প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্রদ্ধাঞ্জলি : অনন্য হাসান আজিজুল হক

জাকির তালুকদার

বিজ্ঞাপনপর্ব পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিলোÑ ‘বাংলা ভাষায় যতোগুলো সত্যিকারের ছোটগল্প লিখিত হয়েছে, তার অর্ধেক সংখ্যক একাই লিখেছেন হাসান আজিজুল হক’। এই বক্তব্যে উচ্ছ¡াসবাহুল্য আছে, অতিকথন আছে সন্দেহ নেই। তবে এ ব্যাপারেও কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে বাংলা ছোটগল্পকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন হাসান আজিজুল হক। তার পরে যারা গল্প লিখতে এসেছেন, আমিও তাদের একজন, তাদের সবার জন্য গল্প লেখাকে কঠিন করে দিয়েছেন হাসান আজিজুল হক। নতুন লেখকের জন্য এই চ্যালেঞ্জ বিরাট হয়ে দেখা দেয় যে তিনি নিজের রচনা দিয়ে হাসান আজিজুল হকের গল্পগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছুতে পারবেন কিনা। অন্তপক্ষে তাকে পাশ কাটিয়ে অন্য পথ খুঁজে নিতে পারবেন কিনা।
হাসান আজিজুল হক আমাদের শিখিয়েছেন যে সাহিত্যে সিদ্ধি বলে কিছু নেই। আছে কেবল অন্তহীন পথ-পরিক্রমা। শিখর বলে কিছু নেই। আছে একের পর এক পর্বত ডিঙানোর পালা। তার নিজের লেখার একটি ঘরানা তিনি তৈরি করতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি মনে করেন নিজের তৈরি ঘরানাতে আবদ্ধ হয়ে থাকাটও লেখকের জন্য ক্ষতিকর। তাই তিনি নিজের তৈরি ঘরানা ভেঙে নতুন পথে চলার জন্য সবসময় উন্মুখ। যে গল্পটি লেখা হয়ে গেছে সেই গল্প নিয়ে তিনি আর ভাবতে নারাজ। মনের মধ্যে তখন নতুন রচনার বীজ আঁকুপাকু করে। এ কারণেই হাসান আজিজুল হককে আমরা বলি, সত্যিকারের ‘জীবন্ত লেখক’।
জীবন্ত লেখক অভিধা তার ক্ষেত্রে আরো কিছু কারণে প্রযোজ্য। তা হচ্ছে লেখালেখির পাশাপাশি তার অ্যাকটিভিজম। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলে নাম লেখাননি তিনি। কিন্তু রাজনীতি তার সার্বক্ষণিক চিন্তার বিষয়। তাই তিনি বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায়। বিভিন্ন সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হন সময় এবং শারীরিক বাধা উপেক্ষা করে। পথ হাঁটেন অধিকারহীন মানুষের অধিকার আদায়ের সঙ্গী হয়ে। সোচ্চার হয়ে ওঠেন বিভিন্ন বিতর্কে। শিক্ষা নিয়ে তার মৌলিক চিন্তা তিনি প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন সময়। সেগুলো দেশের কর্তাব্যক্তিরা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন বা পড়েছেন কিনা আমরা জানি না। পড়লে অন্তত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই দৈন্যদশা ঘটতো না। আদিবাসীদের সকল আন্দোলনে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরকার বারবার আমিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অভিধায় চিহ্নিত করতে চায়। কিন্তু হাসান নিজের সিদ্ধান্তে অটল। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য অবিরাম দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মাঝে মাঝে কিছু বক্তব্য তার অনুরাগীদেরও বিভ্রান্ত করে। অনুরাগীরাও তার বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করতে পারে না। এতে কিন্তু তিনি রাগান্বিত হন না। বরং তিনি ভিন্নমতকে নিজেই উৎসাহিত করতে চান। কারণ একজন যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন যে একজনের মতামতের চাইতে একাধিক জনের মতামত বরং যে কোনো বিষয়ের ওপর বিভিন্ন দিক থেকে আলো ফেলতে সক্ষম হয়। তরুণ, অনুজদের মানসিক ভরসার আশ্রয়স্থল তিনি। ৮০-তম জন্মদিনে তাকে হৃদয়-উৎসারিত শ্রদ্ধা জানাই। লেখক : কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত