প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সড়কে লাশের মিছিল বন্ধ হবে কবে?

ওয়াসিম ফারুক: ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বাবার সাথে মোটরসাইকেলে চড়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে ট্রাকের ধাক্কায় জীবন দিতে হয়েছে স্থানীয় কসমোপলিটন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী আফরিন ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আফসারকে। গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে আফরিন ও আফসারের বাবা ডালিম। গত ২৫ জানুয়ারি ২০১৯ ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নারায়ণকড়া এলাকায় ইটভাটায় কয়লার ট্রাক উল্টে ১৩ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। যেদিন আফরিন ও আফসার মৃত্যু হয় ওই দিনই ঢাকা বিমানবন্দরের প্রবেশ মুখে ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান নরসিংদী থেকে ঢাকায় বিদেশগামী স্বজনকে বিদায় জানাতে আসা ডালিম ও মোবারক। ডালিম ও মোবারক সম্পর্কে শ্যালক ও ভগ্নিপতি। গত ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর মালিবাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্রী আফসানা ইলিয়াস ইতি। যাত্রাবাড়ি নিজ বাসায় যাওয়ার জন্য তিনি তুরাগ পরিবহন নামের একটি বাসে উঠতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ওঠার আগেই বাসটি চলতে শুরু করলে নিচে পড়ে যান ইতি। বাসচালকের এমন গাফলতিতে একজন মেধাবী ছাত্রীর জীবনের ইতি টানতে হয়। যদিও ইতির মৃত্যুর খবর আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলো তেমনভাবে প্রচার করেনি। আফসানা ইলিয়াস ইতির এমন করুণ মৃত্যুতে তেমন কোনো প্রতিবাদও হয়নি। গত বছর ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় মৃত্যু হয়েছিলো আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম নামের শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর। এই ঘটনার পর সমগ্র দেশ ফুঁসে উঠেছিলো নিরাপদ সড়কের দাবিতে। আমাদের স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া ছোট ছোট বাচ্চারা রাস্তায় নেমেছিলো সহপাঠির মৃত্যুর বিচারের দাবিতে। একপর্যায়ে তারা ট্রাফিক পুলিশের কাছ থেকে সড়ক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। শিক্ষার্থীরা নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে কীভাবে সড়ক নিরাপদ রাখতে হয়। কিন্তু সেটি ছিলো প্রতীকী। সড়ক নিরাপদ রাখা কিংবা দুর্ঘটনা রোধ করা শিক্ষার্থীদের কাজ নয়। এটি করতে হবে সরকারকেই। সড়কে মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিনই লম্বা হচ্ছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সারাদেশে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ২২১ জন যা আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি। আর ২০১৮ সালের প্রথম চার মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে দৈনিক গড়ে ১৮ জন পুরো বছর, অর্থাৎ বাকি আট মাস যোগ করলে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০-এ। নিরাপদ সড়ক চাই-এর তথ্যানুসারে ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে ৫ হাজার ৬৪৫ জনের। সংস্থাটির হিসেবে ২০১৬ সালের চেয়ে দেড় হাজার মৃত্যু বেড়েছে ২০১৭ সালে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সরকার সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করে চালকদের শাস্তির মাত্রা বাড়ালেও সেটি কতোটা কার্যকর হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ আইনটি সংসদে পাস করার পরই পরিবহন শ্রমিকরা আন্দোলনে রাস্তায় নামেন এবং এই আইন পাসের পর দুর্ঘটনার মাত্রা আরো বেড়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। দুর্ঘটনা রোধে প্রধানমন্ত্রী পরিবহনের দূরপাল্লার চালকদের জন্য কর্মঘণ্টা বেঁধে দিয়েছিলেন যা কোনোভাবেই এখন পর্যন্তও মানা হচ্ছে না। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি সড়ক দুর্ঘটনার দুর্ঘটনা ঘটে। যা নেহায়েতই দুর্ঘটনা, তবে আমাদের দেশে সড়কে যা ঘটে ওই গুলোর কতোটা যে দুর্ঘটনা সেটাই একটা প্রশ্ন। আমাদের দেশের সড়কে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো হলো চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালনা, চালকদের ওপর বাড়তি চাপ ও পথচারীদের অসচেতনতা ছাড়া ও ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও সেতুর সময়মতো মেরামত না হওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন এবং চালকদের অদক্ষতা। লেখক : ওয়াসিম ফারুক, কলামিস্ট

সর্বাধিক পঠিত