প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি ‘খাম্বা’ দিলেও রাগ হয় না আওয়ামী লীগ বিদ্যুৎ দিলেও মন ভরে না

বিভুরঞ্জন সরকার :  তখন যায়যায়দিনে কাজ করি। একদিন কী কারণে যেন সম্পাদক শফিক রেহমান একটু চড়া মেজাজে ছিলেন। বললেন, আমি যে রাজনৈতিক লেখা লিখি সেটা লিখতে নাকি তার হাত লাগবে না, বাঁ-পা-ই যথেষ্ট।

আরো বললেন, তার কলামটি হলো আসল লেখা। মাথা খাটিয়ে লিখতে হয়। মিলা-মঈনের পরকীয়ার মিশেলে রাজনীতির কথকতা তৈরি চাট্টিখানি কথা নয়! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গলদঘর্ম হয়ে তবেই অমন লেখা পয়দা করা যায়। আমি যা লিখি তা লিখতে কোনো চিন্তা-ভাবনা লাগে না। বসলেই লেখা হয়ে যায়।

তো, এতো বছর ধরে সেই সহজ কাজটিই আমি করে চলেছি। তবে আজকাল আমারও আর এসব লিখতে ভালো লাগে না। ক্লান্তি লাগে। পাঠকেরও ভালো লাগে না। তারাও বিরক্ত।

কেউ কেউ বলেন, আমার লেখায় নাকি সেই যায়যায়দিনের ধার আর নেই।

আমি মনে মনে হাসি। কিছু বলি না। বলে লাভ নেই। সময় যে একটি বড় ফ্যাক্টর সেটা আমরা অনেকেই ভুলে যাই। যায়যায়দিন যখন প্রথম বের হয় তখন এরশাদ ক্ষমতায়। তিনি সামরিক স্বৈরশাসক। দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এবং মানুষ তার বিরুদ্ধে। যায়যায়দিনও এরশাদের বিরুদ্ধে। তাই সবারই যায়যায়দিন ভালো লাগতো।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নব্বইয়ের দশকে যখন আবার যায়যায়দিন বেরুলো তখন কিন্তু পত্রিকাটি আগের জনপ্রিয়তা পেলো না। মানুষ তখন দলে দলে বিভক্ত। আওয়ামী লীগের যেটা ভালো লাগে বিএনপির সেটা লাগে না। সিপিবির ভালো লাগা আর জামায়াতের ভালো লাগা মেলে না।

আর একটি পরিবর্তন হলো, আমার নাম। আমি এরশাদ আমলে লিখতাম তারিখ ইব্রাহিম নামে, ছদ্মনাম আর কী! কিন্তু খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক জামানায় আর নাম গোপন করার দরকার কী! স্বনামেই লেখা শুরু করলাম। এতেও এক ধরনের বিরূপতা শুরু হলো।

একদিন আমি নাইট কোচে ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যাচ্ছি। পাশে বসা ভদ্রলোক যায়যায়দিন পড়ছিলেন। তিনি আমাকে চেনেন না। একসময় পত্রিকাটি ভাঁজ করে সাইডব্যাগে রাখলেন এবং স্বাগত মন্তব্য করলেন : এখন আর যায়যায়দিন পড়ে মজা পাই না। আগে তারিখ ইব্রাহিম লিখতেন। কী ধারালো কলম। আর এখন এক ‘মালাউন’ ( বিভুরঞ্জন) লিখছে। একেবারে ম্যাদামারা!

আমাদের অনেক পাঠক যে শুধু লেখা নয়, লেখকের নামও পড়েন, সেটা অস্বীকার করা যাবে না।

সব মানুষের ভালো লাগবে, সব মানুষ প্রশংসা করবে তেমন লেখা এখন একটু কঠিন বৈকি! রাজনীতিতে যেখানে ঐকমত্য নেই, নানা দলে, নানা মতে ঝগড়া যখন প্রকাশ্য- তখন কোনো রাজনৈতিক লেখা পড়ে সবাই বাহবা দেবেন, সেটা কী হতে পারে!

কেউ বলবেন, সাহস করে সত্য প্রকাশ করতে হবে। আবার কেউ বলবেন, সব সত্য সবসময় প্রকাশ করতে নেই!

একজন চাইবেন, মতপ্রকাশের অবাধ অধিকার। আরেকজন সামাজিক শান্তি-স্থিতির জন্য ক্ষতিকর মতপ্রকাশে নিয়ন্ত্রণ চাইবেন।

একজন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বাধামুক্ত চাইলে আরেকজন চাইবেন না, মানুষের জানমালের নিরাপত্তার যুক্তি তুলে!

সরকারের পক্ষে কোনো বক্তব্য দিলে সেটা নির্ঘাত দালালি। আবার বিরোধী মতের পক্ষের বক্তব্য হালালি!

কেউ হয়তো বলবেন, দলবাজি না করে ন্যায্য কথা লিখলেই তো ঝামেলা মিটে যায়। আসলে কী মেটে? ‘ন্যায্যতা’ও কী সবার কাছে এক? শেখ হাসিনার কাছে যা ন্যায্য, খালেদা জিয়ার কাছেও তাই কী ? বিএনপি খাম্বা দিলেও অনেকের মনভরে, আওয়ামী লীগ বিদ্যুৎ দিলেও রাগ যায় না।

সবাইকে গালাগাল দিলে অনেকে খুশি হন। ওটাকে নিরপেক্ষতা বলে মনে করেন। কিন্তু ভোট তো আপনি কাউকে না কাউকে দেন। তখন তো আপনি নিরপেক্ষ থাকেন না।

আপনার পক্ষপাত প্রকাশ্য হলে আমারটা গোপন থাকবে কেন?

লেখক : গ্রুপ যুগ্মসম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত