সময়ে কখনো কখনো পথিমধ্যেই মারা যাওয়ারও ঘটনা ঘটছে।

গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত রুশ নাগরিক আহুন গিয়ানভ নোফেন (৫৬)। তিনি রাশিয়ান এএমটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। গভীর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে আবাসিক ভবনে ফেরত পাঠানো হয়। সকালে আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর প্রকল্পে কর্মরত চিকিৎসকের পরামর্শে আবারো হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

একই বছরের ১৬ আগস্ট মারা যান ইগর মিখাইলোভিচ (৬৫) নামের আরেকজন। প্রকল্পে রোসাটমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুকে ব্যথা অনুভব করায় সহকর্মীরা তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার আরো অবনতি হলে মেডিকেল অফিসার তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। হাসপাতালে নেয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। একইভাবে চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান শেরগিন ভাইলি (৫৯) নামের আরেক রুশ নাগরিক।

গত ২১ জানুয়ারি প্রকল্পের আবাসিক এলাকা শহরের নতুন হাটের গ্রিন সিটিতে রাসেল নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ভবনের ওপর থেকে পাইপ পড়ে তিনি প্রাণ হারান।

এর ১০ দিন আগে ১১ জানুয়ারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লির কাজে নিয়োজিত ক্রেন ভেঙে কয়েকজন আহত হন। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর চুল্লির ক্রেন দুর্ঘটনায় মারা যান শিকন হোসেন নামের আরেক শ্রমিক। এ ঘটনায় জুয়েল রানা নামের আরেকজন আহত হন। এদের কেউই প্রকল্প এলাকায় কোনো চিকিৎসাসেবা পাননি। আবার এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নেয়ার পথেও মারা গেছেন কেউ কেউ।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পে ছয়জন রুশ নাগরিক ও ১১ জন বাংলাদেশী শ্রমিক মারা গেছেন। রুশ নাগরিকদের প্রায় সবাই হূদরোগে মারা গেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশী শ্রমিকরা প্রাণ হারিয়েছেন অবকাঠামো থেকে পড়ে গিয়ে বা ইট ও রডের আঘাতে অথবা বালির নিচে চাপা পড়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের সাইট ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানান, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা গুরুতর অসুস্থতার সেবা দেয়ার মতো পূর্ণ মেডিকেল সাপোর্ট এখনো নেই। প্রাথমিকভাবে যতটুকু সেবা দেয়া যায়, তার ব্যবস্থা রয়েছে। দিনে দিনে এটি আরো সমৃদ্ধ করা হচ্ছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি এখানে একটি টিম নিয়োগ দেয়া হবে।

ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম শামীম বলেন, স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রকল্পে কর্মরত বিদেশী নাগরিকরাও এখানে সেবা নিয়ে থাকেন। আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাধ্য অনুযায়ী আমরা তাদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। প্রকল্পের শুরু থেকে বিদেশীদের নিয়মিত সেবা দিচ্ছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। গত কয়েক বছরে পাঁচ-ছয়জন রুশ নাগরিক মারা গেছেন। যাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ডেথ সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত