প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নেপথ্যে চাঁদাবাজি বাণিজ্য

কালের কন্ঠ : সিটি করপোরেশন রিকশার লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ রাখলেও তিন সংগঠনের স্টিকার লাগিয়ে রাজধানীর সড়ক দাপিয়ে বেড়ায় রিকশাচালকরা। ব্যস্ততম সড়কেও তারা পুলিশের দিক থেকে কোনো বাধা পায় না। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী একটি সংগঠনের ব্যানারে নিয়ন্ত্রণ করা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশা। রিকশাচালকদের ঘাম ঝরানো টাকার বড় একটি অংশ প্রতিদিন চলে যায় সিন্ডিকেট সদস্যদের পকেটে। পুলিশের চোখের সামনে ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ থাকলেও অদৃশ্য কারণে তা বন্ধ করা হয় না।

বেশ কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেডালচালিত রিকশার জন্য প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দিতে হয় গ্যারেজ মালিককে। এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত প্রতিটি রিকশার জন্য দিতে হয় দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। পেডালচালিত প্রতিটি রিকশা দিয়ে গড়ে দৈনিক আয় করা যায় ৫০০ টাকার মতো। আর ব্যাটারিচালিত রিকশা দিয়ে আয় হয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। কয়েকটি এলাকায় গ্যারেজ মালিকরা চালকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। বিনিময়ে প্রতিদিন গড়ে আরো ১৫০ টাকা কেটে নেওয়া হয়। থাকা-খাওয়া এবং গ্যারেজ মালিকদের ভাড়া দেওয়ার পর সামান্য টাকাই হাতে থাকে চালকদের। এ ছাড়া গ্যারেজ মালিকরা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে খুশি রাখেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের।

উত্তরার হাউসবিল্ডিং এলাকার রিকশাচালক আব্দুস সবুর বলেন, ‘পুরাতন এই রিশকার (রিকশা) দাম ছয় হাজার টেকা। দুই মাসের আমদানি (ভাড়া) দিয়া একটি রিশকা কিনা যায়। সাত বছর ধইরা রিশকা চালাই, কিন্তু নিজের একটা কিনতে পারলাম না।’

একাধিক গ্যারেজ মালিক জানান, নিজস্ব জমি না থাকায় সড়কের পাশে বা সরকারি জমিতে গ্যারেজ গড়ে তোলায় প্রতি মাসে মাসোয়ারা দিতে হয় সরকারি দলের লোকদের। মাসোয়ারা না দিলে গ্যারেজ সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পুলিশ ডেকে রেকার লাগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় রিকশা। এ ছাড়া সড়কে রিকশা চালানোর জন্য তিনটি সংস্থার স্টিকার নিতে হয়। প্রতি তিন মাস পর নবায়ন করতে হয় ওই সব স্টিকার। স্টিকারের মূল্য ২০ টাকা লেখা থাকলেও তিন মাস পর পর গাড়িপ্রতি দিতে হয় ২০০ টাকা। বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, জাতীয় রিকশা ভ্যান শ্রমিক লীগ এবং রিকশা ভ্যান মালিক লীগ ওই সব টাকা নিয়ে থাকে। অনেক এলাকায় ওই তিন সংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীরাই গড়ে তুলেছে গ্যারেজ। প্যাডেলচালিত রিকশার পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশাও নিয়ন্ত্রণ করে তারা।

এ বিষয়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকার গ্যারেজ মালিক শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি এলাকায় লাইনম্যান থাকে। প্রতি মাসে তাদের চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে সড়কে গাড়ি উঠলেই রেকার লাগিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। সমিতির স্টিকার নিতে হয় তিন মাস পর পর।

রিকশায় ব্যবহৃত স্টিকারে লেখা থাকে ‘সিটি করপোরেশনে আবেদনকৃত’। আবেদন নম্বরও উল্লেখ থাকে স্টিকারে। কিন্তু রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার কোনো আবেদন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গ্রহণ করে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী সরদার বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে রিকশার কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয় না। রিকশার জন্য কোনো আবেদনও নেওয়া হয় না। এসব ভুয়া স্টিকার।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি জমি ও সড়ক দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক গ্যারেজ। গ্যারেজের পাশেই রাস্তা দখল করে বানানো হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগ ও রিকশা ভ্যান মালিক লীগের অফিস। ঢাকার প্রতিটি থানায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা রিকশার গ্যারেজ থেকে মাসে মাসে চাঁদা নেয়। রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় এসব সংগঠনের অফিস বেশি দেখা গেছে। তেজগাঁও এলাকার প্রতিটি রিকশায় দেখা গেছে তিনটি করে স্টিকার। একটি হলো বাংলাদেশ রিকশা ভ্যান মালিক ফেডারেশনের। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলীকে টাকা দিয়ে ওই স্টিকার নিতে হয় বলে জানান কয়েকজন রিকশাচালক ও মালিক। অন্য দুটি স্টিকার হলো রিকশা ভ্যান মালিক লীগ ও রিকশা ভ্যান শ্রমিক লীগের। ওই দুটি সংগঠন ‘সিটি করপোরেশনে আবেদকৃত’ নামে স্টিকার বিক্রি করে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা পায় ওই স্টিকারের টাকা।

এ ছাড়া তেজগাঁও এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার বাণিজ্য এখন রমরমা। রাস্তা দখল করে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সরাসরি সংযোগ নামিয়ে চার্জ দেওয়া হয় ওই সব ব্যাটারি। অভিযোগ আছে, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার তালুকদার সরওয়ার হোসেন। তাঁর সহযোগী হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করেন বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের শিল্পাঞ্চল থানার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এ বিষয়ে তালুকদার সরওয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ প্রায়ই ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক করে। তাই আমরা নেতাকর্মীদের নিয়ে একটা সমঝোতায় এসেছি। মূল সড়কে না গিয়ে চালকরা যেন এলাকায় থাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।’ তবে রিকশার গ্যারেজ মালিকদের কাছ থেকে মাসোয়ারা নেওয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

আবদুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার নিজের রিকশা আছে। ঢাকার সব গ্যারেজ তো রাস্তার জমি দখল করেই করা। আমি করলে সমস্যা হয় কেন?’ নিয়মিত টাকা ওঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সমষ্টিগত স্বার্থে অর্থ নেওয়া হয়। এই অর্থের ভাগ সবাই পায়। এ ছাড়া রিকশা যখন আটকায় তখন তো টাকা দিয়েই ছাড়াতে হয়। মূলত গ্যারেজ মালিকদের নিরাপত্তার জন্যই টাকা নেওয়া হয়।’

অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেঙে না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন ‘আমরা ব্যস্ততম সড়ক সামলাতেই ব্যস্ত থাকি। নির্দিষ্ট এলাকার গ্যারেজে গিয়ে রিকশা মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এ কাজ সিটি করপোরেশনের। তবে সিটি করপোরেশন আমাদের কোনো সহযোগিতা চাইলে দেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ রিকশা মালিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত