প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা উদ্বেগজনক : টিআইবি

স্বপ্না চক্রবর্তী : বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০১৮ অনুযায়ী ২০১৭ সালের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১৩তম স্থানে। ফলে অবস্থানের চার ধাপ অবনতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক গড় স্কোরের তুলনায় বাংলাদেশের ২০১৮ সালের স্কোর যেমন অনেক কম তেমনি গতবারের চেয়ে ২ পয়েন্ট কমে বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে থাকায় দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা উদ্বেগজনক। এই প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

মঙ্গলবার সিপিআই ২০১৮ এর বৈশ্বিক প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানির ধানমন্ডির টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের এই অবস্থান প্রকাশ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০১৮ সালে ০ থেকে ১০০ স্কেলে ২৬ স্কোর পেয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ এই অবস্থানে রয়েছে আর ঊর্দ্ধক্রম অনুযায়ী ১৪৯তম, যা ২০১৭ এর তুলনায় ৬ ধাপ অবনতি। এছাড়া ২০১৭ সালের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমেছে, যেটা আমাদের জন্য বিব্রতকর। একবছরেই দুই পয়েন্ট স্কোর কমে যাওয়াটা উদ্বেগজনক।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ২০১৮ সালের সিপিআই অনুযায়ী ৮৮ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক। ৮৭ স্কোর পেয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড এবং ৮৫ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে ফিনল্যান্ড, সিংগাপুর, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। আর সর্বনিম্ন ১০ স্কোর পেয়ে ২০১৮ সালে তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে সোমালিয়া। ১৩ স্কোর নিয়ে তালিকার সর্বনিম্নের দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে সিরিয়া ও দক্ষিণ সুদান এবং ১৪ স্কোর পেয়ে তালিকার সর্বনিম্নের তৃতীয় দেশ হিসেবে রয়েছে যথাক্রমে ইয়েমেন ও উত্তর কোরিয়া।

২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মত আমরা সর্বনিম্ন অবস্থানে না থাকলেও আমাদের আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমাদের অবস্থান এখনও অত্যন্ত দূর্বল এবং বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত নিচে। অথচ বাংলাদেশের ফলাফল আরো অনেক ভালো হতে পারতো এবং সে অবস্থা বা যোগ্যতাও বাংলাদেশের আছে। যে সমস্ত কারণে আমাদের ফলাফল আরো ভালো হয় নি বলে মনে করি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আমাদের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার বা রাজনৈতিক ঘোষণা থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ হয় না। বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে খুব কম ক্ষেত্রেই তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। আমাদের প্রশাসন ও রাজনীতিতে স্বার্থের দ্বন্দ ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। এছাড়া আমাদের ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতে দুর্নীতির যে বিচারহীনতা, সারাদেশে ভূমি, নদী, জলাশয় দখলের যে প্রবণতা, রাষ্ট্রীয় ক্রয় খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ক্রমবর্ধমান এবং বিব্রতকরভাবে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ পাচার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক যে প্রভাব সেগুলোও আমাদের ভালো স্কোর না হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে পারে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূণ্য সহনশীলতার যে ঘোষণা দিয়েছেন এটি তার রাজনৈতিক সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। এই ঘোষণার কার্যকর ব্যবহার, প্রয়োগ এবং কারো প্রতি ভয় বা করুণা প্রদর্শন না করে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে আশা করছি এই সূচকের উন্নতি হবে।
এসময় বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, ২০১৮ সালের সিপিআই অনুযায়ী বৈশি^ক দুর্নীতি পরিস্থিতি আশংকাজনক। সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের অধিক দেশই ৫০ এর কম স্কোর পেয়েছে। এবারের সিপিআই অনুযায়ী ৬৮ স্কোর এবং ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে ২৫তম অবস্থান নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ভারত, যার স্কোর ৪১ এবং অবস্থান ৭৮। এরপরে শ্রীলংকা ৩৮ স্কোর পেয়ে ৮৯তম অবস্থানে রয়েছে। ৩৩ স্কোর পেয়ে ১১৭ তম অবস্থানে এরপর উঠে এসেছে পাকিস্তান এবং ৩১ স্কোর পেয়ে ১২৪তম অবস্থানে নেমে গিয়েছে মালদ্বীপ। অন্যদিকে, ৩১ স্কোর পেয়ে ১২৪তম অবস্থানে রয়েছে নেপাল। এরপর ২৬ স্কোর নিয়ে ১৪৯তম অবস্থানে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের পরে ১৬ স্কোর পেয়ে ১৭২তম অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। অর্থাৎ নিম্নক্রম অনুসারে আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। সিপিআই সূচক অনুয়ায়ী ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ষষ্ঠবারের মত এবারও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০০৯, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৫ সালের সিপিআই-এও নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৩তম অবস্থানে ছিল।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র উপদেষ্টা, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান এবং আউটরিট অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মন্জুর-ই-আলম।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত