প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টাকা পাচারের ৫ কারণ

যুগান্তর : বাংলাদেশ থেকে পাঁচ কারণে টাকা পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে বেপরোয়া দুর্নীতি দেশে বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি, আইনের শাসনের ঘাটতি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় টাকা পাচারের ক্ষেত্রে মোটা দাগে এসব কারণ উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পরপর ৩টি সংস্থার রিপোর্টেই বাংলাদেশ থেকে ভয়াবহ আকারে টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে আছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই), সুইস ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের পানামা ও প্যারাডাইস পেপার। দফায় দফায় রিপোর্ট প্রকাশ হলেও পাচার বন্ধে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ জিএফআই ২৮ জানুয়ারি যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতেও টাকা পাচারের চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য (আমদানি-রফতানি) হয়েছে, তার প্রায় ১৭ শতাংশই বিদেশে পাচার হয়েছে। গত দশ বছরে দেশ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাচার হয়েছে। যা চলতি (২০১৮-২০১৯) জাতীয় বাজেটের প্রায় দেড়গুণের কাছাকাছি এবং দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির তিনগুণেরও বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, তথ্যটি নতুন নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। তাদের মতে, টাকা পাচার রোধে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। তবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে টাকা পাচার রোধে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে টাকা পাচারের এক ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। আমদানির নামে এলসি বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। প্রভাবশালী মহল পণ্য জাহাজিকরণের কাগজ জাল করে এলসিকৃত পণ্যের পুরো টাকাই তুলে নিয়ে বিদেশে রেখে দিচ্ছেন। এ ধরনের বেশ কিছু কেস স্টাডি পাওয়া গেছে। এগুলো পর্যালোচনার পর পাচার বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলেই টাকা পাচার হচ্ছে তা নয়। মূলত দুর্নীতি হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে কিন্তু বিচার হচ্ছে না এ কারণেই টাকা পাচার বাড়ছে। দুর্নীতিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দৃষ্টান্ত নেই। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগতভাবে দুর্বল হচ্ছে। আইনের শাসনের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু লোক বিদেশে টাকা নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা পাচার হতে পারে। এছাড়া বিনিয়োগে মন্দা কারণে ব্যবসায়ীদের টাকা বিদেশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, কারণ যাই হোক, টাকা পাচার হওয়া দেশের জন্য সুখবর নয়। তার মতে, সরকারের দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। টাকা ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের কঠোর শান্তি নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে একযোগে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে পাচার রোধে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দুইভাবে টাকা বিদেশে পাচার হয়। এর মধ্যে অন্যতম হল কাস্টমসে ভুল তথ্য দিয়ে আমদানি-রফতানির প্রকৃত দাম গোপন করে। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে কিছু টাকা যায়। সেটির পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক কাজ করছে বলে জানান তিনি।

সোমবার প্রকাশিত জিএফআইর রিপোর্টে বলা হয়, শুধু ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর ১০ বছরে পাচার হয়েছে ৬ হাজার ৩শ’ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় যা ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের জুনে প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪ হাজার ১শ’ কোটি টাকা। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) পানামা এবং প্যারাডাইস পেপার্সে এ পর্যন্ত অর্থ পাচারকারী হিসেবে ৮২ জন ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ করেছে। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়নি বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, অর্থ পাচার সংক্রান্ত যে তথ্য প্রকাশ করেছে জিএফআই তা যাচাই করে দেখব। সাধারণত আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। তবে গোটা পৃথিবীতে বিশ্ববাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ বিষয়ে এখন সবাই সতর্ক। তিনি বলেন, টাকা পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন রয়েছে, আমরা তা পুরোপুরি মেনে চলছি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আমদানির নামে এলসি খুলে বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। এছাড়া রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানি মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। সম্প্রতি টাকা পাচারের আরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিটেন্স। একটি চক্র বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় এর দায় শোধ করা হয়। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। ওইগুলোও পাচার হয়ে বিদেশের কোনো ব্যাংকে রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, টাকা পাচারের প্রথম কারণ হল বাংলাদেশে অর্থ উপার্জন সহজ। দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ উপায়ে খুব দ্রুতই এখানে সম্পদ বানানো যায়। আর যারা এভাবে অর্থ উপার্জন করে, তারা বড় অংশই বাইরে নিয়ে যায়। তাদের ছেলেমেয়েরা দেশের বাইরে পড়াশোনা করে। সেখানে সম্পদ গড়লে তা নিরাপদ। দ্বিতীয়ত, দেশের যে অবস্থা, তাতে নানা ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারেন। তৃতীয়ত, কারা পাচার করছে, তা জানা সত্যেও কোনো অ্যাকশন নেয়া হচ্ছে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তেমন কোনো তৎপরতা নেই। চতুর্থ হল আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। এলসি খোলার পর ঠিকমতো জিনিসপত্র আসছে কিনা, সঠিক দামে খোলা হয়েছিল কিনা, তার নজরদারি নেই। পঞ্চমত, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, এমন বড় কোনো উদাহরণ নেই। এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হলে টাকা পাচার বন্ধের সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, শুধু কথার কথা নয়, বাস্তবেই সরকারের পক্ষ থেকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

সূত্র জানায়, দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে তথ্যের আদান-প্রদান করতে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ১৫৯টি দেশ ওই গ্রুপের সদস্য। বাংলাদেশ এই গ্রুপের সদস্য হওয়ায় এখন সবগুলো দেশ থেকে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বা টাকা পাচার বিষয়ক যে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

এদিকে টাকা পাচার রোধে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- বিদেশে অর্থ পাচার ও সম্পদ গচ্ছিত রাখা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে অপরাধ দমনে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, পাচার রোধ ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব সংস্থা এগমন্ট গ্রুপের সদস্য। আরও ১৫৯টি দেশ এই গ্রুপে রয়েছে। এদের মাধ্যমে তথ্য বিনিময় হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত