প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পাকিস্তান-চীন প্রেমের পরিণতি কী?

আলতাফ পারভেজ : মান্দারিন শেখার ধুম : প্রায় ২০ মাস হলো চীনা ভাষায় পুরোদস্তুর একটি সাপ্তাহিক কাগজ বের হচ্ছে পাকিস্তান থেকে। নাম ‘হুয়াসাং’। চীনা ভাষায় ‘হুয়াসাং’ অর্থ ‘ফুলের ব্যবসা’। তবে ব্যবহারিক অর্থ হলো ব্যবসায়ে বিশুদ্ধতা। পাঁচ হাজার কপি দিয়ে শুরু হয় ‘হুয়াসাং’-এর ছাপা। উদ্যোক্তাদের ধারণা, এই সংখ্যা ১০ গুণ বাড়বে।

এই আশাবাদে বেশি কল্পনাবিলাস নেই। কাগজটি বের হচ্ছে পাকিস্তানে বসবাসকারী চীনাদের জন্য। কাজের সূত্রে আসা এরূপ মানুষের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। নানান পেশায় চীনের অন্তত ৫০-৬০ হাজার নাগরিক রয়েছেন এখন পাকিস্তানের শহরগুলোতে। সংখ্যায় এটা সামান্য। কিন্তু অর্থনৈতিক বিবেচনায় এর গুরুত্ব অনেক।

দেশটির অধিকাংশ ব্যাংকে চীনা গ্রাহকদের দেখাশোনার জন্য চীনাভাষী কর্মী রয়েছে এখন। অনেক ব্যাংক তাদের অন্তত কিছু শাখার সাইনবোর্ডে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি চীনের প্রধান ভাষা মান্দারিনেও রেখেছে। ইসলামাবাদে, অনেক স্কুলে শিশু শ্রেণিতেই চীনা শিশুদের দেখা মেলে এখন। রেস্টুরেন্টের ক্ষেত্রে অবশ্য চীনারাই অনেকে ব্যবসা খুলে বসেছেন। স্থানীয় যাঁরা চীনা খাবারের দোকান দিয়েছেন, তাঁরাও গ্রাহক আকর্ষণ করতে ২-৪ জন কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন চীনাভাষী। পাকিস্তানজুড়ে চীনা ভাষা শেখারও ধুম পড়েছে ইতিমধ্যে। কয়েক দশক আগে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে যখন মান্দারিন কোর্স চালু হয়, তখন প্রথম বছর ১৩ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। এখন দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ রয়েছে। মান্দারিন জানলে ভালো মজুরিতে কাজ জুটবে, অনেক পাকিস্তানি তরুণ-তরুণীরই এটা বিশ্বাস। কেউ কেউ চীনে যেতে চাইছেন বৃত্তির সুবিধা নিয়ে।

স্বল্প সংখ্যায় হান পুরুষ পাকিস্তানে বিয়ে করতেও শুরু করেছেন। গিলগিট-বালতিস্থান অঞ্চলের সঙ্গে চীনের উইঘুরদের বিয়ের যে ঐতিহ্য ছিল, নতুন বিয়েশাদি তার অতিরিক্ত। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের দুই কর্মীর মধ্যে এইরূপ প্রথম বিয়ের খবর গত বছর ভাইরাল হলেও এখন তা করিডরের বাইরেও ঘটছে। চীন ও পাকিস্তানের তরুণ-তরুণীর মাঝে প্রেমকে উপজীব্য করে ইতিমধ্যে সিনেমাও (চলে থা সাথ) তৈরি হয়েছে।

জাতীয় পতাকাও চীন থেকে তৈরি হয়ে আসছে : পাকিস্তানে চীনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এত বাড়বাড়ন্ত প্রধানত উভয় দেশের অর্থনৈতিক করিডরের সূত্রে। তবে চীনের পাকিস্তান অভিযান কেবল ওই করিডরে থেমে নেই। দেশটির সর্বত্র কীভাবে চীনা পণ্যের ঢল নেমেছে, ইসলামাবাদের যেকোনো সুপার শপের তাকগুলো তার সাক্ষী। খুশি বিক্রেতারাও। চীনের সঙ্গে ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’র কারণেই তাদের ব্যবসায়ের এত প্রসার ঘটল।

এ বছর এক যুগ পূর্তি হচ্ছে উভয় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির। এর দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে আলোচনার মধ্যেই দেখা গেল পাকিস্তানের শিল্প উদ্যোক্তারা চুক্তির শর্ত নিয়ে খুশি নন। তাতে চুক্তির নবায়ন থামানো যাবে বলে মনে হয় না। কারণ চীন সরাসরি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে বশ করেই ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করছে। বিশ্বের অন্যত্রও এটাই তাদের কৌশল।

চীনের কূটনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ভূ-রাজনীতিতে তারা পাকিস্তানকে যতটুকু সহায়তা দিচ্ছে, সেটাই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণের জন্য যথেষ্ট। উভয় দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সম্পর্ক গড়া এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ব্যাপারে তাঁদের আগ্রহ কম। তার পরও পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো মূল্যে চীনকে পাশে রাখতে ইচ্ছুক। উন্নত প্রযুক্তির বিপুল সমর রসদ কিনছে তারা চীন থেকে। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ০৫৪এপি টাইপ চারটি যুদ্ধজাহাজ ও ৪৮টি ড্রোন। এ ছাড়া হয়েছে যৌথভাবে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান তৈরির চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস সিস্টেমের বিকল্প হিসেবে চীন যে স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম গড়ে তুলেছে, পাকিস্তান ইতিমধ্যে তার অংশীদার হয়েছে। চীনের অস্ত্র ব্যবসায়ের প্রায় ৪০ ভাগ সরবরাহ এখন পাকিস্তানমুখী।

সবচেয়ে উপাদেয় দিক হলো, সামরিক-বেসামরিক সব পণ্যে চীনের তরফ থেকে কোনো রাজনৈতিক শর্ত নেই। গ্রহীতা দেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও চীন মনোযোগী হতে চায় না। পাকিস্তানে ‘চীন বিপ্লব’কে জায়গা করে দিতে তাই দেশটির সামরিক কর্মকর্তা ও শাসক এলিটদের কোনো আপত্তি নেই।

আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর নাগাদ দুদেশের পণ্য বাণিজ্যের আকার ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। অথচ ২০০৩-এ এটা ছিল মাত্র এক বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবের বাইরে রয়েছে উভয় দেশের অর্থনৈতিক করিডর। যেখানে বিনিয়োগ ইতিমধ্যে ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৫০-৬০ বিলিয়ন ডলার পৌঁছাবে তা। এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সমগ্র অবকাঠামো এ মুহূর্তে চীনমুখী হয়ে পড়েছে। গদার বন্দরের আশপাশে জমির দাম বেড়েছে এক দশকে অন্তত ১০ গুণ। ইমরান খানের দল ক্ষমতায় আসার আগে ‘অর্থনৈতিক করিডরে’র সব চুক্তি খতিয়ে দেখবে বলেছিল। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ইমরান বুঝতে পারছেন, এ কাজের জন্য যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। চীনের ওপর পাকিস্তানের নির্ভরতা এখন বিপুল।

কিন্তু দেশটির অনেককে শিল্প খাতের উৎপাদন সামর্থ্য অর্ধেক কমাতে হয়েছে চীনের পণ্যের সঙ্গে বাজারে পরাজিত হয়ে। ‘মেড ইন চীন’ মানেই দাম কম। একই ধরনের পণ্যে উভয় দেশে উৎপাদন খরচে তারতম্য প্রায় ২০ ভাগ। ফলে অবধারিতভাবে পাকিস্তানের অনেক শিল্পে প্রায় বন্ধ্যাবস্থা।

যদিও পাকিস্তানে চীনের রপ্তানি প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার (২০১৮-এর হিসাব)। কিন্তু পাকিস্তান থেকে রপ্তানির অঙ্ক দুই বিলিয়ন ডলারও ছাড়ায়নি। চীন থেকে আমদানি পণ্যের তালিকা এত বাড়ছে যে, পাকিস্তানের পতাকাও এখন তৈরি হয়ে আসছে চীন থেকে। অনেক উৎপাদকই এ পরিস্থিতিতে হতাশ।

আরেকটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আছে বালুচদের তরফ থেকে। অর্থনৈতিক করিডরটি বাস্তবায়ন হচ্ছে প্রধানত তাদের এলাকাজুড়ে। বালুচদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কোনো ফয়সালা হওয়ার আগেই তাদের অঞ্চলজুড়ে চীনের দাপটে তারা অসন্তুষ্ট। এই অসন্তোষ সামাল দিতে রাজনৈতিক পথে না গিয়ে সরকার এগোচ্ছে সামরিক পথে। করিডরের মূল অঞ্চলের নিরাপত্তায় প্রায় ৮০০ সাবেক সেনা ও পুলিশকর্মীর এক বিশাল নিরাপত্তা দল গড়ে তোলা হয়েছে। এর বাইরে কেন্দ্রীয়ভাবে ১৩ হাজার সৈনিকের আরেকটি বাহিনী থাকবে প্রায় একই কাজে। বালুচরা মনে করছে, এ রকম সব পদক্ষেপই তাদের ভূমিতে তাদের আরও কোণঠাসা করবে মাত্র। ইতিমধ্যে গত নভেম্বরে করাচিতে চীনের কনস্যুলেটে বড় ধরনের হামলা হয়েছে। এর পেছনে বালুচ লিবারেশন আর্মির হাত ছিল বলে মনে করা হয়।

ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে কী ঘটবে?
পাকিস্তানে চীন বিপ্লবের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যও অনেক। কমিউনিস্ট চীনকে মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান প্রথম স্বীকৃতি দিলেও ক্রমে যুক্তরাষ্ট্রই হয়ে পড়ে ইসলামাবাদের প্রধান মিত্র। কিন্তু পাকিস্তানের চীনমুখী মোড় পরিবর্তন এখন এতটাই যে, এ বছর দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা চীনা মুদ্রাকেও বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছে। অর্থাৎ ডলারকে আড়াল করে এখন থেকে ইউয়ান ও রুপিও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সরাসরি বিনিময় হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এরূপ সিদ্ধান্ত হতাশাজনক। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, পাকিস্তানকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বেশি ঝুঁকি নিতে হয়নি। কারণ চীন থেকে তার আমদানি যখন প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সমমানের, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তা মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো পাকিস্তানি পণ্যের সর্ববৃহৎ রপ্তানিস্থল হলেও চীন ইতিমধ্যে দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও মনঃকষ্টের কারণ হলো বালুচিস্তানে চীনের সামরিক ঘাঁটি গড়ারও খবর দিয়েছে তাদের সংবাদপত্র। সত্য হলে, জিবুতির বাইরে এটা হবে চীনের বহিঃদেশীয় দ্বিতীয় সামরিক স্থাপনা। এটা এ-ও প্রমাণ করে, চীনের পাকিস্তান অভিযানে অর্থনীতির পাশাপাশি সামরিক বিবেচনাও অবিচ্ছেদ অংশ। তবে চীন-পাকিস্তান উভয়ে বালুচিস্তানের জিওয়ানিতে সামরিক স্থাপনার কথা অস্বীকার করছে।

সামরিক ঘাঁটি হোক বা না হোক, চীনের বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষের একেবারে কেন্দ্রে এখন পাকিস্তান। যেকোন অবস্থায় দেশটিকে পাশে রাখতে ইচ্ছুক তারা। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দিতে বিপদের বন্ধু হিসেবে সম্প্রতি এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে তারা। তবে সর্বশেষ এই ১ বিলিয়নসহ চীনের কাছে কেবল সর্বশেষ অর্থবছরেই পাকিস্তানের ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলার। মোট ঋণের অঙ্ক আরও প্রায় চারগুণ বড়। এসব ঋণ পাকিস্তান কীভাবে শোধ করবে, এ নিয়ে দেশটিতে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। চীনের বাইরেও দেশটিকে বিপুল বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে হবে। সর্বমোট প্রায় এক শ বিলিয়ন ডলার বিদেশি দেনার মুখে দেশটি। এর মধ্যেই অর্থনৈতিক করিডরের জন্য নেওয়া চীনের ঋণ ২০২২ থেকে ফেরত দিতে হবে। বছরে অন্তত ২-৩ বিলিয়ন করে দিতে হবে ২৫ বছর ধরে। এইরূপ দেওয়ায় কোনো ক্লান্তি এলে অবকাঠামোগুলোর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কমে চীনের নিয়ন্ত্রণ যে বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। যেমনটি ঘটেছে শ্রীলঙ্কার হামবানটোটা বন্দরের ক্ষেত্রে। চীনের সহায়তায় নির্মিত হয়েছিল ওই বন্দর। ঋণের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে শ্রীলঙ্কা এখন বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিয়ে দিয়েছে চীনের কাছেই। প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তানে চীনের বড় বড় প্রকল্পগুলোর পরিণতিও কি সে রকম হবে?

পাকিস্তান ও চীন পরস্পরকে ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে সেরা বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু কার্যত যা হচ্ছে, পাকিস্তান ক্রমে অর্থনৈতিকভাবে চীনের একটি বৃহৎ বাজার এবং সামরিক দিক থেকেও চীনের সদয় সহায়তার ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

আলতাফ পারভেজ: গবেষক
সূত্র : প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত