প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচন

প্রথম আলো: বাদুড় যে নিপাহ ভাইরাসের বাহক, শুধু সেটুকুই জানা ছিল। এবার তাকে পুরোপুরি চেনার পথ তৈরি হলো। জ্বর, মাথা ধরা, পেশির যন্ত্রণা, বমি বমি ভাব থেকে শুরু করে ফুসফুসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর জন্য দায়ী যে ভাইরাস, সেই বাদুড় থেকে নিপাহ ভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা।

শুধু তা-ই নয়, গবেষণাটির মাধ্যমে এ দেশের পরিবেশে নিপাহ ভাইরাসের বাহক বাদুড়ের বিস্তার, চলাচল ও সক্রিয়তা কেমন, তা-ও জানা গেছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এ দেশের বাদুড়ে জীবাণুটির জিনগত বৈচিত্র্য শনাক্তের মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো যাবে। সম্ভব হবে এ রোগের টিকা আবিষ্কারও। নিপাহ ভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচন (আইসোলেশন অ্যান্ড ফুল জিনোম ক্যারেক্টারাইজেইশন) সম্পর্কিত গবেষণা নিবন্ধটি গত ১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী এমারজিং ইনফেকশাস ডিজিজ-এ ছাপা হয়েছে।

বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচনের গবেষণাটি করেছেন সিঙ্গাপুর মেডিকেল স্কুল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ইকোহেলথ অ্যালায়েন্স, অস্ট্রেলিয়ার প্রাণী স্বাস্থ্য গবেষণাগার, বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি, কানাডার গুয়েলফ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বাল্টিমোরের জন হপকিনস ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের ১৫ জন বিজ্ঞানী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিকভাবে যেসব প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধিকে অগ্রাধিকার দেয়, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ সেসব রোগের একটি। এ রোগের এখনো কোনো টিকা আবিষ্কার হয়নি। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশই মারা যায়। মানুষ থেকে মানুষেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

এ অঞ্চলে নিপাহ ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল ও বৈশিষ্ট্য শনাক্তের মাধ্যমে এ রোগের টিকা আবিষ্কারের সম্ভাবনাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে দেখছেন ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাদুড় খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার সময় নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। সেই রস পান করলে মানুষও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। একইভাবে বাদুড়ে খাওয়া কাঁচা পেয়ারা, বরই বা অন্য ফল থেকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে। তাই খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে খাওয়া এবং এমন ফল না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। প্রায় প্রতিবছরই এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে দেশে ৩০৩ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। এদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই মারা গেছে। গত বছরও আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে একজন মারা গেছে। এ রোগে আক্রান্ত বেঁচে থাকা রোগীরা দীর্ঘ মেয়াদে নানা ধরনের স্নায়ুগত জটিলতায় ভুগে থাকে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। গত বছরের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পশ্চিমে কেরালা রাজ্যে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। কেরালায় আক্রান্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৭ জনই মারা গেছে।

গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ, ভারতসহ এ অঞ্চলে নিপাহ ভাইরাসের বাহক মূলত একই প্রজাতির বাদুড়। এত দিন বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়ের রক্তরস অথবা জিনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার (পলিমারেজ চেইন রি-অ্যাকশন) মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস বা এই ভাইরাসের সংক্রমণকে চিহ্নিত করা হতো। কিন্তু বাদুড় থেকে জীবিত নিপাহ ভাইরাসকে জিনগত মানচিত্রের মাধ্যমে আলাদা করা সম্ভব হয়নি। কেবল মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ায় দুটি সাফল্য পাওয়া গেছে। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ার ‘সুঙ্গাইয়র নিপাহ’ গ্রামে প্রথম নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এই গ্রামের নামেই ভাইরাসটির নামকরণ। সে বছর দেশটিতে আক্রান্ত প্রায় ৩০০ জনের মধ্যে ১০০ জনের বেশি মারা গিয়েছিল। সেখানে বাদুড় থেকে শূকরে এবং শূকর থেকে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়ায়।

এবার বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশে টেরোপাস মেডিআস গোত্রের বাদুড় থেকে নিপাহ ভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচন করলেন। জিনোম হলো জীবের জিনগত বৈশিষ্ট্যের বিন্যাস বা নকশা। বংশগতির সব বৈশিষ্ট্যই এক বা একাধিক জিনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের তথ্য জানার প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো জিন নকশা উন্মোচন। এ থেকে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের কৌশল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। আকারে বেশ বড় এই বাদুড় ফলখেকো বা উড়ন্ত শিয়াল নামে পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশসহ অস্ট্রেলিয়া, পূর্ব আফ্রিকা, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এদের বসবাস। গবেষক দলে যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) তিন বিজ্ঞানী আশরাফুল ইসলাম, এম জেড রহমান ও ই এস গার্লি।

আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে টেরোপাস মিডিআস গোত্রের বাদুড় নিপাহ ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো ভাইরাসটির জিন নকশা উন্মোচনের ফলে এখন টিকা আবিষ্কারের পথটি সুগম হলো। এ বিষয়ে গবেষণার প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে।

মূলত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। গবেষক দল ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২ হাজার ৭৪৯টি বাদুড়ের মূত্র, থুতু বা লালার নমুনা সংগ্রহ করে। ২০১৩ সালের প্রথম দিকে গাইবান্ধা, ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নওগাঁ, নাটোর, নীলফামারী, পাবনা, রাজবাড়ী ও রাজশাহী—১৩টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর এই ভাইরাসে আক্রান্ত ২৬ জনের মধ্যে ২২ জনই মারা যায়। গবেষক দল ওই বছর এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়কালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও মানিকগঞ্জ থেকেও বাদুড়ের মূত্র ও লালার নমুনা সংগ্রহ করে।

অত্যন্ত সংক্রামক ও ঝুঁকিপূর্ণ এই ভাইরাসের নমুনাগুলো অস্ট্রেলিয়ার প্রাণী স্বাস্থ্য গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকেরা জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে টেরোপাস মেডিআস গোত্রের বাদুড় থেকে ১০ ধরনের নিপাহ ভাইসারকে আলাদা করেন। জিনগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এসব ভাইরাসের মধ্যে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ মিল রয়েছে। দূর-দূরান্তের বাদুড়ের ভাইরাসের মধ্যেও মিল পাওয়া গেছে। যেমন সিলেট ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থেকে পাওয়া বাদুড় থেকে আলাদা করা ভাইরাসের মধ্যে প্রায় হুবহু মিল রয়েছে। এই দুই স্থানের মধ্যে দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার। বাদুড়গুলোর বিভিন্ন আবাসস্থলের মধ্যে আনাগোনা কিংবা চলাচলের যোগসূত্রকে এমন মিলের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বাদুড় থেকে নিপাহ ভাইরাসের জিন নকশা উন্মোচনের কাজটি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জিন নকশা উন্মোচনের পরবর্তী কাজ হিসেবে টিকা তৈরিসহ প্রায়োগিক দিকগুলো নিয়ে গবেষণার ধারাবাহিকতাটা বেশ জরুরি। এ জন্য সরকারকেও উদ্যোগী হওয়া দরকার।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত