প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা!

ঢাকাটাইমস : নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে শুরু হল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। গতবছরের প্রশ্নে পরীক্ষা নেয়া, প্রশ্নপত্রে ভুল, কেন্দ্রে দেরিতে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোসহ নানা অব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিনেই জেরবার হয়েছে পরীক্ষার্থীরা।

শনিবার প্রথম দিনে হয় বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা। সারাদেশে এই পরীক্ষা সকাল ১০টায় শুরু হলেও কোন কোন জায়গায় একঘণ্টা পরেও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পেয়েছে শিক্ষার্থীরা।

প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। এবার এই বিষয়টি নিয়ে কঠোর নজরদারির কথা আগে থেকেই জানিয়েছে সরকার। সেই সঙ্গে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মুলোৎপাটনের ঘোষণাও দেয় পুলিশ।

প্রথম দিন আগেভাগে প্রশ্ন সামাজিক মাধ্যমে আসার বিষয় নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। তবে সমালোচনা হচ্ছে নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মাদারীপুরের কালকিনিতে একটি, মুন্সীগঞ্জে একটি এবং নেত্রকোনার একটি কেন্দ্রে, শেরপুর, চট্টগ্রামের সাতটি কেন্দ্র ও চাঁদপুরে ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।

পুরনো প্রশ্নে পরীক্ষা

চট্টগ্রামে এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে ‘কেন্দ্র সচিবদের ভুলে’ কয়েকটি কেন্দ্রে ২০১৮ সালের সিলবাস অনুসারে প্রণীত প্রশ্নে ২০১৯ সালের পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণ হয়েছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের অধীন সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ভুলের তথ্য জানিয়েছেন বোর্ড কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রামে যে সাত কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হল নগরীর ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মিউনিসিপ্যাল মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় ও গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয় এবং কক্সবাজারের পেকুয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উখিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও উখিয়া পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র।

এরমধ্যে ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দেড় হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪ জন ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দেন বলে জানিয়েছে শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা। অন্য ছয় কেন্দ্রে কতজন পরীক্ষার্থী এই ভুলের শিকার হয়েছেন, তা জানাতে পারেনি শিক্ষা বোর্ড।

ওই সাত কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী কেন্দ্র সচিবদের কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসান ঢাকা টাইমসকে বলেন, তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এবার বাংলা পরীক্ষা ২০১৬, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র অনুসারে হওয়ার কথা। এর মধ্যে সাতটি কেন্দ্রে কেন্দ্র সচিবদের ভুলে ২০১৯ সালের সিলেবাসে যাদের পরীক্ষা দেওয়ার কথা, তাদের মাঝে ২০১৮ সালের সিলেবাস অনুসারে প্রণীত প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়েছে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে মাহবুব হাসান বলেন, ‘কতজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এটা হয়েছে, তা জানা সম্ভব হয়নি। পরে বিস্তারিত জানাতে পারব। তবে এতে পরীক্ষার্থীরা যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে ব্যবস্থা অবশ্যই করা হবে।’

নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের সৃজনশীল পুরাতন প্রশ্ন বিতরণ করেন কর্তব্যরত শিক্ষকরা।

কেন্দ্র সচিব ছায়া সাহা ঢাকা টাইমসকে জানান, ‘পরীক্ষা শুরুর সময় কেন্দ্রের তিনটি কক্ষে প্রায় একশত শিক্ষার্থীর মাঝে ভুলবশত ২০১৮ সালের প্রশ্ন বিতরণ করা হয়। ঘণ্টাখানেক পর বিষয়টি জানাজানি হলে প্রশ্ন পরিবর্তন করে নতুন প্রশ্ন দেয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের এক ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা হয়নি।’

মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী মাহমুদ আকন্দ বলেন, ‘ভুলবশত এ ঘটনাটি ঘটেছে। পরে নতুন ও সঠিক প্রশ্নপত্র দেওয়া হয় এবং সময় বাড়িয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়।’

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার এমএনবিপি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বানিবাইদ উচ্চ বিদ্যালয় ও টেংগড়পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের কয়েকটি কক্ষে ২০১৮ সালের প্রশ্ন বিতরণ করা হয়।

হয়রানির শিকার পরীক্ষার্থীরা জানায়, পরীক্ষার প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা দেখতে পায় তাদের প্রশ্নপত্র ২০১৮ সালের। এতে বিপাকে পড়েন তারা।

এমএনবিপি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রের হল সুপার মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বোর্ড থেকে এসএসসি পরীক্ষার দুইশ প্রশ্নপত্রের একটি প্যাকেটের উপরে লেখা ছিল ২০১৯ সালের প্রশ্নপত্র। কিন্তু ভেতরে কিছু প্রশ্নপত্র ছিল ২০১৮ সালের। এ বিদ্যালয়ের ৭৪ জন শিক্ষার্থীর মাঝে এসব প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়েছিল। পরে পরীক্ষা চলাকালে পরীক্ষার্থীদের নজরে আসে বিষয়টি। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালের প্রশ্নপত্র ও খাতা ফেরত নিয়ে ২০১৯ সালের প্রশ্নপত্র ফটোকপি করে প্রায় এক ঘণ্টা পর পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়। এ জন্য পরীক্ষার্থীদের সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।’

একই পরিস্থিতির শিকার হয় উপজেলার টেংগড়পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থীরা। ওই কেন্দ্রে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীর হাতে দেয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের প্রশ্নপত্র।

টেংগড়পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু রায়হান বলেন, ‘পরীক্ষা শুরু হওয়ার ১০/১৫ মিনিট পর প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করে ২০১৯ সালের প্রশ্নপত্র দেয়া হয়েছে।’

মুন্সিগঞ্জ শহরের এভিজেএম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রর ৫০ ও ৫১ নং কক্ষেও একই ঘটনা ঘটে। জেলার কে কে গভ ইনস্টিটিউশন এর ৪০ জন, রামপাল এনবিএম উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০ জন ও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থী ২০১৮ সালে সিলেবাসে করা প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়।

এভিজেএম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র সচিব সিউলি আক্তার বলেন, ‘কক্ষে পরিদর্শকের দায়িত্বে থাকা রানা কুমার ও আব্দুল গফুর সরকার বিষয়টি আমাকে জানাইনি। পরীক্ষা শেষে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে জেনে সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। পরীক্ষা চলাকালীন সময় বিষয়টি জানতে পারলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারতাম।’

মুন্সীগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আসমা শাহীন বলেন, ‘ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের যেনো কোন ক্ষতি না হয় সে জন্য বোর্ডে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

সাতক্ষীরায় দুইবারে ছয় ঘণ্টা পরীক্ষা দিল ৪৮ জন

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার চাম্পাফুল এপিসি স্কুল এসএসসি কেন্দ্রে ২০১৮ সালের প্রশ্নপত্রে ৪৮ জন পরীক্ষার্থী প্রথমে তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দেয়। পরে প্রায় তিন ঘণ্টা পর নতুন প্রশ্নপত্রে তাদের ফের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহীন জানান, ২০১৯ সালের প্রশ্নপত্র বন্টনের প্রায় তিন ঘণ্টা পর বিষয়টি সবার নজরে আসে। যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে পরে তাদের নতুন বছরের প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।’

‘এ ঘটনার জন্য সরাসরি দায়ী কেন্দ্র সচিব সুখলাল বাইন। তাকে তৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। সেই সাথে নতুন কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন সহকারী কেন্দ্র সচিব আরিফুল ইসলাম। প্রশ্নপত্র ছাত্র ছাত্রীদের হাতে তুলে দেওয়ার কাজে জড়িত আরও ১৫ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন তিনি।

৪০ মিনিট পর কেন্দ্রে প্রশ্ন

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার একটি কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার ৪০ মিনিট পর রচনামূলক প্রশ্ন হাতে পৌঁছার ঘটনা ঘটেছে।

শনিবার উপজেলার দুয়ারিয়া এজি মডেল একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। ওই কেন্দ্রে সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৭৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন।

অভিভাবকরা জানান, প্রশ্ন কেন্দ্রে না থাকায় উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে প্রায় ৪০ মিনিট পর তা বিতরণ করে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।

দুয়ারিয়া এজি মডেল একাডেমির অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রসচিব আবু সেলিম ভূইয়া বলেন, ‘সকালে প্রশ্ন আনতে গিয়ে আমাদের কেন্দ্রে প্রশ্নের প্যাকেটে প্রশ্ন কম মনে হলে বিষয়টি উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তাকে জানাই।’

‘তখন তিনি কেন্দ্রে এসে প্যাকেট খুলতে বলেন। প্যাকেট খুলে দেখতে পাই য সেটে পরীক্ষা নেয়ার কথা সেই সেটটি আমাদের প্যাকেটে নাই। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানালে তিনি উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে দিলে পরীক্ষা শুরু করা হয়।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবীন্দ্র চাকমা বলেন, ‘এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ জানান, দেবিদ্বার একটি পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা ৪০ মিনিট পর প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছে বলে আমি শুনেছি। তবে কী কারণে এমনটি হয়েছে আমি বলতে পারব না।’

 

সর্বাধিক পঠিত