প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অভিনব জালিয়াতিতে আঙুল ফুলে কলাগাছ বুলবুল

আমাদেরসময় : ভারতের শ্রীনগরের শিক্ষার্থী ফাইজার ফারুক। চলতি শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশের স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সার্ক কোটায় ভর্তির জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। কিন্তু সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির যোগ্যতায় জীববিজ্ঞানে তিনি ১০০ নম্বর পেয়েছেন বলে দেখানো হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, এটি আসলে তার টেম্পারিং করা নকল মার্কসশিট।

আসল মার্কসশিট অনুযায়ী জীববিজ্ঞানে তিনি পেয়েছেন ৯৩। শুধু ফারুক নয়, মোটা অংকের টাকা নিয়ে একটি চক্র দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমন আরও বিদেশি শিক্ষার্থীদের এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আর এ চক্রের অন্যতম হোতা রেজাউল ইসলাম বুলবুল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী বুলবুল এ অবৈধ ভর্তিবাণিজ্যের মাধ্যমেই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে দুদক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বুলবুল সেখানে এডুকেশন শাখায় উচ্চমান সহকারী হিসেবে কর্মরত। তিনি এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষক আফজাল হোসেনের শ্যালক।

বুলবুলের বিরুদ্ধে বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোয় সার্ক কোটায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানোর অভিযোগ রয়েছে। আর এ কাজের লেনদেন হতো খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভেতরেই। এ কাজে বুলবুলের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অধিদপ্তরের আরও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি চক্র। ভুয়া টেন্ডার ও জাল ভাউচার দিয়ে কেনাকাটার বিল দাখিল করে সরকারি অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে বুলবুলসহ চক্রটির বিরুদ্ধে। সম্প্রতি প্রাথমিক তদন্তে তাদের অবৈধ সম্পদ উপার্জনের সত্যতাও পেয়েছে দুদক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভর্তিবাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বুলবুলের এ সিন্ডিকেটে আরও ২০ থেকে ২৫ জন রয়েছে। এদের মধ্যে দেশের বাইরেও আছে বেশ কয়েক জন। তারা হলেনÑ নেপালের সগির খান, সঞ্জীব ইয়াদব, ভারতের দিল্লির মানিস জওয়ান, কলকাতার চৈতালী সেনগুপ্তা, সঞ্জয় সাহা, কাশ্মীরের তাহির বাবা। চলতি বর্ষে ভর্তির জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এখন ঢাকায় অবস্থান করছে এ চক্রটি। এ ছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই শিক্ষা শাখায় আছে প্রভাবশালী আরেকটি চক্র। এর প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন গ্রেপ্তারকৃত আফজাল হোসেন। তিনি প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে গত পাঁচ শিক্ষাবর্ষে সার্ক কোটার বাইরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজেগুলোতেও অন্তত ৪ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীকে ভর্তি করেছেন।

সূত্রটি আরও জানায়, যেসব বিদেশি ছাত্রছাত্রী সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করেন তাদের আবেদনপত্র, সার্টিফিকেট, মার্কসশিট বিভিন্ন দেশে দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে মেডিক্যাল এডুকেশন শাখায় পৌঁছায় মেরিট লিস্ট তৈরির জন্য। আর এ মেরিট লিস্টটি করতেন বুলবুল। এমনিতে প্রত্যেক আবেদনকারীর আবেদনপত্রে যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর এবং ই-মেইল আইডি দেওয়া থাকে। মেরিট লিস্ট তৈরি করে বুলবুল যাদের ভর্তির সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর ও ই-মেইল আইডি দিতেন তার বিদেশি এজেন্টদের। পরে সেই বিদেশি এজেন্টরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভর্তি করে দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করত। সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে এ রফা হতো। জালিয়াতির মাধ্যমে পছন্দের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষে এ টাকার একটি বড় অংশ পৌঁছে যেত বুলবুলের কাছে।

সাধারণত সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হতে ভালো নম্বর থাকতে হয়। কিন্তু যেসব শিক্ষার্থীর ভর্তি হওয়ার মতো নম্বর থাকে না, তারাই মূলত বুলবুল ও তার সিন্ডিকেটের টার্গেট হতো বলে জানা গেছে। বুলবুল তার বিদেশি এজেন্টদের দিয়ে সেসব ছাত্রছাত্রীর মার্কসশিট হুবহু নকল করে পর্যাপ্ত নম্বর বসাত এবং পরে তা জমা দিত সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে। পরে ভুয়া নম্বর নিয়েই ওই শিক্ষার্থীরা মেরিট লিস্টে স্থান পেত। এভাবে বুলবুল ও তার সিন্ডিকেট বর্তমান ২০১৮-১৯ শিক্ষবর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় শিক্ষার্থীকে সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করেছে বলে জানা গেছে। আর এ অবৈধ কর্মকা-ের বিনিময়ে শুধু বুলবুলই বাগিয়ে নিয়েছেন দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য ইকুইভ্যালেন্স সার্টিফিকেট দরকার হয়। সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক যোগ্য ছাত্রছাত্রী ইকুইভ্যালেন্স সার্টিফিকেটের জন্য ২০১০ সাল থেকে অতিরিক্ত ১০ বা ১৫ হাজার টাকা দিতে বাধ্য। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ২৫০০ ইকুইভ্যালেন্স সার্টিফিকেট ইস্যু হয়। যার প্রতিটি থেকে বুলবুল টাকা আদায় করেন বলেও অভিযোগ আছে। মূল নম্বরপত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নম্বর না থাকলেও ভুয়া নম্বরপত্র তৈরির মাধ্যমে বুলবুল ইকুইভ্যালেন্স সার্টিফিকেট ইস্যু করতেন। এর জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিনি আদায় করতেন ৫/৭ হাজার ডলার। এভাবে ওই শিক্ষাবর্ষে বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের ইকুইভ্যালেন্স সার্টিফিকেট ইস্যু করেও ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বুলবুল। শুধু তাই নয়, নন-সার্ক কোটায়ও এমবিবিএস কোর্সে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের কলেজে সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়েও বুলবুল ৩ থেকে ৭ হাজার ডলার আদায় করতেন।

এরই মধ্যে আফজাল হোসেনের দুর্নীতির সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বুলবুলসহ আরও ৫ জনের নাম এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজ বৃহস্পতিবার দুদক বুলবুল, ফরিদপুর টিবি হাসপাতালের ল্যাব এটেনডেন্ট বেলায়েত হোসেন, জাতীয় অ্যাজমা সেন্টরের হিসাবরক্ষক লিয়াকত হোসেন, গাড়িচালক রকিবুল ইসলাম, খুমেক হাসপাতালের অফিস সহকারী শরিফুল ইসলামকে তলব করেছে।

এ বিষয়ে রেজাউল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি মহল চক্রান্ত ও অপপ্রচার চালাচ্ছে আমার বিরুদ্ধে। আমি কোনো অবৈধ কর্মকা- ও লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত