প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যে কারণে বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে সুখ পাওয়া সম্ভব নয়

সারওয়ার চৌধুরী : সুখ মানে পরম সুখ, আবু নসর আল ফারাবি বলেছিলেন। তাঁর মতে সুখ হল ‘এ্যাবসলিউট গুড’। এ এমন এক ভাল, যে-ভাল সর্বোচ্চ, তার পরে আর নাই। আল ফারাবি বলেন, মানুষ পৃথিবীর জীবন ট্রাভেল করতে আসে ঐ পরম সুখে পৌঁছতে।

আল ফারাবি, যাকে আরব বিশ্বে বলা হয় ‘ওস্তাদ আল সানি’, মানে দ্বিতীয় শিক্ষক। প্রথম শিক্ষক এরিস্টটল। তারা মানবজাতির শিক্ষক বটে। শিক্ষক মানেই ত্রুটিমুক্ত না যদিও। তাঁদের অনুসন্ধান গুরুত্বপ‚র্ণ। আল ফারাবি (৮৭২-৯৫৬ খৃষ্টাব্দ) ছিলেন আব্বাসীয় খেলাফতের সময়ের মনীষী। তিনি দর্শন, সমাজ বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞানের কেবল অবদান রাখেন নি, তিনি একজন সুরকারও ছিলেন। পাঁচ তারের উদ-গীটারের উদ্ভাবক ছিলেন তিনি। সংগীতের উপর তাঁর অতুলনীয় বড় একটি বই- ‘কিতাব আল মুসিকি আল কাবির’।

আল ফারাবিকে অনুসরণ করেছিলেন ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ। তাছাড়া পশ্চিমের দার্শনিক থমাস একুইনো essence-existence মতবাদ পেয়েছিলেন আল ফারাবির কাছ থেকে। আল ফারাবি স্কলার মোহসিন মাহদি ও মাজিদ ফাখরি মনে করেন ফারাবি হলেন এমন এক বড় মাপের চিন্তাবিদ, যিনি ‘ইসলামি নিওপ্লাটুনিজম’-র প্রবক্তা। আর আলি আবু মেলহেম লিখেছেন আল ফারাবির রাজনৈতিক দর্শনের গ্রন্থ ঘেটে রাজনীতির সাথে সম্পর্কযুক্ত মানুষের জীবনে সুখ প্রাপ্তি বিষয়ক একটি বই ‘দি এটেইনমেন্ট অব হেপিনেস’ নামে। সেখানে কি কি উপায়ে সুখের নাগাল মিলতে পারে, সেটা আলোচনা করা হয়েছে। এ নামে ফারাবি কোনো বই লিখেন তা বইটির ভ‚মিকায় বলা আছে। বইটির নামের বাংলা তর্জমা হতে পারে ‘সুখ পাওয়ার উপায়’।

মানুষের জীবনে সুখ-শান্তি পাওয়ার উপায় উদ্ভাবনের জন্যে বিখ্যাত দার্শনিক ব্রাট্রান্ড রাসেলও আমৃত্যু কাজ করেছিলেন। বিশ্বব্যাপে কেম্পেইনে নেমেছিলেন। কিন্তু অসফল হয়ে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন।

আল ফারাবির মতে দেশের মানুষ দুনিয়ার জীবনের সুখ ও ‘সুপ্রিম হেপিনেস’ (পরমানন্দ) পেতে হলে চার বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে। সেগুলো হল— theoretical virtues, deliberative virtues, moral virtues and practical arts. এখানে ভার্চু মানে বাংলায় অন্তর্নিহিত শক্তি ধরা যায়, যে-শক্তিগুলো অনির্বচনীয় সুখের কাছে নিয়ে যাবে। তাঁর মতে, যেসব কাজ ঐ সুখের পথে বাধা তা মন্দ, আর যেসব কাজ ঐ সুখের দিকে নিয়ে যায় তা ভাল। ঐ সুখ পরমানন্দ। এই স‚ত্রে তিনি ভাল ও মন্দকে ডিফাইন করেছেন।

‘থিওরিটিক্যাল ভার্চু’ বা তত্বীয় অন্তর্নিহিত শক্তির মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়মের জ্ঞান নিবে মানুষ। এবং মনে রাখতে হবে, তাঁর মতে, A basic understanding of intellectual principles is not sufficient for the achievement of happiness. তিনি বলেন, ব্যক্তি সমাজ বিচ্ছিন্ন থাকলে হবে না। মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসের সাথী হতে হবে। এবং ব্যক্তি রাজনৈতিক শক্তির অংশ হয়ে ‘আল্টিমেইট পারফেকশন’—এ পৌঁছতে হবে। তখন মানুষ বুঝতে পারবে জগতে আসবার কারণ।

‘ডেলিভারেটিভ ভার্চু’ এরিস্টটলের রাজনৈতিক দর্শনেও আছে। কিন্তু আল ফারাবি সেখানে আলাদা করে ‘পলিটিক্যাল ডেলিভারেটিভ ভার্চু’ টার্ম ব্যবহার করেছেন। তিনি এটা বুঝিয়েছেন যে, ব্যক্তি এই গুণের দ্বারা উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কোনটি ভাল কোনটি মন্দ শনাক্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে এ বিবেচনাও থাকে যা, ‘শেষ ভাল যার সব ভাল তার’। তবে এর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র। ব্যক্তি ও দেশের মানুষের নৈতিক শক্তি তাদেরকে সুখে স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করবার সুযোগ করে দিবে। ব্যক্তির মোরাল এক্সেলেন্স তাকে সৎ সাহসী দয়ালু ক্ষমাশীল করে তুলবে। এমন ব্যক্তি গুরুত্ব দিবেন কার্যকারিতাবাদী শিল্প চর্চার। আল ফারাবি তাঁর কিতাব ‘সিভিল পলিটিক্স’-এ বলেছেন, বুদ্ধি দিয়ে বুঝবার এমন বিষয় আছে যা বিশেষ বুদ্ধিমানরা বোঝেন, সাধারণ মানুষ বোঝে না। সেন্স দিয়ে বুঝে নেয়া আর ইন্টেলেক্টের মাধ্যমে বুঝে নেয়া দুই জিনিস। তাঁর মতে মানুষের জন্মগত স্বভাব (innate nature) পরিবর্তন করা না গেলেও, শিক্ষার মাধ্যমে উন্নত করা বা দুর্বল করা সম্ভব।

আল ফারাবির মতে চারটি অন্তর্নিহিত শক্তিই একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কযুক্ত। সুখের সন্ধান পেতে সব দরকার। তিনি বলেন, শিল্প যেভাবে বেশি-বেশি চর্চার মাধ্যমে পরিশীল হয়, সেভাবেই ধর্মনিষ্ঠ জীবন চর্চা মানুষকে ক্রমাগত পরমানন্দ প্রাপ্তির পথে নিয়ে যায়। তিনি দেখান, দর্শনের মাধ্যমে- বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে এবং ধর্ম চর্চার মাধ্যমে মানুষ আনন্দের সাক্ষাত পেতে চায়। মানে দুই পথের উদ্দেশ্য অভিন্ন।

কিন্তু মানুষের জ্ঞান খুব সীমিত পর্যায়ের। তার মাঝে যেটুকু জানে তা প্রকাশ করতে গেলে ত্রুটি থেকেই যায়। ভাব যথাযথ আপলোড হয় না ভাষাতে। ভাষাও ত্রুটিমুক্ত নয়। শামস তাবরিজি বলেছিলেন, ‘মানুষের মাঝে বেশিভাগ ফ্যাসাদ হয় ভাষার ভুল বুঝাবুঝির কারণে’।

মানুষ পৃথিবীর জলভাগের সমুদয় তথ্যের খুব কম জানে। শতকরা ৭১ ভাগ জল। তাও জলভাগের ৯৬.৫% মহাসামুদ্রিক নোনা পানি। খাল নালা নদী নর্দমার মিটা পানিও সব সেখানে গিয়ে মিশে। যেতে যেতে ভাল পানি মন্দ পানি মিক্স হতে হতে যায়। গরীবের গা ধোয়া পানি ধনীর গা ধোয়া পানি, হিন্দু মুসলমানের পানি, পাপীর পানি প‚ণ্যবানের পানি, আসামীর পানি বিচারকের পানি, বিচারপ্রার্থীর পানি, সব মিলে মিশে সমুদ্রের দিকে যায়। মহাসমুদ্রে সব অভিন্ন। সব শুধু নোনা পানি।

একজন বয়স্ক মানুষের দেহপিঞ্জরে গড়ে ধরা যায় ষাটভাগ পানি। মানুষ তার দেহের মিকানিজম সম্পর্কে খুব কম জানে। আর ওদিকে, অবজার্ভেবল মহাবিশ্বের ৮৫ ভাগ ডার্ক মেটার সম্পর্কে বিজ্ঞানিরাও কিচ্ছু জানেন না। পনের ভাগ যেটুকু ডার্কে না, ঐ মহাবিশ্বের অংশ সম্পর্কে প্রিডিক্ট করবার মতো নলেজ মাত্র শতকরা চার ভাগ অংশের। ছিয়ান্নব্বই ভাগ অবজার্ভেবল মহাবিশ্বের কোনো নলেজ মানবজাতির কাছে নাই।

আধুনিক বিজ্ঞান যথেষ্ট পরিপক্ক না। কোয়ান্টাম মিকানিক্স একটি ভাষা। বললেন এ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট নেইল ডিগ্রাস টাইসন। বললেন, এই ভাষা বোঝাচ্ছে সাবএটোমিক পার্টিকলসের আচরণ ষোলআনা ধরতে পারা সম্ভব না। পার্টিকলসের ফ্রি উইল আছে। কখন কোন্ পজিশন নিবে ইলেক্ট্রন এর নিশ্চয়তা নাই। এই কারণে বিশাল মহাপ্রকৃতি আনপ্রিডিক্টেবল। মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির কার্যকারিতাও কি আনপ্রিডিক্টেবল নয়? মানুষের পাণ্ডিত্য ত্রুটিমুক্ত হয় না। আবিস্কৃত তত্বের দুর্বলতা থাকে। মানুষের অভাব থেকেই যায়। সব দিক থেকে সমৃদ্ধ মানুষটিও অভাবে থাকে, অপ‚র্ণতায় থাকে। তাই প্রার্থনার ইতি হয় না। মানুষ জ্ঞানী (আলেম) তাঁর পাণ্ডিত্য প্রকাশের পর বলেন, ‘ওয়াল ইলমু ঈনদাল্লাহ’, মানে জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছে। জীবনের সমস্যা সমাধানের বেলায় মানুষ ষোলআনা নির্ধারক (ডিটারমিন্যান্ট) হতে পারে না। অভাবে থাকা প্রাণ-সত্তা সেল্ফ ডিটারমাইনিং হওয়া সম্ভব না বলেই বুঝে নেয়া যায় যে, কেবল বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে মানুষ পরম সুখের সাক্ষাত পাবে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত