প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরো দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

কালের কন্ঠ : বুড়িগঙ্গা নদীতীর অবৈধ দখলমুক্ত করতে বহুতল ভবন ঘিরে আছে পুলিশ। বুলডোজার প্রস্তুত। অপেক্ষায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। উত্সুক মানুষের ভিড়। এর মধ্যেই গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দ্বিতীয় দফায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)। কামরাঙ্গীর চর থানাধীন নওয়াবের চরে চালানো হয় এই অভিযান।

শুরুতেই অবৈধভাবে গড়ে তোলা (নওয়াবের চরে) শাহ সিমেন্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের একতলা ভবনের গুদামের ওপর বুলডোজার চালানো হয়। বিকট শব্দে ইট, বালু আর সিমেন্ট চুরমার হতে থাকে। এর মধ্যেই সেখানে প্রতিষ্ঠানটির মালিক লিটন ইসলাম ও আবুল কালাম নামের দুজনকে আটক করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তাফিজুর রহমান নদীর জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা করায় তাঁদের দুজনকে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, আনাদায়ে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেন। তাত্ক্ষণিকভাবে আদালতে জরিমানার টাকা জমা দিয়ে জামিন পান দুই ব্যবসায়ী। সেই সঙ্গে তাঁদের ভবিষ্যতে নদীর জমি দখল না করতে সতর্ক করা হয়।

গতকাল ওই এলাকায় গিয়ে আরো দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীতীরের পুরোটাই অবৈধ দখলদারদের দখলে। একতলা থেকে তিলতলা, টিনশেড, খুপরি ঘর এমনকি বাঁশ-খুঁটি আর নানা সরঞ্জাম দিয়েও নদীর জমি দখলে নিয়েছে প্রভাবশালী ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে চেষ্টা করছে তাদের ভবন-স্থাপনা টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু তাদের কথায় কান দিচ্ছিল না ডিআইডাব্লিউটিএ। শাহ সিমেন্টের পর মাহফুজুর রহমানের দোতলা ভবন ও টিনশেড ঘর, জসিম উদ্দিনের একতলা ভবন ও ২২টি টিনশেড ঘরসহ বিভিন্ন ব্যক্তির একই ধরনের অবৈধ স্থাপনা বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এ সময় আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা নদী দখলমুক্ত দেখতে চায়। কোনোভাবেই যেন আর কেউ নদীতীর দখলে না রাখে সে জন্য সরকারের এই ভালো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে বলে তারা। ইসলাম হোসেন নামের এক নৌকা মাঝি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। নদীতে পানি থাকলে আমগো পেটে দানাপানি জোটে। পরিবার নিয়া দুই বেলা ডাল-ভাত খেতে পারি। নদী দখলমুক্ত করায় আমি ও এলাকাবাসী খুশি।’ মোজাম্মেল হক নামের একজন বলেন, ‘বুড়িগঙ্গারে যারা দখল করে মাইরা ফালাইছে, তাগো শাস্তি দেওয়া হোক। নদী বাঁচোন লাগব।’

দখলদাররা যা বলেন : সাধারণ মানুষ নদী বাঁচানোর আন্দোলনে যুক্ত হলেও দখলদাররা নদীতীরের জমি নিজেদের দাবি করেছেন। তাঁদের মধ্যে জসিম উদ্দিন বলেন, এক বছর আগে উচ্ছেদ নোটিশ পেয়ে তিনি আদালতে মামলা করেন। এখানে তাঁর পূর্বপুরুষদের জমি ছিল। সঠিক দলিল রয়েছে তাঁদের। তিনি অবৈধভাবে নদীর জমি দখল করেননি। মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমার জমির দলিল আছে। কয়েক পুরুষ ধরে আমার পরিবারের এখানে জমি রয়েছে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সঠিকভাবে হিসাব করলে পুরো কামরাঙ্গীর চরই বুড়িগঙ্গা নদীর জমি। উচ্ছেদ করতে হলে এলাকার আবাসিক এলাকা, আফিস, ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সড়কও ভাঙতে হবে। তবে বিআইডাব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা বলেন, অনেক যাচাই-বাছাই করে নদীশাসন আইনবলেই উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

উচ্ছেদ হওয়া সাততলা ভবনের মালিক রওশন এসহাক বলেন, তিন বছর আগে তিনি ভূমি অফিসে কাগজপত্র ভালো করে যাচাই-বাছাই করে নদীতীরের জায়গাটি কেনেন। এরপর ব্যাংকঋণ নিয়ে সাততলা ভবন তৈরি করেন। আগে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।

স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার ম্যানেজার হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের একতলা ভবন ভাঙার কারণে প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল ক্ষতি হয়েছে। মালামাল সরাতে আমরা যথেষ্ট সময় পাইনি।’

তবে নদী দখল আর উচ্ছেদ নিয়ে নানা মতবিরোধ থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, দখল হতে হতে বুড়িগঙ্গা এতটাই মরে গেছে যে এখন এটাকে খাল বললেও ভুল হবে। কালো পানি যেন আতঙ্কের আরেক নাম। তাকাতেই ভয় করে। বিভিন্ন বর্জ্য ফেলে নদীটিকে ‘ডাম্পিং জোনে’ পরিণত করা হয়েছে।

শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও নদীর জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে। বিআইডাব্লিউটিএ বলেছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।

উচ্ছেদ হওয়া অনেকেই নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, তাঁরা তিন পরচায় জমির মালিক। বাপ-দাদার সুবাদে তাঁরা এই জমির মালিক। হঠাৎ তাঁদের জায়গা কিভাবে নদীর জায়গা হয়!

আতঙ্কে অনেকে : যাঁরা এখনো নদীপার এলাকায় বাড়িঘর তুলে বসবাস করছেন বা কারখানা করে আছেন তাঁরা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছেন। কবে তাঁদের বাড়িঘর-কারখানাগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় সেই আতঙ্ক। অনেকেই নিজ উদ্যোগে মালপত্র অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আছেন অপেক্ষায়। তাঁরা দৌড়াচ্ছেন বিভিন্ন দপ্তরে। যাঁরা বাসা ভাড়া করে আছেন তাঁরাও আছেন আতঙ্কে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কামরাঙ্গীর চরের নওয়াবের চরে দ্বিতীয় ধাপের অভিযানে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিআইডাব্লিউটিএ। নদীতীর দখল ও দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে অভিযান চলছে। গতকাল উচ্ছেদ করা স্থাপনার মধ্যে রয়েছে একটি তিনতলা ভবন, পাঁচটি দোতলা ভবন, ২৮টি একতলা ভবন, ২২টি আধাপাকা ঘর ও ১৫৫টি টংঘর।

এর আগে বিআইডাব্লিউটিএ ২৯ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে বুড়িগঙ্গা নদীতীরে কামরাঙ্গীর চর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছোট-বড় ৪৪৪টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে। দুই দফায় ৬৫৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হলো। এগুলোর মধ্যে সাত, পাঁচ, তিন ও দোতলা পাকা ভবন, স মিল, গুদাম, প্লাস্টিক কারখানা ও আধাপাকা ভবন রয়েছে। ঢাকা সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত নদীর দু-পারে ৫৬টি বহুতল ভবনসহ ৯০৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে বিআইডাব্লিউটিএ। পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীতীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হবে। নদীর সীমানা চিহ্নিত করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও বৃক্ষরোপণ করা হবে।

ঢাকা নদীবন্দর বিআইডাব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধারাবাহিকভাবে এই অভিযান চলবে। নদীর সীমানা পিলারের পরেও ৫০ থেকে দেড় শ ফুট পর্যন্ত উচ্ছেদ করা হবে। নদীশাসন আইনে এভাবেই বলা আছে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত