প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অসীম সাহা : একুশে পদক পাওয়ায় আপনাকে প্রণাম

বিভুরঞ্জন সরকার : কবি অসীম সাহা। দেশের সেরা কবিদের একজন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি কবিতা লিখছেন। তার নাম কবে প্রথম শুনেছি, তার কবিতা কবে প্রথম পড়েছি সেটা এখন আর মনে নেই। তবে ষাটের দশকের শেষদিক থেকেই তার নাম ও কবিতার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিলো বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এটা ঠিক যে, অসীমদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সেভাবে ঘটেনি। তার কবিতা পড়েছি, অন্য লেখাও পড়েছি। তার সম্পর্কে নানা বিষয়ে জানি। সাক্ষাৎ-আলাপ-পরিচয় মাত্র কয়েক মাসের। এখন আমরা ‘আমাদের নতুন সময়’-এ একসঙ্গে কাজ করি, আমরা সহকর্মী।

মাত্র কয়েক মাসের জানাশোনায় এটা বলতে পারি যে, কবি অসীম সাহা একজন অসাধারণ মানুষ। তার মতো প্রাণোচ্ছল হৃদয়বান জমাটি মানুষ খুব বেশি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কাজের ফাঁকে আড্ডায় বসলে মুহূর্তে তিনি মধ্যমণি ওঠেন। অট্টহাসিতে ফেটে পড়তে চায় ঘর। তিনি বয়সে আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড় কিন্তু আমরা পাশাপাশি হাঁটলে কারো মনে হবে, আমি বুঝি তার বড় ভাই। বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে দৃঢ় পায়ে হাঁটার জন্য যে মানসিক জোর লাগে সেটা অসীমদার আছে, আমার নেই।

কলেজশিক্ষক অখিলবন্ধু সাহার পুত্র অসীম সাহার জন্ম ১৯৪৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন অসীমদা। প্রসঙ্গত বলা যায় যে, অসীমদা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহপাঠী।

তিনি কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন কয়েক দশক আগেই। শুধু কবিতা নয়, সাহিত্যের অন্য শাখায়ও তার অবাধ বিচরণ। উপন্যাস লিখেছেন, গল্প, কিশোর সাহিত্য, গবেষণাগ্রন্থ, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ, আবার শিশুতোষ ছড়া কোনটায় অসীমদা নেই! তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৫১টি । তবে এই সংখ্যা আরো বেশি হতো তিনি একটু প্রচারপ্রিয় হলে।

কবি নামে পরিচিতি পেলেও তার গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাজের একটি হলো ‘বড়– চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’। অন্যটি ‘আধুনিক ব্যবহারিক বাংলা সহজ অভিধান’। প্রথম বইটি ব্রজবুলি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় কাব্যিক অনুবাদ। ১৪ খ-ের এই গ্রন্থটি প্রস্তুত করতে তার সময় লেগেছে পাঁচ বছর। বাংলা সহজ অভিধানটি এবার বইমেলায় বের হবে। প্রায় সাড়ে চার বছর খেটে এই অভিধানের কাজ শেষ করেছেন তিনি। মূল অভিধানের ৩৭ হাজার শব্দ থেকে ২৭ হাজার বাদ দিয়ে ১০ হাজার শব্দ নিয়ে তার এই অভিধান বাংলা ভাষা ব্যবহারে আগ্রহীদের প্রয়োজন পূরণ করবে।

কবিতার বইয়ের মধ্যে ৪৬টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত ‘ম-বর্ণের শোভিত মুকুট’-এর জন্য তিনি আইএফআইসি ব্যাংক পুরস্কার পেয়েছেন। জীবনের এক বিশেষ সময়ে নয় মাসে এই ৪৬টি কবিতা লিখে অসীম সাহা তৃপ্ত। তিনি মনে করেন, এই কবিতাগুলো পাঠকদের মনে দাগ কাটবে দীর্ঘ দিন।

সাংবাদিকতা দিয়েই কর্মজীবন শুরু করেছেন অসীম সাহা। মাঝখানে কিছুদিনের বিরতি। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন কিছু সময়। আবার ফিরে এসেছেন সংবাদপত্রে। অসীমদা গুণী মানুষ, সৃজনশীল মানুষ, প্রতিভাবান মানুষ। কিন্তু ভান-ভনিতা করেন না। অত্যন্ত স্পষ্টবাদী এবং সাদা মনের মানুষ। প্রগতিশীল ও উদার চিন্তার এই মানুষটি এবার ভাষা ও সাহিত্য রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। ভাষা ও সাহিত্যে তার যে অবদান তাতে এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আরো আগেই পাওয়া উচিত ছিলো। আমাদের সমাজে প্রতিভার মূল্যায়ন যথাসময়ে যথাযথভাবে হয় না। পুরস্কার, পদক এসব পেতেও নানা পর্যায়ে যোগাযোগ লাগে, আরো সহজ বাংলায় বললে তদ্বির লাগে।

অসীম সাহা যোগাযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কারণেই হয়তো একটু দেরিতে একুশে পদক পেলেন। অবশ্য ২০১১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, কবিতালাপ পুরস্কারসহ ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে আরো প্রায় ১৪টি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

কবি অসীম সাহার দুটি জনপ্রিয় কবিতার দুটি পংক্তি উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।

‘দুটি চোখ ছিলো জানালায় স্থির

দুটি চোখ ছিলো আড়ালে;

তুমি এসে কেন তোমার দু’হাত বাড়ালে?’ (প্রত্যাখ্যান)

‘কাল রাতে ওরা আমার দেহ থেকে

সিরিঞ্জ সিরিঞ্জ রক্ত তুলে নিয়েছে

আজ তার প্রতিশোধ।’ (পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মঘাতী রক্তপাত)

একুশে পদক পাওয়ায় কবি অসীম সাহাকে অভিনন্দন জানাই। তিনি আরো দীর্ঘ দিন সুস্থ ও সক্রিয় থেকে আমাদের সাহিত্যকে সেবা দিন, সমৃদ্ধ করুন এটাই প্রত্যাশা। কবিকে প্রণাম।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত