প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : চারবার নকশা বদল, তবু চূড়ান্ত হয়নি গতিপথ

বণিক বার্তা : নির্মাণাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশায় বদল এসেছে চারবার। তার পরও চূড়ান্ত হয়নি গতিপথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন পলাশীতে একটি র্যাম্প (সংযোগ সড়ক) নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের পরামর্শক দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগের এক মন্ত্রিপরিষদ সভায় র্যাম্পটি বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পলাশীর র্যাম্প বাদ দেয়ার বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। যদিও ধীরগতিতে এগিয়ে প্রায় মাঝপথে ঠেকেছে কাজ।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পলাশী র্যাম্পটি বাদ দেয়ার মধ্য দিয়ে সোনারগাঁও হোটেল থেকে পলাশী মোড় পর্যন্ত ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সংযোগ সড়কটিও বাদ পড়তে যাচ্ছে। এর আগে খামারবাড়িতে র্যাম্প নামানো নিয়েও দেখা দিয়েছিল জটিলতা। জটিলতা রয়েছে হাতিরঝিলে র্যাম্প নামানো নিয়েও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব র্যাম্প বাদ পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। কারণ, পিপিপিতে (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) বাস্তবায়নাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের রাজস্ব আয়ের একটা বড় উৎস এসব র্যাম্প।

২০১০ সালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শুরু করে সেতু বিভাগ। চালু হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২০ সাল পর্যন্ত। তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রথম ধাপে বিমানবন্দর-বনানী, দ্বিতীয় ধাপে বনানী-তেজগাঁও ও তৃতীয় ধাপে মগবাজার-কুতুবখালী অংশে কাজ হবে। বর্তমানে বিমানবন্দর-বনানী অংশে এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলছে। বনানী-তেজগাঁও অংশটি দখলমুক্ত করার কাজ চলমান। আর মগবাজার-কুতুবখালী অংশটির কাজ এখনো শুরুই হয়নি।

প্রথম অংশ বাস্তবায়নাধীন, দ্বিতীয় অংশ দখলমুক্তকরণ হলেও এখনো তৃতীয় অংশের গতিপথ চূড়ান্ত করতে পারেনি সেতু বিভাগ। পলাশীর র্যাম্পটি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বিষয়টি সম্পর্কে প্রকল্পের পরামর্শক দলের এক সদস্য পরিচয় অপ্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) র্যাম্পটি নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের এক বৈঠকে র্যাম্পটি বাদ দেয়া হয়।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউসের সঙ্গে, যিনি দীর্ঘদিন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পলাশীর র্যাম্প বাদ দেয়া হচ্ছে বা হয়েছে, এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’

শুধু পলাশী র্যাম্প নয়, এর আগে এক্সপ্রেসওয়েটির হাতিরঝিল ও সোনারগাঁও র্যাম্পও বাদ পড়েছে। নকশা অনুযায়ী, এফডিসির মোড় থেকে একটি র্যাম্প হাতিরঝিলে নেমে যাওয়ার কথা ছিল। পরে হাতিরঝিলের পানিতে র্যাম্পের পিলার স্থাপন নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে সেটি বাদ পড়ে যায়। একই মোড় থেকে আরেকটি র্যাম্প আসার কথা ছিল কারওয়ান বাজার মোড়ে। তবে সার্ক ফোয়ারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিলে বাদ দেয়া হয় এ র্যাম্পও। এর আগে খামারবাড়ি মোড়েও একটি র্যাম্প নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে কাটছাঁট করে কোনো রকমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশায় বদল ঘটেছে চার দফা।

বারবার কাটছাঁট করে সরকার প্রকল্পটির বাস্তবায়নযোগ্যতা নষ্ট করছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, এরই মধ্যে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশায় চারবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। গতিপথ বদল করা হয়েছে। একতরফাভাবে অনেকগুলো র্যাম্প ছেঁটে ফেলা হয়েছে। হাতিরঝিলের ভেতর দিয়ে র্যাম্প নামতে দেয়া হবে না। পলাশীর র্যাম্প নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। এর ফলে হাতিরঝিল ও পলাশী র্যাম্প দিয়ে যে রাজস্ব আয়ের হিসাব বিনিয়োগকারীরা করে রেখেছিলেন, সেগুলো থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। কারণ, পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগকারীর একটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকে। গতিপথ বদলানো, অনেকগুলো র্যাম্প বাদ দেয়ার ফলে সে উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত যাবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এতে মূল সড়ক হবে ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। নকশায় সংস্থান রাখা আছে ৩১টি র্যাম্পের, যেগুলোর দৈর্ঘ্য আরো ২৭ কিলোমিটার। সরকারের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) তথ্যানুযায়ী, বাস্তবায়নের পর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার যানবাহন চলাচল করতে পারবে। এক্সপ্রেসওয়েজুড়ে থাকবে ১১টি টোল প্লাজা। এর মধ্যে পাঁচটি হবে এক্সপ্রেসওয়ের উপরে।

গতিপথে জটিলতার পাশাপাশি মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হয়ে গেছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দুইভাবে হানিফ ফ্লাইওভারের ক্ষতি করবে। প্রথমত, নির্মাণকালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফ্লাইওভারের অবকাঠামো। দ্বিতীয়ত, হানিফ ফ্লাইওভারের রাজস্ব আয়ে ভাগ বসাবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।

হানিফ ফ্লাইওভার নির্মাণকালে সেটির প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী পাটোয়ারি। তিনি মনে করছেন, প্রকৌশলগত ও নির্মাণ ব্যয় হিসাবে ধরলে এটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। সায়েদাবাদ থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত হানিফ ফ্লাইওভারের তিনটা লেভেল (তিনতলা) আছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বানাতে হলে তা চতুর্থ লেভেলে করতে হবে। এত উপরে অবকাঠামো নির্মাণ একদিকে যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি নির্মাণকালে হানিফ ফ্লাইওভারকে সেটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অবকাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হানিফ ফ্লাইওভারের রাজস্বেও ভাগ বসাবে। একই পথে দুটি পিপিপি প্রকল্প সাংঘর্ষিক।

যদিও এ ধরনের কোনো আশঙ্কা দেখছে না সেতু বিভাগ। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আক্তার মনে করছেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকালে হানিফ ফ্লাইওভারের কোনো ক্ষতি হবে না। বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বলেন, হানিফ ফ্লাইওভারের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য নির্মাণকালে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এর ফলে ফ্লাইওভারের যেমন কোনো ক্ষতি হবে না, তেমনি নির্মাণকালে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটবে না। ফ্লাইওভারের রাজস্বেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ভাগ বসাবে না। কারণ, দুটি অবকাঠামো এক পয়েন্টে শুরু হলেও শেষ হয়েছে আলাদা জায়গায় গিয়ে।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। পিপিপিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন। ২০২০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এর কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো এগিয়ে নিতে ৪ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প (সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) হাতে নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত