প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাঁচতে চাইলে খুন করার আগে মদ খেয়ে নিন

প্রভাষ আমিন : ১. শিরোনামটা দেখে হয়তো আপনারা চমকে গেছেন। ফান মনে করছেন। কিন্তু বিষয়টা ফান নয়, একদম বাস্তবতা। এমনিতে বাংলাদেশে খুনের শাস্তি ফাঁসি। কিন্তু মদ খেয়ে ডাবল মার্ডার করলেও শাস্তি হবে অর্ধেক।

২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল রাতে ইস্কাটনের রাস্তায় যানজটে আটকে বিরক্ত একজন গাড়ির গ্লাস খুলে এলোপাথারি গুলি করেন। তাতে রিকশাচালক হাকিম আর অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আহত হন। পরে হাসপাতালে দুজন মারাও যান। কিন্তু নিম্নবিত্তের দুজন মৃত্যু আমাদের বিবেকে ঝড় তুলতে পারেনি। কোনো কোনো পত্রিকায় ভেতরের পাতায় সিঙ্গেল কলাম নিউজ হয়। আমরা অধিকাংশই ভুলে যাই। কিন্তু ভোলেনি পুলিশ। চাইলে যে বাংলাদেশের পুলিশ অসাধ্য সাধন করতে পারে, এ ঘটনা তার প্রমাণ। একদম ক্লু-লেস একটি মামলা, মিডিয়া বা পলিটিক্যাল কোনো চাপ নেই। তাই সাধারণভাবে পুলিশের ভুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু পুলিশ ভুলে তো যায়নি-ই, উল্টো কেচো খুড়তে গিয়ে বের করে আনে অ্যানাকোন্ডা। জনকণ্ঠ অফিসের সিসিটিভিতে দ্রুতগতিতে ছুটে যাওয়া গাড়ির আবছা ছবিকে পুঁজি করে তদন্ত করে পুলিশ জানতে পারে গাড়িটি তখনকার সরকার দলীয় সংসদ সদস্য পিনু খানের। আর গুলি করেছেন তার ছেলে বখতিয়ার আলম রনি। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তে জানা যায়, তিনি সেদিন তিনটি অপরাধ করেছেন। এক. দুজন মানুষকে খুন করেছেন। দুই. তিনি যে পিস্তল দিয়ে গুলি করেছেন, সেটির লাইসেন্স নেই। তার মানে তিনি অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। তিন. তিনি মাতাল ছিলেন।

বাংলাদেশের আইনে মদ খাওয়া অপরাধ। স্বাস্থ্যগত কারণে মদ খেতে হলে আপনার লাইসেন্স লাগবে। আদালতেও তার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। বিচারক বলেছেন, ‘আসামী যে অপরাধ করেছেন, তাতে মৃত্যুদ-ই তার একমাত্র শাস্তি হয়। কিন্তু শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অবস্থা বিবেচনা করে মৃত্যুদ-ের বদলে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হলো’। তার মানসিক অবস্থা হলো, তার শিশুসন্তান হাসপাতালে ভর্তি ছিলো। আর শারীরিক অবস্থা হলো, গুলি করার সময় তিনি মদ্যপান করেছিলেন। শিশুসন্তানকে হাসপাতালে রেখে যে পিতা বন্ধুবান্ধব নিয়ে মদ খেয়ে ফুর্তি করে, গুলি করে মানুষ মারে, তার তো কোনো অনুকম্পা প্রাপ্য নয়। কিন্তু তিনি পেলেন। শিশুসন্তানকে হাসপাতালে রেখে বন্ধুবান্ধব নিয়ে মদ খেয়ে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে দুজনকে মেরে ফেলার পরও তার শাস্তি যাবজ্জীবন। তাই বলছিলাম, বাঁচতে চাইলে খুন করার আগে মদ খেয়ে নিন, অস্ত্রটা অবৈধ হলে ভালো, শিশুসন্তান হাসপাতালে থাকলে আরো ভালো। আর এমপির ছেলে হলে খুনের মামলার আসামি হলেও আপনাকে হাতকড়া ছাড়াই আদালতে আনা হবে।

নিহত ইয়াকুবের স্ত্রী সালমা বেগম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এই রায়ে আমি অখুশি। আমি জানি এই আসামি একদিন বের হয়ে আসবে’। তার শঙ্কার সাথে আমিও একমত। আমিও জানি, এই আসামি একদিন বের হয়ে দেশের বাইরে চলে যাবে। আমরা হয়তো জানতেও পারবো না।

২. দুই ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন এ পরীক্ষায়। আমার ছেলে প্রসূন আমিনও এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তার কেন্দ্র লালমাটিয়া গার্লস স্কুল। কেন্দ্রের অনেক আগেই জ্যামের কারণে গাড়ি থেকে নেমে হেটে যেতে হলো। কেন্দ্রের সামনে গিয়ে মন ভালো হয়ে গেলো। স্কুলের সামনের রাস্তা বন্ধ, গিজগিজে ভীড়। পরীক্ষার্থীর সাথে বাবা-মা তো বটেই, এসেছেন নিকটাত্মীয়রাও। সন্তান কেন্দ্রে ঢুকে যাওয়ার পরও উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা বসে থাকলেন কেন্দ্রের সামনে। তাদের মধ্যে ব্যস্ত পেশাজীবীরাও ছিলেন। অনেকে সন্তানের পরীক্ষার জন্য ছুটি নিয়েছেন। সন্তানের চেয়ে তার বাবা-মায়ের টেনশন বেশি, বিশেষ করে মায়েদের। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পরীক্ষার্থীর চেয়ে তার মায়ের কষ্ট কোনো অংশে কম ছিলো না। সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় বাবা-মায়ের এই উদ্বেগই আমার মন ভালো করে দিয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঠিকভাবেই বেড়ে উঠছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগেই গেটে জটলা। পুলিশ অনেক কষ্টে অভিভাবকদের দুই সারিতে দাঁড় করালো। লাইনে দাঁড়ানো অভিভাবকরা বারবার উঁকি দিচ্ছেন, তার সন্তান বেরোলো কিনা। বেরুতেই জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন, পরীক্ষা কেমন হয়েছে? পরীক্ষার্থীদের কয়েকজন বেরোনোর সময় নিজেরা আলাপ করছিলো, দোস্ত নিজেকে সেলিব্রেটি মনে হচ্ছে। আসলে দুই পাশে মানুষের সারির মাঝখানে হেঁটে আসলে নিজেকে সেলিব্রেটি মনে হতেই পারে। আসলেই এই সন্তানরাই তো আমাদের আসল সেলিব্রেটি।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত