প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বরিশালের প্রতিটি হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্যে সর্বস্ব হারাচ্ছে রোগী

হীরা, বরিশাল: “ও ডাক্তার ও ডাক্তার। তুমি কতো শত পাস করে এসেছো বিলেত ঘুরে মানুষের যন্ত্রণা ভোলাতে। তোমার এমবিবিএস নামা এফআরসিএস বোধ হয় এ টু জেট ডিগ্রী ঝোলাতে। ডাক্তার মানে সেতো, মানুষ নয় আমাদের চোখে সেতো ভগবান, কসাই আর ডাক্তার একিতো নয় কিন্তু দুটোই আজ প্রোফেশন, কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে, তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার”।

পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী নচিকেতার তুমুল আলোচিত এই গানটির কথাগুলোর সাথে বরিশালের বাস্তবতা পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে। এখানে শুধু ডাক্তারের হাতে নয়, রোগীরা জবাই হচ্ছেন কয়েকটি স্তরে। সেবার ন্যূনতম বালাই না থাকলেও রোগীদের গুনতে হচ্ছে কাড়ি-কাড়ি টাকা। বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে সর্বস্ব হারিয়েও মিলছে না কাঙ্খিত সেবা।

নামসর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগী টানতে ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে নারী ও পুরুষ দালাল। বিশেষ করে দালাল চক্রটি অবস্থান নিয়ে থাকেন শহরের প্রবেশদ্বার রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড, নথুল্লাবাদ ও লঞ্চ টার্মিনাল এলাকাসহ জেলার বাহিরের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে। তাদের টার্গেট থাকে গ্রাম-গঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সহজ-সরল মানুষকে নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিকে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানকার কথিত ডাক্তারকে দেখিয়ে কয়েক হাজার টাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পাদন করা। এই টার্গেট পূরণ করা গেলেই শতকরা ৩০ শতাংশ টাকা পেয়ে যায় একেকজন দালাল। যে কারনে ডায়াগনস্টিকের দালালরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। রোগী টানতে গিয়ে ঘটনাচক্রে দালালদের মধ্যে হাতাহাতি থেকে মারামারির ঘটনাও ঘটছে।

গত ২ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় কেয়া বেগম নামের এক গৃহবধূ সদররোডস্থ ল্যাবএইড ডায়ানগস্টিকে ডাক্তার দেখাতে আসলে তাকে এক দালাল প্রলোভন দেখিয়ে একজন নাম সর্বস্ব হৃদরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তার ফি বাবদ সাতশত টাকা দাবি করলে ওই নারী ছয়শ’ টাকা দিয়ে আসেন। পরবর্তীতে সেই দালাল নারীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে নিয়ে যায় নগরীর আগরপুর রোডের দি মুন মেডিকেল সার্ভিসেস নামক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে ওই নারীর কাছ থেকে ২৪শ’ টাকা রেখে রিপোর্ট দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জর্ডন রোডের একটি ভবনের পরিত্যক্ত কক্ষে। সেখানে ওই নারীকে রেখে পালিয়ে যায় দালাল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কাউকে না পেয়ে ওই নারী কান্নাকাটি শুরু করেন। এমন অবস্থায় নারীর কান্নাকাটিতে স্থানীয়রা জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই কতিথ সেই ডাক্তার ওই নারীকে নিয়ে যাবার জন্য তার ভাড়াটিয়া দুইজন ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে দেন। বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের নাগালে পাওয়া মাত্রই গণধোলাই দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। ফলে বলার আর অপেক্ষা থাকেনা যে বরিশালের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বর্তমান অবস্থা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীতে কমপক্ষে ২০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে সম্পূর্ণ রূপে দালাল নির্ভর। একইভাবে শহরের অলিগলিতেও পরিচালিত হচ্ছে নামসর্বস্ব অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব ডায়াগনস্টিকগুলোর পরীক্ষা নিরীক্ষার মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। নিম্নমানের এসব ডায়াগনস্টিকগুলোতে কমপক্ষে শতাধিক দালাল নিয়োজিত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে বিগত সময়ে কয়েকজন দালালকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করলেও কয়েক দিনের মধ্যে তারা জামিনে মুক্তির পর ফের দালালিতেই নিয়োজিত হচ্ছে। এরমধ্যে এক দালাল বর্তমানে আগরপুর রোডে এখন একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলেছে। ওই দালালের বিরুদ্ধে চিকিৎসককে হত্যাসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বিভাগীয় শহরসহ জেলার বাহিরের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালের সামনে বাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে নামে বেনামে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা বেসরকারী ক্লিনিক। যেখানে হাসপাতালের কতিপয় অসাধু চিকিৎসক মোটা অংকের টাকা কমিশনের আশায় দালালের মাধ্যমে রোগীদের পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে থাকেন। এখানে সাধারণ রোগীরা সেবার বদলে অর্থকড়ি খুঁইয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসায় রোগীদের প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটছে। সর্বশেষ ৬ ফেব্রুয়ারী রাতে শেবাচিম হাসপাতালের এক চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় পাঁচ মাসের শিশু রেদোয়ানের মৃত্যু হয়েছে। ওই চিকিৎসক শেবাচিম হাসপাতালে শিশুটিকে চিকিৎসা দিলেও তার স্বজনদের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে পাঠায় চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার নগরীর হাসপাতাল রোডের বেস্ট ফার্মেসীতে। সেখানে গিয়ে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওই ফার্মেসীর কর্মচারীরা শিশুটিকে ইনহেলার দেয়ার সাথে সাথে শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন। জেলার বাহিরে দালালের মাধ্যমে এক প্রসূতি নারীকে ভর্তি করা হয় আগৈলঝাড়া উপজেলার বেসরকারী দুঃস্থ মানবতার হাসপাতালে। সেখানে ভুল চিকিৎসায় ওই প্রসূতি মারা যায়। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমান আদালত গত ৬ ফেব্রুয়ারী ওই হাসপাতালের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, গৌরনদী উপজেলা হাসপাতালের সামনে ব্যাঙের ছাতার মতো গজে ওঠা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টেস্ট বাণিজ্য, হাসপাতালে রোগীদের কাছ থেকে কতিপয় চিকিৎসকের ফি নেয়া বন্ধ ও হাসপাতাল সম্পূর্ণ দালাল মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন গরীবের ডাক্তারখ্যাত গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: দাস রনবীর। এ কারণে ওই চক্রটির রোষানলে পরে পরিকল্পিতভাবে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে ডা: দাস রনবীরকে।

সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের দাবি, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি না থাকার কারনে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টেস্ট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে সরকারি হাসপাতালমুখী দালাল চক্রটি ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। টেস্ট বাণিজ্যের নামে রোগীদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ স্বীকার করে বরিশালের সিভিল সার্জন ডাঃ মনোয়ার হোসেন বলেন, দালালমুক্ত করতে হলে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো ছাড়া কোন উপায় নেই। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শীঘ্রই নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়ে অভিযান পরিচালনায় মাঠে নামা হবে। মাঠে নামার প্রস্তুতির কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক অজিয়র রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে ডায়াগনস্টিক মালিক সমিতির সাথে আলোচনা করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত