প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রেজু মাস্টার যেভাবে হুক্কা হয়!

ইকবাল আনোয়ার : হুক্কা খাওয়া ক্ষতিরে, অনেক ক্ষতি। ছাড়মু ছাড়মু কইরা ছাড়ন হয় না। – কি ক্ষতি মাস্টার? কতো ক্ষতি। কী আর বলুম। –
হুক্কায় তো উপকার। কাশ পাতলা করে। জানো না বুঝি! গুড়গুড়ির চোটে ডাবার খোলের পানিতে সব ক্ষতি আটকা পইড়া যায়। হুক্কার পানি লাউয়ের চারায় ঢাললে তরতাজা গাছটা মারা যায়। গর্তে দিলে ‘জির’ উইঠ্যা যায়। বিড়ি-সিগরেট যারা খায় তারা এই ক্ষতিসহ খায়।
হুক্কায় না, হুক্কায় না বেনায় ক্ষতি। বেনায়! – কেডা কইলো কথাডা। মাস্টার কী একাই শুনলো!
খেড় দিয়া পেঁচাইয়া বেনা বানাই। বেনার আগুন তিরতিরাইয়া জ্বলে সারাক্ষণ চুপচাপ। সময়মতো টিক্কা ধরাও, এই তার কাজ। অসাবধানে বেড়ায় আগুন লাগতে পারে, এই তো!
-সিলমপুরে লাগছে আগুন নই চান্দের বাজার হইয়া ঠোবলার কাচারী দিয়া মুকসগঞ্জ দিয়া ধুমা যায়- ছিল্লুক দেয় একজন। সকলে এর উত্তর জানে, হুক্কা।
হুক্কার বিবরণ করে একজন, দাঁড়াইয়া যাত্রার মতোন। যে হুক্কা তাদের জীবনের সাথে বান্ধা, তারে ‘জেওতা’ করে, বচনে বচনে।
– হুক্কা যেনো মানব এক। সিলম তার মাথা, মগজ মন। নারকোলের খোলডা হইল শরীল, নাভি তার ছিদ্রডা, মন আর দেহের মিলন।’
হুক্কা লটকে আছে জি আই তারের আংটায় নায়ের ছইয়ার ভেতর। টলছে নায়ের দুলনির তালে। ঝড় এলে আরও টলবে ভীষণ। হুক্কার মাথায় কলকি। কলকির ছিদ্রের বন্ধু সুড়কি একখান। জনমে জনম বান্ধা। কালো হয়ে গেছে, প্রেমে অপ্রেমে অঙার। তামাকের আলকাতরায়, আর নেশার গন্ধে ভরা জীবন তার। মাঝে মধ্যে ছুটি পায়। তারপর টন করে পরে কলকের ভেতর আবার। তার ওপর তামাকের মিকচার ঝুরি করে রেখে বুড়া আঙুলে টিপা একখান মুন্সিয়ানায়, রেখে দাও তার ওপরে লাল টিক্কা, জ্বলুক এখন।
তামাক কাটো কাঠের গুঁড়ির ওপর কচকচ, তাতে দিও রাব/ চিটাগুড়। দশ গ্রামের প্রেসিডেন্ট সাবে আরও দেয় চন্দন, এলাচ সোন্দা। তুমি বাড়িয়ে দিও রাবের ভাগ। মিষ্টি গন্ধ তাতেই হবে, বেশুমার।
শক্ত তার পেঁচিয়ে বানানো নইলচার সঙ্গে সাপে নেউলে হুক্কার জীবন। আমূল বিদ্ধ হয় গলা থেকে নিম্নাধার, ময়লা ছাপার নামে অত্যাচার বারবার। তখন হুক্কা বুঝে কতো ধানে কতো চাল। দুঃখের পর সুখ আসে অবশ্য। পাতলা সহনশীল হয় তার ছিদ্র- শিরা, চমৎকার। তারপর গাঁদ জমে জীবনে আবার।
টিক্কা কালো। চাটাইয়ের দাগ উল্টো পিঠে। কাঠ কয়লা গুড়া করে লেই করে বাতাসার মতো পেতে দিয়ে রোদে শুকিয়ে নেয়া। বড় মজা হাতে নিলে, এতো সস্তা বিনোদন জীবনে কী আর। পাকের ঘরে চুলার চান্দ- কিনারায় পেতে দিলে তেতে গিয়ে অগ্রভাগ লাল হলে বাকিটা মুখে ফুঁকে নিতে হবে মুনি বেটার।
টিক্কার বিকল্প হলো জ্বলন্ত আংরা। চুলা থেকে যেকোনোভাবে বের করে একদম গরম লাল দ্রুত এ হাত ও হাত করে করে কলকে পর্যন্ত নিলেই খালাস।
ধামো থামো কর্মকার, বাকিটা আমি কমু বলে দাঁড়ায় আরেকজন।
তখন চলছে ‘বারবারি’ ঘরে হুক্কার আয়োজন। পুরনো ছাই কল্কের ওপর করে হচ্ছে পরিষ্কার।
তামাক পুড়ানো ধোঁয়ায় নিজের রক্তকে ছেঁকে দেয় আনন্দ। এই তো হলো হুক্কার জীবন।
দল ঘন হয়ে গেছে , টুকটাক বিবাদ কেটে গেছে তখন ।
মান্যি লোক রেজু মাস্টার। প্রথম পায়। এর আগে ডান হাতে হুক্কা ধরে বাম হাতের তালুতে কলকে ধরানোর প্রথম পদক্ষেপ, ছাড়াধরা কয়েকবার। কয়েকটা স্ফুলিঙ্গ উড়বে আঁধারে, কড়া করে ধোঁয়া ছাড়া হবে বড় বড় গুড়গুড়ে টানে। কলকে তখন গরম। হাতে হাতে ঘোরার জন্য প্রস্তুত। চুমোর আবিরে ছিদ্রে ধোঁয়া ঘুরে। মানবরা যেমন ঘুরে সুফি ঘুর্ণন। এগিয়ে দেয়ার আগে গালে কয়েক ঘষা দিয়ে, হাতের চেটোতে মুছে নিয়ে বলা – নেন বাইসাব। এর নাম তাজিম, ভদ্রতা। এই তো দুঃখ জীবনে আনন্দ, শিষ্টাচার।
তবে তুমি বেনার আগুন নিওনা রেজু মাষ্টর কথাটা কে বলে। নাকি নিজেই নিজেকে বলে।
‘জমি ক’টা নিজেই চাষ করো। বেনায় আগুন নিয়া যাওনা যেন ‘পাথরে’। এ নিয়ম ভুলে যাও, তা না হলে ক্ষতি বহুত। হুক্কার ক্ষতি মানি, তয় কিন্তু বেনায় জীবন নাশ।
জানতো মেলিটারি যখন আসবে এ তল্লাটে, তোমার পাড়ায় আসবে, সবাই জান নিয়ে পালালে তুমি বলবে, তোমরা যাও। আমি মাষ্টার মানুষ, আমারে মান্য করে সকলে, তারাও মানবে দেইখ্য।
তখন রাতের বেলা, তুমি যাবে মাছ ধরতে। ‘জার’ করবে তোমার। কয়েক টান হুক্কা খাইলে গা গরম হইতো। এর জন্যে সাথে নেয়া বেনার আগুন নিভু নিভু হতে দেখে, হাতে লম্বা নাড়ানি দিয়ে যেই মুখে ফুঁ দিবে, আগুন দাউ দাউ জ্বলে উঠবে।
আগুন জ্বালালে কেন মাস্টার। জানো তো, দেশে যে হানাদার। ইজ্জত যে দিছে কতো মায়ে বোনে, সামনে থেকে নিয়া গেছে ধরে কতো বাপের পুতেরে, এইসব আগুন মনের ভেতরে জমা রাখতে পারলে না?
এখন আগুন দেখে মেলিটারি একডজন তোমার কাছে এলো। জিজ্ঞাসিলো, কেন তুমি আগুন জ্বালাইয়া মুক্তিকো খবর দেগা।
তুমি হুক্কা বোঝাও। কলকি বোঝাও।
শালারা বর্বর। হুক্কা বোঝে না, জীবন বোঝে না। যা বোঝায়েছে সেই ধম্ম, সেটা বোঝে কেবল। তোমার নিজের গতরে নিজের বেনার আগুন দেয় তারা। জ্বলে আগুন। বেনার আগুন। তোমার সিলম জ্বলে, নাভি জ্বলে, পেটের খোল জ্বলে।
তারপর তোমার আংরা পড়ে থাকে হুক্কার লাহান।
(অনু গল্প)
দ্রষ্টব্য: ধুমপান সর্বোতভাবে স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত