প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দিল্লিতে জেসিসি বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি
দুই দেশের সম্পর্ককে স্থায়ীরুপ দিতে হবে, মোংলায় ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ৪ বিষয়ে চুক্তি

আসিফুজ্জামান পৃথিল : বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সহায়তার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। দুই দেশের পঞ্চম যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) বৈঠকের পর শুক্রবার বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষ থেকে প্রচারিত যৌথ বিবৃতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন অধ্যায় রচনার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এক বছর ধরে নানান বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও, নতুন করে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে সহায়তার নিত্য নতুন ক্ষেত্র। নতুন ক্ষেত্রগুলো তৈরী করা হয়েছে ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই। এর মধ্যে রয়েছে- মহাকাশ, পারমাণবিক শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ইলেক্ট্রনিক্স। এগুলো সবই উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্র।

জেসিসি বৈঠকে মোট ৪টি বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এগুলো হলো; বাংলাদেশের ১ হাজার ৮০০ আমলাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেবে ভারত, বিকল্প চিকিৎসার বিকাশে ওষুধি গাছগাছড়া তৈরিতে ভারতের আয়ুষ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআইয়ের সঙ্গে, মোংলায় ইন্ডিয়ান ইকোনমিক জোনে লগ্নি আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন কর্তৃপক্ষ চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ভারতের হীরানন্দনী গোষ্ঠীর সঙ্গে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও ভারতের প্রসার ভারতীর মধ্যে একটি চুক্তি বিবেচনায় থাকলেও তা হয়নি। এটি না হওয়ার কারণ দুই দেশের কর্তৃপক্ষ পরিস্কার করেনি।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জওহরলাল নেহরু ভবনে গতকাল শুক্রবার জেসিসির এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। জেসিসির বৈঠকের আগে জওহর ভবনেই দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী একান্ত বৈঠক করেন। এই বৈঠকে মিয়ানমার থেকে বিতারিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে সুষমা স্বরাজ ড. মোমেনকে বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ভারত সহায়তা অব্যাহত রাখবে। বৈঠক চলাকালে দুই পক্ষই দুই দেশের চলমান সহায়তা নিয়ে কথা বলেছেন।

এছাড়াও ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত যৌথ পরামর্শক কমিশনের ৪র্থ বৈঠকের অগ্রগতি বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তিস্তা নদীর পানি বন্টনসহ সকল যৌথ নদীর পানি বন্টনের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন অনুরোধ করেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, তারা তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তি দ্রুততম করার জন্য কাজ করবেন।’ দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রী আরো বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সূচনা হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে। দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত মিত্রতার অনেক উর্ধে। দুই দেশ ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভাষা ছাড়াও একই ধরণের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষতা এর উন্নয়নের দর্শনে বিশ^াস করে। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠক প্রায় আধাঘণ্টা স্থায়ী হয়। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এক টুইটার বার্তায় বলেন, এটি হচ্ছে আস্থা ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সময়োত্তীর্ণ সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের এই দৃঢ় বন্ধনের সৃষ্টি।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই সম্পর্ককে এমনভাবে স্থায়ীরুপ দিতে হবে, যেখান থেকে পেছনে যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি কর্তাদের বলেছেন, সম্পর্ককে এমন উচ্চতায় স্থাপন করতে হবে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সঙ্গে মানানসই হবে। জেসিসি বৈঠকের শুরুতেই সুষমা স্বরাজ অভিনন্দন জানান ড. মোমেনকে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশ যে বিশেষ গুরুত্ব দেয়, সে কথা উল্লেখ করে মোমেন বলেন, প্রথম সফর হিসেবে ভারতকে বেছে নেওয়া তার প্রমাণ। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, এই বৈঠকে তা পর্যালোচনা করা হয়। নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, লগ্নি, বিদ্যুৎ ও শক্তি, নদীর পানি বণ্টন, যোগাযোগ, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনে সহযোগিতার গতিতে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীই সন্তোষ প্রকাশ করেন।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী মনে করেন, মোংলা বন্দরের চুক্তি ছাড়া বাতি চুক্তিগুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ন নয়। এই চুক্তির ক্রণে বাংলাদেশ স্বাগত ও অভিনন্দন জানানো উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। এই বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত-চীন একটি ক্রিতোণ রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থায় রয়েছে। এর ঠিক কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। ভারতের দুশ্চিন্তা বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে। এই চুক্তিতে দেশটি আস্বস্ত হবে। বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে দুই দেশের প্রতিযোগিতায় ভারত চাপের মুখে রয়েছে। বাংলাদেশ দুই পক্ষকে দক্ষতআর সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে এই চুক্তি তার প্রমাণ।

আফসান চৌধুরী বলেন, শুধু চুক্তি করলেই হবে না, এই চুক্তিকে ব্যবহারও করতে পারতে হবে। বাংলাদেশ অনেক সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রে যেনো তা না হয়, তা খেয়াল রাখা জরুরী। আফসান চৌধুরী বলেছেন, এই একটি চুক্তির কাছে অন্য ৩টি চুক্তি গুরুত্ব হারাচ্ছে। কারণ আমাদের আমলাদের আসলে বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। তারা এমনিতেই দক্ষ ও উচ্চ শিক্ষিত। আর ভেষজ ওষুধ তৈরীর চুক্তি অলঙ্কৃত চুক্তি ছাড়া কিছুই নয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ