প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

১০ টাকায় জল-খাবার এবং সুই ও চালনি সমাচার

আফরোজা সোমা : ‘ইউনিভার্সিটির’ আর ‘গর্ব’ করার মুখ আছে কী নেই তা নিয়ে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচিত হতে পারে বৈকি। ‘ভিসি সাহেবে’র নাল্লাইতা খাসলত নিয়ে মজা নিচ্ছেন, নেন। তবে নিজে চালনি হয়ে সুইয়ের ছেদা খুঁজে বেড়ানোর সংস্কৃতি যেখানে আসন গেড়ে বসে সেখানে সকলেই সকলকে নিয়ে কেবলই ‘মজাক’ করতে থাকে।

এ দেশে ঘুষ বন্ধ করতে না পেরে উজির সাহেব স্পিড মানিকে বৈধতা দেন এবং সেটা নিয়া ‘গর্ব’ করেন, ডাক্তারকুলের অনাচার বন্ধ করতে না পেরে সরকারি হাসপাতালেই তাদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার বন্দোবস্ত করে দেয়ার চিন্তা করতে হয় এবং সেই চিন্তাকেও বিনা প্রশ্নেই স্বাভাবিক মনে করা হয়, এ দেশে ধর্ষণের বিচার হয় না উল্টা মেয়েটি কী কাপড় পড়ছিলো তা নিয়ে শহুরে আধুনিকরা পর্যন্ত যুক্তি দিয়ে মুখে ছ্যাপ তুলে ফেলে, এ দেশে ধর্ষণের বিচার হয় না কিন্তু ধর্ষণকারীকে মেরে তার গলায় চিরকুট ঝুলিয়ে দিলে লোকে সেটাকে উচিত বিচার হয়েছে বলে ভাবে এবং ভেবে বাহবা দেয় আর ‘গর্ব’ করে, চোর-গুন্ডা-বদমাশ-ডাকাত-সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনতে না পেরে তাদের ধরে ধরে ‘হার্ট অ্যাটাক’ ঘটিয়ে মেরে ফেলা হয় বা অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া হয়, এ দেশে ইয়াবার সাথে জড়িত চামচিকারা লাশ হয়ে পথের ধারে পড়ে থাকে কিন্তু রাঘব বোয়ালদের টিকিদের দেখা মেলে না, এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার বদলে ভোটার নিয়োগ দেয়া হয়, এই দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কনসালটেন্সির কাজে এতোই ব্যস্ত সময় পার করেন যে, তারা শিক্ষার্থীদের তাদের পুণ্যমুখখানি দর্শনের সময়টুকুও পর্যন্ত দিতে অপারগ, তাই এ দেশের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় কর্তা ‘গর্ব’ করার আর কিছু না পেয়ে ১০ টাকার জল-খাবার নিয়ে ‘গর্ব’ করেছেন। এতে আপনার কোনো সমস্যা?

আরেকটা কথা, আপনারা যারা ‘ভিসি সাহেবের উচ্চারণ’ নিয়ে শরমে মরে যাচ্ছেন, আমার খুব আপনাদের বক্তৃতা শুনতে মন চায়। আপনে কী সাংবাদিক? আপনার একটা লাইভ অ্যা অ্যা অ্যা শুনতে মন চায়। আপনার একটা ভ্যা ভ্যা ভ্যা ভ্যাজর ভ্যাজর শুনতে মন চায়। আপনি কী রাজনীতিবিদ? আপনার একটা ‘গর্ব’ করার মতো স্টেজ কাঁপানো ভাষণ শুনতে মন চায়। আপনি কী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক? আপনি কতোক্ষণ ইউনিভার্সিটিতে থাকেন, কতোক্ষণ কনসালটেন্সি করেন, কতোক্ষণ ‘প্রাইভেটে’র ছাত্রছাত্রীদের বাবা-সোনা বলে তেলান আর কতোক্ষণ পাবলিকের ছাত্রছাত্রীদের গরিব-চাষা-ভুষা-আনকালচার্ড বলে নিজের বড়ত্ব জাহির করেন সেইটা জানতে মন চায়। ও হ্যাঁ আপনি যে ভাষায় কথা বলেন তা কতোখানি ‘সহি’, ‘শুদ্ধ’ ও ‘কিতাবী’ ভাষা সেটাও জানতে মন চায়। এ দেশে মুখের ভাষাও যে মানুষকে মাপার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে তা নতুন বিষয় বৈকি! কিছুদিন আগে হিরো আলমকে আলমের এক নং পচা সাবান দিয়ে যারা ধুয়েছেন তারা এটিও বলেছেন যে, এ শালা ঠিকমতো কথাটা পর্যন্ত বলতে পারে না, সে আবার এমপি হতে চায়! আমার জানতে মন চায়, সংসদে যতো সংসদ সদস্য আছেন তাদের ক’জন নদীয়া-শান্তিপুরী ভাষায় কথা বলেন?

আমাদের রাষ্ট্রপতিকে নিয়েও আড়ালে-আবডালে লোকে হাসে। ‘মজাক’ নেয়। লোকটা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন বলে তাকে সকলে খালি বোকা বা বেয়াকুফ নয়, এমনকি বোগদা ঠাওরান। অথচ এ মানুষটি যে কতো বড় পাবলিক স্পিকার সেটি তার সাথে বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়ালে টের পাবেন। আপনার শুদ্ধ ভাষা তার কাছে পাত্তা পাবে না।

আমরা খালি ভাষার পোশাক খুঁজি আজকাল। আর কে কোথায় বরিশাইল্যা, কী নোয়াখাইল্যা, কী সিলেইট্যা উচ্চারণে কথা বললো তাই নিয়ে হাসাহাসি করি। সব কিছুই হাসাহাসি। সব কিছুই তামাশা। দেশটাও যেন তামাশা এক।

যে দেশে স্পিড মানির কথা সগর্বে বলা যায়, সে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গর্ব করার আর কিছু না পেয়ে ১০ টাকার জল-খাবার নিয়ে গর্ব করেছেন দেখে এতো হাসির কী আছে! কোন চক্করে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যা, শুদ্ধতা ও জ্ঞানচর্চার জায়গা না হয়ে কেবল তেলানি আর ফাঁকি দেয়ার জায়গা হয়ে উঠে সেইটা নিয়ে হাসতে মন চায় না, ভাই সকল?

আসুন, আমরা সবাই হাসি। হাসতে হাসতে আমরা যারা সুইয়ের মতো একটা ছিদ্র নিয়ে আছি তারা চালনির মতো শতেক ছিদ্র অর্জন করি। আর যারা ইতোমধ্যেই চালনি হয়ে আছি তাদের ছিদ্রের সংখ্যা আরো বেড়ে স্বাস্থ্য খাতের কিংবদন্তি আবজালের ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো অগণিত হয়ে উঠুক।

বাই দা ওয়ে, বহুদিন পর সেখানে গিয়ে এ মাসেই ১০ টাকার চা, শিঙাড়া, সমুচা ও চপ খেয়ে আমি বড় আপ্লুত অবস্থায় এ ছবি তুলে রেখেছিলাম। ফেসবুক থেকে

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত