প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নীরব ভোটারই ফ্যাক্টর

যুগান্তর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে মূল নিয়ামক হবেন নীরব ভোটাররা। সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এমন ২৯ হাজার শিক্ষার্থী নিয়েই গড়ে উঠেছে নীরব ভোটব্যাংক।

এর সঙ্গে যোগ হবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। এর মধ্যে টিএসসিভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, ক্যাম্পাসে অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতি ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা ভোটের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন।

৫টি ছাত্রী হলের ১৫ হাজার শিক্ষার্থী এবং ১৩টি ছাত্র হলের প্রায় ২৫ হাজার আবাসিক-অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৯ হাজারই প্রত্যক্ষভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তবে এদের বড় একটি অংশ অন্য তিনটি ফ্যাক্টরের সঙ্গে জড়িত। এদের অনেকেই সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। কেউ কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কাজ করছেন।

এছাড়া কেউ কেউ ক্যাম্পাসে অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয়। কাজেই নির্বাচনের জন্য প্যানেল তৈরির ক্ষেত্রে সংগঠনগুলো এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে। এরই মধ্যে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নেয়া হয়েছে বহুমুখী উদ্যোগ। এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে ডাকসু নির্বাচনের অতীত অভিজ্ঞতা এবং সাবেক ডাকসু নেতাদের পরামর্শ।

ডাকসু নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১১ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে প্রার্থী বাছাই। কারণ ১৯৯০ সালের ৬ জুন সর্বশেষ নির্বাচনের পর ক্যাম্পাস রাজনীতির ধারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ছাত্র হলগুলোতে সহাবস্থান প্রায় নেই বললেই চলে। আবার আগের মতো সংঘাতের রাজনীতিও প্রায় অনুপস্থিত। সেশনজটও কমে এসেছে।

ফলে ছাত্র রাজনীতিতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কমেছে। রাজনীতিতে আগ্রহী নন এমন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। এ বিষয়গুলো ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে। কাজেই এবার প্যানেলের পাশাপাশি প্রার্থীর আচার-আচরণ ও কর্মতৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আসন্ন নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা হবে ৪০ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৪ হাজারের বেশি। বাকি ১৬ হাজার অনাবাসিক। এর মধ্যে ৫টি ছাত্রী হলে আবাসিক-অনাবাসিক মিলিয়ে আছেন ১৫ হাজার শিক্ষার্থী। এর মধ্যে হলে থাকেন ৯ হাজারের মতো। বাকি ৬ হাজার হলের বাইরে থাকেন। হলে থাকেন এমন ছাত্রীদের মধ্যে সর্বোচ্চ দশ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সে হিসাবে রাজনীতিতে সক্রিয় এমন ছাত্রীর সংখ্যা এক হাজারের বেশি নয়। বাকিরা দলীয় রাজনীতি করেন না।

অনাবাসিক ছাত্রীদের মধ্যে রাজনীতি করেন এমন সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। ১৫ হাজার ছাত্রীর মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার দলীয় রাজনীতি করে না। একইভাবে ১৩টি ছাত্র হলে আবাসিক অনাবাসিক ছাত্রের সংখ্যা ২৫ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে ১৫ হাজার ছাত্র হলে থাকেন। বাইরে থাকেন দশ হাজার ছাত্র। আবাসিক অনাবাসিক ছাত্রদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ছাত্র দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাকি ১৫ হাজার দলীয় রাজনীতির বাইরে। সব মিলে ২৯ হাজার ছাত্রছাত্রীই প্রত্যক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। মূলত এরাই নীরব ভোটার। এ ধরনের শিক্ষার্থীরা যাদের ভোট দেবেন, তারাই জয়লাভ করবেন।

এবারের ডাকসু নির্বাচনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই এই পরিষদ কোটা সংস্কারের আন্দোলন গড়ে তোলে। যা ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। কোটা আন্দোলনে সাফল্যের পর তারা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এদের এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।

ফলে এবার ডাকসুতে প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে এদের সমর্থনের গুরুত্ব বেড়েছে। ডাকসুর নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে রয়েছে পাঁচটি ছাত্রী হলের প্রায় ১৫ হাজার নারী ভোটার। ‘ছাত্রীরা যার, বিজয় তার’ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের একটি কথা এখন ক্যাম্পাসের সর্বত্র শোনা যাচ্ছে। কারণ ছাত্রী হলগুলোতে এখনও কোনো ছাত্র সংগঠন একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি।

এই হলগুলোর সিটের একটি অংশ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে সিট বণ্টনের মূল দায়িত্ব হল প্রশাসনের হাতেই। ফলে ছাত্রী হলগুলো নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনকে ভাবতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনিও ছাত্রী হলগুলোতে ছাত্রলীগের অবস্থানের বিষয়ে কথা বলেন। অন্যদিকে এই হলগুলোতে ছাত্রদলের অবস্থান নেই বললেই চলে। বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর অবস্থাও নাজুক। ফলে ছাত্রীরা সংগঠনের পরিবর্তে প্রার্থীর যোগ্যতা ও সার্বিক কর্মকাণ্ড দেখে প্রতিনিধি নির্বাচনে আগ্রহী হতে পারের বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী তিলোত্তমা শিকদার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র সংগঠনগুলোকে সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। প্যানেলগুলোতে ছাত্রীদের রাখার ক্ষেত্রে সংগঠনগুলোকে উদার মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে। তাহলে পূর্ণ প্যানেলে বিজয় অর্জন সহজ হবে।

ভোটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। এর মধ্যে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি (ডিইউডিএস) ও স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। কারণ এই দুটি সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে কমিটি রয়েছে। আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও তাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বেশি। ফলে নির্বাচনে তাদের বড় ধরনের প্রভাব থাকবে। এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে ডিইউডিএস বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংলাপ শুরু করেছে। সেখানে তারা ডাকসুর বিষয়ে হল ডিবেটিং ক্লাবগুলোর মতামত ও পরামর্শ শুনছে। অন্য সংগঠনগুলোও কয়েক দফায় ডাকসু নিয়ে বৈঠক করেছে।

বেশির ভাগ সংগঠনই জানিয়েছে, তারা ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে ভাবছে। এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট প্যানেলকে সমর্থন না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে দেয়ার চিন্তা করছে তারা। তবে সাংগঠনিকভাবে কোনো প্যানেলকে মৌন সমর্থন দেয়ার চিন্তার কথাও জানিয়েছে কয়েকটি সংগঠন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি (ডিইউডিএস)-এর সভাপতি এসএম রাকিব সিরাজী বলেন, ছাত্র সংগঠনগুলো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের নিজস্ব কিছু চিন্তা রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে হল ডিবেটিং ক্লাবগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি, সংলাপের আয়োজন করেছি। তারা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাব।

নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলের বাইরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক বিবরণী বলছে, মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪০ শতাংশ হলের বাইরে অবস্থান করেন। আর গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত হলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলের সঙ্গে সংযুক্ত ও আবাসিক মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। এর সঙ্গে যোগ হবে এমফিলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। ফলে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৪০ হাজার। হলের বাইরে থাকা ১৬ হাজার শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের আশপাশের হোস্টেল, মেস, নিজ বাসা অথবা আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছেন।

এই শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় নন। এই অনাবাসিক শিক্ষার্থীরাও নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এসবের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতি ডাকসু নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব রাখবে। কারণ অতীতে আঞ্চলিকতার প্রভাবে নিজ সংগঠনের ডাকসু মনোনীতি প্রার্থীকে পরাজিত করার অভিযোগ ছিল তারই সহকর্মীদের বিরুদ্ধে। ব্যক্তি আধিপত্য ধরে রাখতেই বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিকতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাসীন সংগঠনগুলোতে এ ধরনের ঘটনা বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।

এবার আঞ্চলিকতার ক্ষেত্রে বরিশাল, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ, সিলেট, চট্টগ্রাম অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে প্যানেল নির্ধারণে সব এলাকার সমন্বয় করতে হবে ছাত্র সংগঠনগুলোকে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত