প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জোনাকির মতো আলো ছড়ানো মানুষ ছিলেন পাবনা শহরের আনোয়ারুল হক

অঞ্জন রায় : তিনি আমার পিতার বন্ধু ছিলেন। বন্ধু ছিলেন আমাদের পরিবারের। তখন অন্ধকার সময়-বঙ্গবন্ধুকে খুন করা হয়েছে। সত্তর দশকের শেষ ভাগ। বাপি জেলখানায় বন্দি। মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী-এই অপরাধে মা তার চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত। আমরা একবেলা ভাত আর একবেলা রুটি খেতে পাই। অনটন শব্দটা তখন সবসময়ের সাথী। সেসময়ে আমার পিতার বন্ধু আনোয়ারুল হক ছিলেন পাবনা শহরে আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ। টানটান অনটনে একদিকে আফতাব কাকু তার রেশনের দোকান থেকে বরাদ্দের চেয়ে বেশি চাল আর গম দিয়ে সচল রেখেছিলেন আমাদের পাকস্থলী, অন্যদিকে আনোয়ার কাকু খুব গোপনে অনেকবার সহায়তা করে চাকা সচল রেখেছেন মীরা রায় আর প্রসাদ রায়ের সংসারের।

এমনও হয়েছে-কাটা ঘুড়ির পেছনে যখন দৌড়ে চলেছি আমি, তখন হঠাৎ আমাকে ডেকে ধমক দিলেন-‘এভাবে দৌড়াতে গিয়ে তো গাড়িচাপা পড়বি?’ তারপর কাছে ডাকলেন। পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে আমাকে দিলেন। আমার হাতে তখন যেন মালাকাইটের ঝাঁপি। দু’ রিল সুতা আর কয়েকটা পরিতোষ কাকার বেলবটম সিল দেয়া ঘুড়ি। আহা কী উজ্জ্বল সেসব দিন। আজ (৩০ জানুয়ারি) সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আনোয়ার কাকুর সন্তান ঋতুর মিসড কল ভাসছে মনিটরে। কলব্যাক করলাম। ঋতুর কান্না-‘অঞ্জন, বাবা নেই।’ কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। একজন সফল মানুষের পরিণত বয়সে প্রস্থান। তবু ফোনের দুই প্রান্তে আমাদের দুজনের চোখেই জল-মাঝবয়সী একজোড়া মানুষ কাঁদছি। কাঁদছি আমাদের সেই হেরে যেতে যেতে বেঁচে থাকা সময়ের হাত ধরে।

মনে পড়ে যায়, অন্ধকার সময়ের সেসব কোরবানি ঈদ-যখন একটুকরো মাংস মানে অনেক কিছু, তখন প্রতি ঈদের দিন আমরা অপেক্ষা করতাম কখন আনোয়ার কাকুর ভাগ্নে তালহা ভাই আসবেন-সামনের দরজায় কড়া নাড়বেন। আমাদের রান্নাঘরে মা রাঁধতে বসবেন। ঈদের আনন্দ ছুঁবে আমাদের পাকস্থলি।

সত্যিই আমাদের ভোরবেলা বা শৈশব কৈশর ছিলো এক বিরুদ্ধ ¯্রােতে সাঁতার কাটার সময়। আমরা বড় হয়েছি অনটন আর রাষ্ট্রের নষ্ট হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে। সেসময়ে প্রতিটি শহরে কিছু জোনাকির মতো মানুষ ছিলেন-আলো ছড়ানো মানুষ। তেমনই একজন আমার পাবনা শহরের আনোয়ারুল হক। অনন্তলোকে ভালো থাকুন আনোয়ার কাকু। লেখক : সাংবাদিক। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত