প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আত্মহত্যা বা বিনাশই কি সমস্যা সমাধানের পথ?

কাকন রেজা

দক্ষিণ ভারতের সিনেমাগুলোতে দেখবেন ‘সুপার হিরো’দের রাজত্ব। দেখবেন, নৈতিক উপায়ে না পেরে, অনৈতিক উপায়ে হিরোরা ভিলেনদের মেরে কেটে সাফ করে দিচ্ছে। আর মানুষ ভিলেন নিধনের অনৈতিক প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানাচ্ছে, সাপোর্ট করছে। এখন প্রশ্নটা হলো, কেন করছে। নৈতিক উপায়গুলো ব্যর্থ বলেই করছে। অর্থাৎ অন্যায় দমনে আইন-আদালতের যে প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে সেগুলো কাজ করছে না বলেই মানুষ অনৈতিকতার দ্বারস্থ হচ্ছে। তখন তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভিলেনদের বিনাশ। একেই বলে ‘মব জাস্টিস’। আর ‘মব জাস্টিসে’র শাস্তি হচ্ছে ‘লিঞ্চিং’, ঝুলিয়ে দেয়া বা হত্যা করা। ‘মব জাস্টিস’ নিয়ে আগেও বলেছি, লিখেছি। অনেকে ‘মব জাস্টিসে’ স্বস্তি পান, ‘লিঞ্চিং’য়ে তৃপ্তি অনুভব করেন। তা করুন, আপত্তি নেই। কিন্তু এমন স্বস্তি আর তৃপ্তির আগে কারণটা একটু ভাবতে বসা উচিত। কী কারণে ‘মব জাস্টিসে’র আশ্রয় নিতে হচ্ছে, কেনই বা ‘লিঞ্চিং’য়ের মতন একটি অনৈতিক ব্যবস্থাকে জাস্টিফাই করতে হচ্ছে। ভাবুন, দেখবেন, সিনেমায় দেখা সমাজ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতার দিকগুলো ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। দেখবেন, দর্শক হিসেবে ওই ব্যর্থতার একটি অংশ আপনিও। সম্প্রতি ‘আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম’ নিয়ে বিবিসি একটি রিপোর্ট করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে ছয় হাজারেরও বেশি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে তারা। একটু ভেবে দেখুন তো, গড়ে প্রতি বছর এক হাজার আদম সন্তানের পরিচয় আর মৃত্যুর কারণ রয়ে গেছে অজ্ঞাত। খাল-বিল, ডোবা-নালা, ঝোপ-ঝাড় আর রাস্তা-ঘাটে পাওয়া গেছে এসব দুর্ভাগাদের প্রাণহীন শরীর। ‘মব জাস্টিসে’ যারা স্বস্তি পান, তারা চিন্তা করুন তো বিষয়টি। আপনার ‘মব জাস্টিসে’র স্বস্তি এই ছয় হাজার আদম সন্তানের মৃত্যুকে জাস্টিফাই করছে কিনা। ভেবে দেখুন তো, ‘হারকিউলিস’ হয়ে ওঠা কেউ, এক দু’জন ধর্ষকের মৃত্যুর আড়ালে সকল মৃত্যুকেই বৈধতার ছাপর মেরে দিচ্ছে কিনা। দুই. একজন চিকিৎসক স্ত্রীর পরকীয়া সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। যে নিজে তার ভাইদের পড়িয়েছেন, মার ভরণপোষণ করেছেন, তিনি স্ত্রীর জন্য আত্মহত্যা করবেন কেন? ‘মৃত্যুর মুখোমুখি হতে যে ভয় পায় না, জীবনের মুখোমুখি হতে তার কেনো এতো ভয়’- যদি সম্ভব হতো তাকে এই প্রশ্নটা করতাম। কিন্তু তিনি এখন সম্ভব-অসম্ভবের বাইরে। এই মৃত্যু চিকিৎসকের স্ত্রীকে ভিলেন বানিয়ে ফেলেছে, যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক। এখন সবাই সেই মহিলার বিনাশ চান। সামাজিক মাধ্যমে কিছু মানুষের কথায় মনে হয়েছে ‘মব জাস্টিসে’ মহিলাকে ঝুলিয়ে দিলেই তারা শান্তি পান, স্বস্তি পান। তা পান। কিন্তু পাবার আগে ভেবে দেখেছেন কী, ওই মহিলার নৈতিক স্খলনে কী আপনাদের কোনো দায় নেই? সভ্য হবার আগেই আধুনিক হবার প্রবণতা কী এর জন্য দায়ী নয়? পরকীয়াকে কী আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেননি আপনারা? সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ত থাকাকে কী অধিকারহীনতার সাথে তুলনা করেননি আপনাদের কেউ কেউ? আলাদা হবার সকল আইনত রাস্তা খোলা থাকার পরও কেন সঙ্গীর প্রতি অবিশ্বস্ততা। এই অবিশ্বস্ততাও কী জাস্টিফাইড না আপনাদের দ্বারা? ‘সুপার হিরো’দের কখন প্রয়োজন হয়, যখন সমাজ আর রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হয়। যারা দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা দেখেন তারা বুঝতে পারবেন, কীভাবে সমাজ আর রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হয়ে উঠে। কেন ‘মব জাস্টিস’ প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের যারা ‘মব জাস্টিস’কে সমর্থন করছেন, তারা মুখফুটে বলবেন কী, সমাজ আর রাষ্ট্রযন্ত্র কী ব্যর্থ? আত্মহত্যা বা বিনাশই কী সব সমাধানের পথ? লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত