প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টোব্যাকো কোম্পানির অগ্রীম ঋণের লোভে ৯০ভাগ জমিতে তামাক চাষ

মো. নুরুল করিম আরমান, লামা প্রতিনিধি : বান্দরবানের লামা উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার একর ফসলি জমিতে বিষবৃক্ষ তামাকের চাষ হয়েছে। গত তিন যুগ ধরে একটানা উপজেলার ফসলি জমিতে এ তামাক চাষের ভয়াল বিস্তারে সহযোগিতা করছে বেশ কয়েকটি টোব্যাকো কোম্পানি।

এ কারণে বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে স্থানীয় কৃষকেরা। বর্তমানে উপজেলায় চাষাবাদের দুইটি মৌসুমে পরিণত হয়েছে। একটি ধানের, অপরটি তামাকের। ফসলি জমিতে অব্যাহত তামাক চাষের ফলে প্রতি বছর বোরো ও রবি শস্যের উৎপাদন যেমন মারাত্নকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি মাটির উর্বরাশক্তিও দিন দিন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি এ চাষে সংশ্লিষ্ট কৃষকরা জটিল রোগে আক্রান্তসহ ব্যবহৃত কীটনাশক খাল বিল নদী ও পুকুরের পানির সাথে মিশে মাছের প্রজনন মারাত্নক ভাবে হ্রাস পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গোটা বিশ্বের সঙ্গে দেশবাসী যখন সরব, তখন গাছগাছালির সবুজ বনায়নের বদলে উপজেলায় তামাক চাষের প্রসার নিয়ে সচেতন মহল উদ্বিগ্ন। এখনিই পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষ বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা না হলে আবাদি জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়ে অচিরেই উপজেলায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা যায়, মাতামুহুরী নদীর পলি বাহিত উর্বর এলাকা এবং জ্বালানি কাঠের সহজলভ্যতার কারণে দেশের প্রধান প্রধান তামাক কোম্পানিগুলো ১৯৮৪ সাল থেকে লামায় তামাক চাষ শুরু করে। উপজেলার লামা সদর ইউনিয়নের মেউলার চর এলাকায় সর্বপ্রথম ১০ একর জমিতে তামাক চাষ করা হয়।

এরপর থেকে গত ৩৫ বছরে ক্ষতিকর তামাক চাষের ভয়াল বিস্তার ঘটেছে লামা পৌরসভা এলাকাসহ ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানের বোরো ও রবি মৌসুমের ফসলি জমিতে। বর্তমানে ৯০ভাগ জমি তামাক চাষের দখলে। কৃষি বিভাগ সূত্র মতে, চলতি মৌসুমে তামাক কোম্পানিগুলো প্রায় ২ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ করেছে। বেসরকারি হিসাব মতে এর পরিমাণ ৩গুণ বেশি হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তামাক কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক সুবিধা হাসিলের জন্য কৌশলগত কারণে কখনো তাদের রেজিস্ট্রেশনকৃত তামাক চাষির সংখ্যা ও জমির পরিমাণের প্রকৃত তথ্য দেন না।

তবে বিভিন্ন সূত্র মতে, চলতি মৌসুমে বিভিন্ন তামাক কোম্পানির আওতায় প্রায় ৬ হাজার একর ফসলি জমিতে ক্ষতিকর তামাক চাষ হয়েছে উপজেলায়। ব্রিটিশ আমলের নীলকর জমিদারদের মতোই উপজেলায় এ বিষের আবাদ করার জন্য আস্তানা করেছে ঢাকা, আবুল খায়ের, আকিজ ও বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি। আবার এ চাষে নারী ও শিশুদেরকেও খাটানো হচ্ছে অহরহ। এতে করে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা।

স্থানীয়রা জানান, মৌসুম এলেই তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের বীজ, সার, কীটনাশক, পাওয়ার টিলার, পাওয়ার পাম্প, নগদ ঋণ, সর্বোপরি বাজারজাতকরণের সুবিধা প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে কৃষকরা লোভের বশবর্তী হয়ে ফসলি জমিতে বোরো ও রবি শস্যের আবাদ না করে ক্ষতিকর তামাক চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। চাষিদের সুবিধার জন্য কোম্পানিগুলো উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছেন বড় বড় ক্রয় কেন্দ্র ও গোডাউন। যেখানে চলে যায় কৃষকদের উৎপাদিত তামাক।

এদিক থেকে পিছিয়ে পড়ছেন সরকারের কৃষি বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ফসলি জমি, মাতামুহুরী নদীর চর ও কোল ঘেষে, দুপাড়, থানা ও বন বিভাগের জমিতেও ব্যাপকহারে তামাক চাষ করা হয়েছে। উপজেলার আবাদি ফসলি জমিতে ব্যাপক হারে তামাক চাষের কারণে চলতি মৌসুমে বোরো ও রবি শস্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৫ হাজার ২৩ হেক্টর। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে বোরো এবং ৫৯০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৮০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। যদিও বিগত বেশ কয়েক বছর উপজেলার বোরো ও রবি শস্য উৎপাদন শুধু কৃষি বিভাগের কাগজে কলমে অর্জিত হয়ে থাকে।

জানা গেছে, উপজেলার ৩০টি ব্লকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠ পর্যায়ের এসকল কর্মকর্তাদের সাথে কৃষকদের সখ্যতা না থাকা, মাঠ পর্যায়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করা, সর্বোপরি তামাকের ক্ষতিকর দিকগুলো কৃষকদের সামনে তুলে ধরার ব্যর্থতার কারণে এলাকার কৃষকেরা তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে বাজারজাত করার নিশ্চিত সুবিধা ও তামাক চাষে কম্পানিগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার কারণে স্থানীয় কৃষকেরা বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফসলি জমিতে ব্যাপক হারে তামাক চাষের ফলে এলাকায় বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে কমেছে।

তিন দশক পূর্বে এলাকার পলিমাখা উর্বর জমিতে ফসল উৎপাদনে বৈচিত্র্য ছিল। বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন করে চলত এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা। বোরো ও রবি মৌসুমে একদিকে সোনালি ধানে মাঠ ভরে উঠত। অন্যদিকে, উৎপাদন হত গোল আলু, বেগুন, টমেটো, মরিচ, ফেলন, সিম, বাদাম, মিষ্টি কুমড়া, ক্ষিরা, সরিষা, পেঁয়াজ, বরবটি, কপি, মুগডাল ও মাসকলাইসহ বৈচিত্র্যময় নানান ফসল। এখন আর এ সকল ফসল উৎপাদন হয় না। মাঠজুড়ে শুধু তামাক আর তামাক।

তামাকের আগ্রাসনের পূর্বে প্রতি কৃষকের ঘরে ধানের সাথে পুরো বছরের জন্য অন্যান্য খাদ্য ফসল মজুত থাকত। এর মধ্যে শুকনো মরিচ, আলু, রসুন, সরিষা, ডাল, সিম বিচি, পেঁয়াজ আদা, হলুদ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে সবকিছুই চট্টগ্রাম ও চকরিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রয় করে স্থানীয় বাজারে বাজারজাত করতে হচ্ছে।

পৌরসভার কলিঙ্গাবিল এলাকার তামাক চাষী মো. ইলিয়াছ জানায়, চলতি মৌসুমে তিনি পাঁচ কানি জমিতে তামাক চাষ করেছেন তিনি। তামাক চাষে কষ্ট ও পুঁজি বেশি হলেও লাভ বেশি। বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা আছে। বিক্রিলব্দ সমুদয় টাকা এক সাথে পাওয়া যায়। ছাগলখাইয়া এলাকার কৃষক, সাবেক পৌর কাউন্সিলর মো. শাহজাহান বলেন, এ বছর আমি দুই একর জমিতে তামাক চাষ করেছি। বীজ, সার, কীটনাশক, পাওয়ার টিলার, পাওয়ার পাম্প, নগদ ঋণ প্রদান কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণপ্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদানসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা তামাক কম্পানিগুলো কৃষকদেরকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে করে থাকে। সর্বোপরি উৎপাদিত তামাক কম্পানিগুলো ক্রয় করার নিশ্চয়তা দেয়। এসব কারণে কৃষকেরা চলতি মৌসুমে তামাক চাষ করেন। আবার তামাক প্রক্রিয়াজাত করার সময় লক্ষ লক্ষ টন বনের গাছ পোড়াতে হয়।

লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম বলেন, বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছর তামাকের চাষ কিছুটা কম হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদেরকে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে কিছু কিছু তামাক চাষী এখন সবজি চাষ ও ভুট্টা চাষও করেছেন। তামাক চাষে কৃষকদের অতি উৎসাহের কারণ এবং এর প্রতিকার চিহ্নিত করণের লক্ষ্যে শিগগিরই একটি কর্মশালার আয়োজন করা হবে বলেও জানান তিনি।

তামাকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে নিয়োজিত বেসরকারী সংস্থা উবিনীগ’র কক্সবাজারের আঞ্চলিক সমন্বয়ক রফিকুল হক টিটো বলেন, তামাক চাষের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে খাদ্য ফসলের আবাদি জমি। কারণ তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির অনুজীব নষ্ট হচ্ছে এবং জমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি। ফলে ওই জমিতে শত চেষ্টা করলেও অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছেনা। তামাক গাছ থেকে নিসৃত বিষাক্ত রস নদী খাল বিল ও পুকুরের পানিতে মিশে মাছের প্রজনন হ্রাস পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ চাষে সংশ্লিষ্ট কৃষকরাও আক্রান্ত নানান রোগে। লামা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শফিউর রহমান মজুমদার জানিয়েছেন, তামাক শোধনের সময় নির্গত নিকোটিনের কারণে এলাকার লোকজন হাঁপানি, কাশি এবং ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত