প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঢাকার ট্রাফিক শৃঙ্খলা : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা বহুলাংশেই বাস্তবায়ন হয়নি

বণিক বার্তা : নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে গত বছরের ১৬ আগস্ট ১৮টি নির্দেশনা দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট। পরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, পরিবহনের ফিটনেস ও লাইসেন্স ব্যবস্থা উন্নয়নে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, যা ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এরপর সাড়ে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও পুরো বাস্তবায়ন হয়নি সেগুলো।

রাজধানীতে ১২১টি বাস স্টপেজ থাকলেও বন্ধ হয়নি যত্রতত্র যাত্রী ওঠা-নামা। ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাসের ১০০ মিটারের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন পথচারী। সড়ক বিভাজক ফাঁকফোকরে ভরা। হকারমুক্ত হয়নি ফুটপাত। আছে অবৈধ পার্কিং। স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগনাল চালু হলেও এখনো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়।

সম্প্রতি ‘ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এতে বলা হয়, বাসচাপায় দুজন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ট্রাফিক শৃঙ্খলার উন্নয়নে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করে কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। তবে এসব নির্দেশনা বহুলাংশে বাস্তবায়িত হয়নি। একই প্রতিবেদনে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ২৯ দফা সুপারিশও করেছে ডিএমপি।

ডিএমপির প্রতিবেদনের সত্যতা মিলেছে সরেজমিন ঢাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে। দেখা গেছে, বাস থামার জন্য যে ১২১টি পয়েন্ট মার্কিং করে দেয়া আছে, সেগুলোর ব্যবহার তেমন হচ্ছে না। একইভাবে চলন্ত বাসের দরজা বন্ধ রাখার যে নির্দেশনা ছিল, তারও বাস্তবায়ন নেই। যেটুকু আছে, সেটিকে ‘গেট লাগানোর ভান’ করা হিসেবে মনে করছেন সাধারণ যাত্রীরা।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মিরপুর এলাকার বাসিন্দা ফজলে রাব্বি বলেন, মিরপুর ১২ টু মতিঝিল, পুরোটাই বাস স্টপেজ! মিরপুর ১০ ছেড়ে যাওয়ার সময় নামকাওয়াস্তে গেট লাগানোর ভান করা হয়। বাসের সংখ্যাও অপর্যাপ্ত। ভাড়া নেয়া হচ্ছে সিটিং সার্ভিসের, অথচ সেবা লোকাল বাসের চেয়েও খারাপ।

ঢাকার বেশির ভাগ ফুটপাত আগে যেমন হকারদের বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এখনো তাই আছে। সড়কে যে যার মতো যানবাহন পার্কিংও করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় ঢাকার আন্ডারপাসগুলোয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়না লাগানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে ঢাকার আন্ডারপাসগুলো ঘুরে সে রকম কিছু চোখে পড়েনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত, জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ফুটপাত হকারমুক্ত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেমন একটা ভূমিকা আছে, তেমনি এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি। ফুটপাত দখলমুক্ত করা গেলে কিন্তু সড়কের বিশৃঙ্খলা এমনিতেই অনেকটা কমে যাবে। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে মানুষকে সচেতন হতে হবে। ব্যবহারে কঠোর আইন প্রয়োগের বদলে আগে মানুষের মাঝে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সড়কে শৃঙ্খলার জন্য সবার সম্মিলিত চেষ্টা ও সহযোগিতা জরুরি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, কিছু নির্দেশনা আছে, যেগুলোর বাস্তবায়ন কিছুটা সময়সাপেক্ষ। আবার তাত্ক্ষণিক বা কয়েক মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করা যায় এমন নির্দেশনাও আছে। ঢাকায় ১২১টি বাস স্টপেজ বানানো হয়েছে। এগুলোর ব্যবহার তাত্ক্ষণিকভাবেই সম্ভব। এজন্য যাত্রী, পরিবহন চালক-মালিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সবাইকেই সহযোগিতা করতে হবে। যদি সবার সহযোগিতা না মেলে, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যতই নির্দেশনা আসুক, সেগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে ডিএমপি বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা আনার কাজে সবচেয়ে বেশি দরকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়। বিষয়টি সম্পর্কে ডিএমপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু ট্রাফিক আইন প্রয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এর সঙ্গে সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ), বিআরটিসি (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন), রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ), ডিটিসিএ (ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে ডিএমপি। এজন্য ডিএমপি এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ২৯টি কর্মপরিকল্পনা। এগুলো বাস্তবায়নে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নয়নে বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত যেমন এখনো অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে, তেমনি কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে রাজধানীবাসী। গণপরিবহনের দৃশ্যমান স্থানে চালক ও সহকারীর ছবি, নাম, লাইসেন্স নম্বর, সেলফোন নম্বর উল্লেখ থাকায় হয়রানির ঘটনায় প্রতিকারের সুযোগ পাচ্ছেন যাত্রীরা। একইভাবে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী উভয়ই হেলমেট ব্যবহার করায় কমেছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। যদিও ব্যবহূত হেলমেটের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন নির্দেশনাসহ সড়কে শৃঙ্খলা আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল ডিটিসিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার বাদে ঢাকা শহরে সভা-সমাবেশ-শোভাযাত্রা বন্ধের যে সিদ্ধান্ত এর আগে ডিটিসিএর বোর্ড সভায় নেয়া হয়েছিল, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। নগরীর দখল হওয়া ফুটপাত উদ্ধার করে পথচারীদের ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে সিটি করপোরেশনকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সামনে বা পাশে হর্ন বাজানো বন্ধে ট্রাফিক বিভাগ, পরিবহন মালিক, চালক এবং জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন মন্ত্রী।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত