প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চার অফিসারের দৃঢ় প্রত্যয়, নারীরাও একদিন সেনাপ্রধান হবেন

সালেহ্ বিপ্লব : চলতি বছর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মোট ১০ জন নারী অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন। গত ২৪ জানুয়ারি তাদের ৪ জনকে র‌্যাংক ব্যাজ পরিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। র‌্যাংক পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন বাকি ৬ কর্মকর্তা। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য এ কৃতিত্বের স্বাক্ষর যারা রাখলেন, এই পদোন্নতি তাদের নতুন মাত্রায় আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তুলেছে। দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তারা বলেছেন, ফাইটিং ফোর্সের নারী অফিসারদের মধ্য থেকেই বাংলাদেশ অর্জন করবে প্রথম নারী সেনাপ্রধান। সময় লাগবে, কিন্তু অসম্ভব নয়। সূত্র : বাসস বাংলা।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার সাথে এই চার কর্মকর্তা কথা বলেন গত সকালে, আর্মি হেডকোয়ার্টারের অফিসার্স মেসে। তারা কর্মজীবনের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাতকারে তারা বলেন, বাংলাদেশের নারীরা সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন, সেদিন খুব দূরে নয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফাইটিং ফোর্সে প্রথমবারের মতো লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভ করা চারজন নারী কর্মকর্তা হলেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সানজিদা হোসেন পিএসসি, অধিনায়ক, ৭ ফিল্ড রেজিমেন্ট, আর্টিলারি, ৬৬ পদাতিক বাহিনী, রংপুর সেনানিবাস, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দা নাজিয়া রায়হান, আর্টিলারি; পিএসসি, অধিনায়ক, বরিশাল সেনানিবাস, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারহানা আফরীন, অধিনায়ক, আর্টিলারি, আর্মি এভিয়েশন গ্রুপ, ঢাকা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারাহ্ আমির, প্রশিক্ষক, স্কুল অব ইনফেনট্রি এ্যান্ড ট্যাকটিস, সিলেট সেনানিবাস।

এ পদোন্নতির মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে, এ কথা উল্লেখ করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সানজিদা হোসেন বলেন, “আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি আমাদেরই মধ্যে কেউ একজন সেনাপ্রধান হবেন। সেটা আগামী ১০, ১৫ বা ২০ বছরে হতে পারে। তবে সেদিন খুব দূরে নয়।”
সানজিদা বলেন, আমরা যখন সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছি তখন আমাদের সামনে কোন রোল মডেল ছিলো না। আমাদের শুধু স্বপ্ন ছিলো। সেই স্বপ্নকে পূর্ণ করার জন্য প্রতিটি ধাপ নিষ্ঠার সাথে পুরুষদের সাথে সমানভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই পার হয়ে এসেছি।

সেনাবাহিনীতে নারী নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অধিনায়ক সানজিদা বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কারণেই আজ আমরা এ পর্যায়ে আসতে পেরেছি।’ এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান । বলেন, ‘এখানে আসার আগে কখনো ভাবিইনি যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল-এর র‌্যাঙ্ক পাবো। কিন্তু এখন মনে হয় আমরা নারীরা সেনাপ্রধানও হতে পারি। এমনকি কোনদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও হতে পারি।’

ফারহানা আফরীন বলেন, ‘যখন প্রথম যোগ দিয়েছি, তখন এত কিছু ভাবিনি। কিন্তু এখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হয়েছি। এখন আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। আমরা চেষ্টা করলে আরো অনেক দূর যেতে পারবো।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই পদোন্নতির মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো। এখন সবাই দেখবে মেয়েরা সব পারে এবং পারবে। তাই সেনাবাহিনীতে মেয়েদের পিছিয়ে থাকার কোন কারণ নেই। আমি যেদিন থেকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছি সেদিন থেকেই একজন মানুষ হিসেবে কাজ করেছি। এখানে প্রত্যেকের প্রতিদিনের কর্মদক্ষতা দিয়ে পদোন্নতি হয়।

সারাহ্ আমির বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এই পদে আসার জন্য আমাদের নারী হিসেবে আলাদা করে দেখা হয়নি। অফিসার হিসেবে আমাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও সক্ষমতা বিবেচনা করে আমাদের পদোন্নতি হয়েছে।’
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারীর এই অগ্রযাত্রা আগামী প্রজন্মের নারীদের জন্য আশার বার্তা বয়ে আনবে বলেই বিশ্বাস করেন এই অধিনায়করা। অধিনায়ক সানজিদা মনে করেন, সেনাবাহিনীতে যোগদান মেয়েদের জন্য বেস্ট চয়েজ হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ঘরে বাইরে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছি। এখানকার পরিবেশও মেয়েদের জন্য অনেক ভালো। এই পেশায় এসেছি বলেই আমাদের সক্ষমতা ও শক্তিকে প্রমাণ করতে পেরেছি। আমাদের মধ্যে একটাই প্রত্যয় ছিলো আমাদের এগুতে হবে। আমাদের ব্যর্থ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। আমাদের সেভাবেই ট্রেনিং দেয়া হয়েছে।’

সানজিদা বলেন, “নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলবো, ‘এখানে স্বপ্নের সীমানা আকাশ। তোমরা এগিয়ে এসো। তোমাদের জন্য পথ সুগম করেছি।”
সারাহ আমির বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে যারা কাজ করতে আসেন তাদের জন্য অবশ্যই এটি চ্যালেঞ্জিং পেশা। এই চ্যালেঞ্জ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান। এখানে মেয়েদের জন্য আলাদা কোন চ্যালেঞ্জ নেই। মেয়েরা নিজেদের নিষ্ঠা এবং আত্মমর্যাদার ব্যাপারে সবসময় যতœশীল। এসব গুণাবলী থেকেই তারা নিজেদের যোগ্যতায় নিজেদের পথ করে নেয়।

২০০০ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য ৩০,০০০ আবেদনপত্র জমা পড়ে। তাদের মধ্যে থেকে ৩০ জন নির্বাচিত হন। দুই বছর বিএমএ ট্রেনিং নেয়ার পর ৪৭ ব্যাচের ৩০ জনের মধ্যে থেকে ২০ জন অফিসার হিসেবে কমিশন পান। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে থেকে মোট ১৩ জন সেনাবাহিনীতে টিকে থাকেন। অধিনায়ক সানজিদা হোসেন এবং অধিনায়ক সৈয়দা নাজিয়া রায়হান ২০০১ সালের ৩ জানুয়ারি ৪৭ বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্সে যোগদান করেন এবং ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর কমিশন লাভ করেন।
অধিনায়ক ফারাহানা আফরীন এবং অধিনায়ক সারাহ্ আমির ২০০১ সালের ৪ জুলাই ৪৮ বিএমএ দীর্ঘমেয়াদী কোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ৪৮ তম ব্যাচে ৩০ জন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাদের মধ্যে থেকে ২১ জন ২০০৩ সালের ২ জুলাই কমিশন পান।

২০০০ সালে সর্বপ্রথম সেনা ক্যাডেট হিসেবে নারীরা যোগদান করেন। তবে স্বাধীনতার পর থেকে নারীরা সেনা চিকিৎসা শাখায় চিকিৎসক হিসেবে যোগ দিতে পারতেন। ২০১৩ সালে প্রথম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারী সৈনিক নিয়োগ দেয়া হয়। এবছরই প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনীর ফাইটিং ফোর্সে চারজন নারী লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পান।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এই চার জনকে গত ২৪ জানুয়ারি তাদের লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবীর র‌্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেন। এবছর মোট ১০ জন মেয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন। তাদের মধ্যে থেকে চারজনকে র‌্যাংক পরানো হয়েছে। বাকি ৬ জনকে শিগগিরই র‌্যাংক পরানো হবে।

সর্বাধিক পঠিত