প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

“সেই বাড়িতে আবার গেলে বিরাট ঝামেলা হবে আমার”

আসিফ নজরুল :আমার জীবনে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে কয়েক দিন পরে। বিউটি কুইনের বাড়ীর সামনে যেতে দেরি হয়ে গেছে সেদিন। মন খারাপ করে ঢুকি কাছের মান্নানের হোটেলে। দুপুরে মানুষ হোটেলে ঢুকে ভাত খেতে। আমি যাই শুধু চা খেতে। আমাকে দেখে তাই মান্নান মিয়ার খুশি হওয়ার কথা না।

সেদিন অবশ্য আমাকে সে খেয়াল করে না। মাথায় টুপি দিয়ে ওয়াজ শুনছিল সে। সেখানে পাপী বান্দাদের কি ভয়াবহ পরিণতি হবে, তার বিবরণ দেওয়া হচ্ছে সুরে সুরে। সে বিভোর হয়ে শুনছে তা। আমি এই সুযোগে নিশ্চিন্তে হোটেলে ঢুকে যাই।

হোটেলে খালি কোনো টেবিল নাই। একটা টেবিলের পাশে খালি চেয়ার পেয়ে বসি। উল্টো দিকে একটা মানুষ বড় বড় হাঁ করে রুই মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছে। কিন্তু তার চোখ ছলছল। আমাকে বসতে দেখে সে করুণ চোখে তাকায়। আমি বলি: কান্দেন কেন ভাই!
সে বলে: মরণের কথা ভাবি।

আমারও তা ভাবা উচিত। কিন্তু এখন তা ভাবতে ইচ্ছে করছে না। তার খাওয়া দেখে পেটে মোচড় দিচ্ছে আমার। একটা পিচ্চি টেবিল মোছার কাপড় নিয়ে আমার সামনে আসে। আমি বলি: ভাত দে। আর রুই মাছের পেটি।

মান্নান মিয়া আমার হাঁক শুনে সন্দেহভরা চোখে তাকায়। আখিরাতের বিবরণের সাউন্ড কমায়। আমি পেছনের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সামনের পকেটে রাখি। মানিব্যাগ নিশ্চয়ই দেখেছে ব্যাটা।
খাবার অর্ডার দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে বসি। টেবিল থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বিউটি কুইনের বাসার গেইট। আমি মনে মনে বলি, বিউটি কুইন আসো। গেইট দিয়ে বের হয়ে একটা রিকশা নাও। আমি সেই রিকশার সামনে সামনে হাঁটি। রিকশা পায়ের পেছনে উঠায় দাও। মুখ ফিরিয়ে দেখি তোমাকে আরেকবার।
আমার দোয়ায় কাজ হয়! বিউটি কুইনের দরজা এক ঝটকায় খুলে যায় হঠাৎ। লাল শাড়ি পরা একটা মেয়েমানুষ তির বেগে বের হয়ে আসে সেখানে। থমকে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখে একবার। তারপর হা হা হা করে অমানুষিক একটা শব্দ করে, নারায়ে তাকবির বলে চিৎকার দেয়। ডান দিকে মোচড় নিয়ে দুই হাতে বুক চাপড়িয়ে দৌড় শুরু করে।

হতভম্ব হয়ে উঠে দাঁড়াই। আমারই বিউটি কুইনের মা সে। আমার ‘হতে পারে’ শ্বাশুড়ী! সামনের পিচ্চিকে এক ঝটকায় ছিটকে ফেলে হোটেলের মুখে আসি। মান্নান মিয়া চিৎকার করে কিছু বলে। হাত বাড়িয়ে ধরতে নেয় আমাকে। আমি শরীরটা একটু বেঁকিয়ে বের হয়ে আসি। তার আঙুলের ছোঁয়ায় আমার সুড়সুড়ি লাগে! খুব ভালো হতো একটু হেসে নিতে পারলে। কিন্তু সময় নাই। আমি দৌড়ে হোটেলের বাইরে যাই। রাস্তার উল্টো পাশে বিউটি কুইনদের গেইটের সামনে দাঁড়াই। সখিনা আর রান্নার বুয়াকে ভেতর থেকে ছুটে আসতে দেখি। খালাম্মা খালাম্মা বলে চিৎকার করছে তারা।

সখিনার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ামাত্র আমি কর্তব্য ঠিক করে ফেলি। খালাম্মাকে ধরতে হবে আমার। খালাম্মা খালাম্মা বলে বুক ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে তার পিছু নিই।খালাম্মা পেছন ফিরে আমার দিকে তাকান। খিলখিল করে হাসেন। আয় আয় বলে দু-একবার ডাকেন। তারপর মুখ ঘুরিয়ে আবার দৌড় দেন। আশপাশের মানুষ ছিটকে সরে দাঁড়ায়। রিকশা থেকে একটা মহিলা লাফ দিয়ে নামে ভয় পেয়ে। খালাম্মা তার দিকে এগোন। মহিলাও প্রাণপণে দৌড় দেন। কারা যেন আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে।

খালাম্মা রাস্তা থেকে ইট নিয়ে ছুড়ে মারেন পাশের রিকশায়। একটু গতি কমে তার। এই সুযোগে তার সামনে চলে আসি। হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে নিই। তিনি দুই হাত দিয়ে বাঘের মতো থাবা মারেন আমার মুখে। সারা মুখ জ্বলে যায় তীব্র ব্যথায়। তিনি নারায়ে তাকবির বলে আবার দৌড় শুরু করেন। শাড়ি পায়ে পেঁচিয়ে পড়ে যান এবার। প্রায় উড়ে গিয়ে ধরে ফেলি তাঁকে। আমার দুই হাতের মধ্যে লুটিয়ে পড়েন।
পাঁজাকোলা করে তাঁকে রিকশায় তুলি। কপাল থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে আমার। আমি তা মোছার চেষ্টা করি না। চারপাশে মানুষ ভিড় করে দেখছে। পাগলি পাগলি বলে চিৎকারও করে কেউ। বেত্তমিজ সব! আমি বাঘের মতো চেহারা করে রাস্তার লোকজনকে দেখি একবার।

বিউটি কুইনদের গেইটটা একটু দূরেই। সেখানে এসে দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে। অল্পবয়েসী একটা মেয়ে। ভাইয়ের হাত ধরে থরথর করে কাঁপছে। তবু তাকে কিযে সুন্দর লাগে দেখতে! মায়া চোখে তাকাই তার দিকে।

আমাদের দেখে সখিনা বড় গেইট খুলে দেয়। বীরের মতো দুই হাতে তুলে নিই খালাম্মাকে। দোতলা পর্যন্ত এসে দম বন্ধ হয়ে যায় আমার। কিন্তু এখন দম খোলা রাখতে হবে আমাকে। এটাই আমার সুযোগ।
সখিনা আমাকে পথ দেখিয়ে দেয়। খালাম্মাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মেঝেতে বসে হাঁপাতে থাকি। তাকে মা মা বলে কয়েকবার ডাকে কেউ। তিনি কোনো সাড়া দেন না।

চাপা কান্নার আওয়াজ শুনি। মুখ তুলে দেখি বিউটি কুইনকে। চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছে তার। আমি কাঁদো কাঁদো হয়ে দেখি তাকে। সে আমার দিকে মুখ ফেরায়। তার চোখে বিস্ময়। সে কি চিনেছে আমাকে?

কপাল মুছতে গিয়ে আমার হাত রক্তে ভেসে যায়। রক্তভেজা হাতের দিকে তাকিয়ে থাকি। বিউটি কুইন দেখেনা আমার রক্ত। সে মুখ নিচু করে ফেলেছে। মায়ের পাশে গিয়ে বসে।
আমার খুব ইচ্ছে করে একটু সামনে এগোই। ওর পাশে গিয়ে দাড়াই।

সখিনা ছুটে বাইরে যায় কিছু একটা আনতে। আমি বিউটি কুইনকে বলি: চিন্তা করো না। আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। আমি তাকে ডাকি বিউটি কুইন বলে। আমার ঠোঁট নড়ে না।
বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে আমার। চোখ জ্বলছে কীসের যেন আগুনে।

সখিনা এসে আমাকে একটা ভেজা নেকড়া দেয়। সেটা আমার মুখ মোছার জন্য হয়তো। কিন্তু আমি তা মুছি না।

এখানে থাকার কারণ নেই আর। তবু রুমের বাইরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াই। তারপর দরজা ঠেলে বাইরে আসি। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছি, তখনই বশির ভাইকে হুড়মুড় করে ওপরে আসতে দেখি। তার পেছনে পেছনে আরও কয়েকজন মানুষ। আমার দিকে বিমূঢ় হয়ে তাকায় সে। তীব্র ঘৃণা তার চোখে। আমি প্রায় নিচে নেমে এসেছি, তখনই চিৎকার করে বশির ভাই বলে: এই ধর তো হারামজাদাকে। ধর!
আমি গেইটের বাইরে চলে এসেছি। বড় বড় পা ফেলি। পেছন ফিরে দেখি, কেউ ধরতে আসছে নাকি আমাকে। কেউ আসে না। রাস্তার পাশে কলের কাছে এসে থামি। রক্ত মুছি। বিউটি কুইনকে আবার দেখার জন্য বুক মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু আমি জানি, সেই বাড়িতে আবার গেলে বিরাট ঝামেলা হবে আমার।

(উপরের অংশটুকু আসিফ নজরুলের নতুন উপন্যাস ‘উধাও’ উপন্যাস থেকে। এবারের বইমেলায় ‘উধাও’ প্রকাশ হয়েছে প্রথমা প্রকাশন থেকে)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত