প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অত্যাধুনিকখাদ্য গুদাম মংলা সাইলো নির্মাণের তিন বছরেও হয়নি সড়ক পথে খাদ্য সরবরাহ

এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির: দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তমদক্ষিণাঞ্চলেরখাদ্য গুদাম মংলা সাইলো থেকেনির্মাণের তিন বছরেও শুরু হয়নি সড়ক পথে খাদ্য সরবরাহ মংলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনির ঘোল এলাকায়। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দের এ মেগা প্রকল্পের গুদাম থেকে জয়মনি পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা। এছাড়া মংলা নদীতে নেই কোন ব্রিজ। ফলে গুদাম থেকে সড়ক পথে খাদ্য পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় এর সুফল ভোগ করতে পারছে না দক্ষিণাঞ্চলবাসী। এছাড়া খাদ্য গুদামে কারিগরি ত্রুটি, জেটি সংলগ্ন এলাকা ভরাট হওয়াসহ নৌ-পথ ও সড়ক পথে মালামাল খালাস-বোঝাইয়ের ৪টি পয়েন্টের দুটি’ই বন্ধ। সাইলোর এ সকল সমস্যা সমাধান, দ্রুত ভারী যানবাহন চলার উপযোগী সড়ক ও মংলা নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণের দাবি দক্ষিণাঞ্চলবাসীর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আপদকালীন দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রায় সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে মংলা উপজেলার জয়মনিতে ৫০ হাজার মেট্রিকটন খাদ্য শস্য ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন অত্যাধুনিক এ সাইলোটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে ১৩ নবেম্বর। কাজ শেষে বিগত ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। এ সময় লাইটার যোগে পরীক্ষামূলকভাবে ৪০৬ মেট্রিক টন খাদ্য পণ্য গম গুদামজাত করা হয়। এ সাইলোর জন্য সরকারিভাবে বিগত ২০১৭ সালের ৯ মার্চ রাশিয়া থেকে আসা গম নিয়ে এমভি ‘নর্ডলেক্স’ নামের পানামার পতাকাবাহী জাহাজটি বন্দরের পশুর চ্যানেলের হারবাড়িয়া বহিঃনোঙ্গরে অবস্থান করে। প্রথমবারের মতো আসা গমবাহী জাহাজটি নাব্যতা সমস্যার কারণে সাইলোর জেটিতে তখনই ভিড়তে পারেনি। ফলে ম্যাদার ভ্যাসেল থেকে ছোট লাইটার যোগে খালাসের পর সাইলো জেটিতে লোডিং কাজ শুরু করে কর্তৃপক্ষ। গম লোডিং শুরু হলেও ধীরগতি নিয়ে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে সাইলো সংশ্লিষ্টরা। সাইলো জেটির দু’টি লোড পয়েন্টের একটি অচল হয়ে আছে। অপরটি চললেও কিছুক্ষণ পর পর বন্ধ হয়ে থাকছে। দক্ষ জনবল না থাকায় এ অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

মংলা জয়মনির ঘোল সাইলো সহকারী রক্ষণ কৌশলী আমিনুল ইসলাম জানান, খাদ্য গুদামটি শুরু হয়েছে প্রায় ৩ বছর কিন্তু সম্পূর্ণভাবে এর সুফল ভোগ করতে পারছে না দক্ষিণাঞ্চলবাসী। এখানে বেশ কয়েকটি কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। এছাড়াও জয়মনি থেকে মংলা পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে কয়েক বছর ধরে। পাশাপাশি সাইলো থেকে সড়ক পথে মালামাল আনা-নেয়ার জন্য মংলা নদীতে ব্রিজ না থাকায় কাঙ্খিত সেবা দিতে পারছেনা কর্তৃপক্ষ।

চিলা ইউপি চেয়ারম্যান গাজী আকবার হোসেন জানান, মংলায় নির্মিত খাদ্যশষ্য মজুদ রাখার জন্য সরকারের বিশেষ বরাদ্দের মেঘা প্রকল্প সাইলোর ব্যবহারে প্রধান সমস্যা হলো টেকসই সড়ক নির্মাণ ও মংলা নদীতে একটি ব্রিজ। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বার বার অনুরোধের পরও সড়কটি পুনঃ নির্মাণের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এখানে ম্যাদার ভ্যাসেল থেকে কার্গো বা লাইটারে দ্রুত গতিতে গম খালাস করা হলেও সাইলোর কারিগরি ত্রুটির কারণে লোডিংয়ে ধীরগতি চলছে।

তিনি আরো জানান, অত্যাধুনিক এ সাইলোর প্রযুক্তি অনুযায়ী চব্বিশ ঘন্টায় দুই হাজার মেট্রিক টন গম লোডিং করার কথা থাকলেও তা পেরে উঠছে না কর্তৃপক্ষ। গম নিয়ে একাধিক লাইটার সাইলো জেটির লোডিং পয়েন্টে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকে কিন্তু গম লোডিংয়ের ধীর গতিতে নির্ধারিত সময় খালাস করা সম্ভব হয়না কার্গো বা লাইটার থেকে। আর এ জন্য তিনি সাইলোর কারিগরি ত্রুটি ও দক্ষ জনবল সংকটকে দায়ী করেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে গমবাহী ম্যাদার ভ্যালেস কর্তৃপক্ষ, আমদানিকারক, শিপিং এজেন্ট ও স্টীভিডর্স এবং লাইটার কর্তৃপক্ষকে মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতি গুণতে হবে। তবে, সাইলো’র অন্য বিভাগের প্রকৌশলী রাকেশ বিশ্বাস জানান, সাইলো’র লোডিং পয়েন্টে যথা নিয়মে কাজ চলছে। কোন প্রকার ত্রুটি থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি আউটডোর বিভাগে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে তারা শুধু আমদানিকৃত গমের গুণগতমান পরীক্ষা করেই জাহাজ থেকে খালাস ও লোডিংয়ের অনুমতি প্রদান করছেন কিন্তু সাইলোর অভ্যন্তরের ত্রুটিসহ অন্য কোন বিষয়ে অবগত নয় বলে জানান তিনি।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক জানান, মংলার পশুর নদীর তীরে জয়মনিতে ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাইলোটি (খাদ্য গুদাম) নির্মাণ করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশনা মোতাবেক গম আমদানি, খালাস, মজুদ ও বিতরণ প্রক্রিয়াজাত করা হবে বলে ৫শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হয়। এ সাইলোটি দুর্যোগকালীন এবং এ অঞ্চলের মানুষের সুবিধার্থে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চাহিদা পূরণের নিশ্চিত করার লক্ষে সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় নির্মাণ করে। ২০১৬ সাল থেকে খাদ্য মজুদ শুরুর পর এখানে নৌ-পথে খাদ্য পরিবহনের ব্যবস্থা থাকলেও কয়েক বছর পেরিয়েছে তবে সড়ক পথে পণ্য অন্যত্র পাঠানো যাচ্ছেনা।পরিবেশ বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার এমপি জানান, জয়মনির ঘোল সাইলোতে সরকারের বিদেশ থেকে আমদানি করা গম নিয়ে ভিড়তে পারছে না বিদেশী জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল)। সাইলো জেটি এলাকায় নাব্যতা সংকটের কারণে গম নিয়ে বহিঃনোঙ্গরে অবস্থান করেই গম খালাস করে তা ছোট ছোট লাইটার বা কার্গোতে করে নিয়ে আসতে হয় এখানে। এ ছাড়া নতুন নির্মিত এ সাইলোর দক্ষ জনবল না থাকা ও কারিগরি সমস্যার কারণে ধীরগতিতে চলছে লোডিং কাজ। কারিগরি ত্রুটির কারণে গম লোডিংয়ে চারটি পয়েন্টের দুইটি নাম মাত্র সচল থাকলেও অপর দু’টি অচল হয়ে পড়ে আছে। এ অবস্থায় সাইলো উদ্বোধনের পর গম নিয়ে আসা জাহাজ গুলো খালাস কাজে বিড়ম্বনায় পড়ে। এতে জাহাজ কর্তৃপক্ষ, শিপিং এজেন্ট, স্টীভিডরসসহ সংশ্লিষ্টরা মোটা অংকের টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। এখানে বড় সমস্যা হলো সাইলো সংলগ্ন রাস্তা ও মংলা নদীতে ব্রিজ নির্মাণ। সাইলো প্রকল্পে রাস্তা নির্মাণের অর্থ বরাদ্দ থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হয়নি রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণে। তবে নদীতে ব্রিজ ও রাস্তা নির্মাণে নতুন সরকারের শুরুতেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এমনটি জানালেন স্থানীয় সংসদ সদস্য উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার।

উল্লেখ্য, এ সাইলোকে কেন্দ্র করে ১২৫ মিটার এক্সেজ ব্রিজের সাথে ২৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। যা দিয়ে দেশের ১৯ জেলার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও মংলার এ গুদাম থেকে খাদ্য সরবরাহ করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা দক্ষিণাঞ্চলবাসীর।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত