প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইসলামী ব্যাংকে শিল্পঋণে বড় প্রতারণা

যুগান্তরঃ শিল্প খাতে ঋণের বিপরীতে সুদ আদায়ের নামে গ্রাহকদের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা করছে ইসলামী ব্যাংক। বেসরকারি এ ব্যাংকটি শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বিপরীতে ৯ শতাংশ হারে সুদ নিচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন দাখিল করছে।

কিন্তু বাস্তবে তারা ৯ শতাংশ সুদে শিল্প খাতে কোনো ঋণ দিচ্ছে না। উল্টো ঋণের বিপরীতে ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ সুদ আদায় করছে। আর অন্য খাতে ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকটি ৯ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে। এক্ষেত্রেও বাস্তবে সাড়ে ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। ঘোষিত সুদের হারের চেয়ে বেশি সুদ নেয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য নিতে সোমবার ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহবুব উল আলমের সেলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে এ সেলফোন নম্বরে এসএমএস (খুদেবার্তা) পাঠিয়ে তার মন্তব্য চাওয়া হয়। কিন্তু রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।

তবে ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া বলেন, ‘বাস্তব অবস্থা সবাই জানে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী কয়েকজন গ্রাহক ও বিশ্লষক বলেন, ইসলামের কথা বলে ইসলামী ব্যাংক ব্যাংকিং ব্যবস্যা করছে। অথচ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কথা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল নেই। এটা শুধু গ্রাহকদের সঙ্গে বড় প্রতারণা নয়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করারও শামিল। এটি তদন্তের দাবি রাখে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তারা।

গত বছরের বাজেট ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ। পরে তিনি সুদের হার কমানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেন।

এ লক্ষ্যে ২০ জুন এক বৈঠক থেকে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১ জুলাই থেকে ঋণের সুদ হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ এবং ৬ মাস মেয়াদি আমানতের সুদ হবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। একই ঘোষণা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও দিয়েছে। এটি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় গত বছরের ২ আগস্ট আবার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বৈঠক ডাকেন।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষের ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব, সব ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং এমডির উপস্থিতিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আজ প্রধানমন্ত্রী আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এটা ৯ আগস্ট থেকে সব ব্যাংককে কার্যকর করতে হবে।

ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী কয়েকটি ব্যাংক সুদের হার কমালেও ইসলামী ব্যাংকসহ বেসরকারি খাতের অনেক ব্যাংক তা কমায়নি। এদিকে জানুয়ারি থেকে ঋণের সুদের হার আবার বাড়াতে শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কোনো তোয়াক্কাই করছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সুদের হারের বিষয়ে আমরা একবার তদন্ত করেছি। প্রয়োজন হলে আরেকবার করব। হয় তো ব্যাংক তার পছন্দের গ্রাহককে ৯ শতাংশে ঋণ দিচ্ছে। তবুও আমরা তথ্যগুলো যাচাই করে দেখব।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে শিল্পায়ন করতে হলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমাতে হবে। বিশেষ করে শিল্প ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে না আনলে দেশে শিল্পায়ন হবে না। তখন প্রধানমন্ত্রীর যে লক্ষ্য শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব নিরসন সেটি হবে না। এ কারণে ব্যবসায়ীরা শিল্প ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার দাবি করেছেন জোরেশোরে।

নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংককে ঋণের সুদের হারের মাসিক প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি প্রকাশ করে। প্রতিটি ব্যাংককেও তাদের সুদের হার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক একসঙ্গে সব খাতের ঋণের সুদের হার প্রকাশ করছে না। তবে আলাদা প্রকল্পভিত্তিক সুদের হার প্রকাশ করছে। এ কারণে তাদের ঋণের সুদের হার একনজরে দেখার সুযোগ নেই।

ইসলামী ব্যাংক ঋণকে বিনিয়োগ বলে। আর তারা বিনিয়োগের বিপরীতে যে সুদ আদায় করে সেটিকে মুনাফা বলে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইসলামী ব্যাংকের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কৃষি ঋণে তারা ৪ থেকে ৯ শতাংশ সুদ নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ইসলামী ব্যাংক কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে সাড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদ নিচ্ছে। এছাড়া মসলা চাষ, কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে তারা ৪ থেকে ৯ শতাংশ সুদ নিচ্ছে। বড় ও মাঝারি শিল্প খাতে তারা ৯ শতাংশ সুদ নিচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তারা এ খাতে সুদ নিচ্ছে ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ।

স্মল ইন্ডাস্ট্রিজে তারা ৯ শতাংশ হারে সুদ নেয়ার কথা বলেছে। কিন্তু এ খাতে নিচ্ছে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংককে ইসলামী ব্যাংক জানিয়েছে তারা হাউজিং লোন দিচ্ছে সাড়ে ১৪ শতাংশ সুদে। কিন্তু বাস্তবে এ খাতে নিচ্ছে ১৬ শতাংশ। বাণিজ্যিক ঋণে তারা ৯ শতাংশ সুদের কথা বললেও বাস্তবে নিচ্ছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। এছাড়া ক্ষুদ্রশিল্প, নারী উদ্যোক্তা, পরিবহন, মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ, প্রবাসী উদ্যোক্তা খাতে ঘোষিত হারের চেয়ে বেশি সুদ নিচ্ছে। এগুলোতে ব্যাংকটির সুদ ১২ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ।

জানতে চাইলে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান বলেন, যদি এমনটি হয়ে থাকে তবে তা হবে জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের খতিয়ে দেখা উচিত।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে ইসলামী ব্যাংক ছোট, বড় এবং মাঝারি শিল্পে মেয়াদি ঋণে সুদ কেটেছে ৯ শতাংশ। একইভাবে ছোট, বড় এবং মাঝারি শিল্পের চলতি মূলধন ঋণেও সুদ কেটেছে ৯ শতাংশ এবং বাণিজ্য ঋণেও কেটেছে ৯ শতাংশ সুদ। ব্যাংকটির উল্লিখিত সুদের এ হার গত বছরের জুন থেকে শুরু হয়েছে। তবে কয়েকজন বড় শিল্পপতির অভিযোগ, শুধু জুন-নভেম্বর নয়, এখন পর্যন্ত ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ সুদ কাটছে শিল্প ঋণে। এক শতাংশও কমায়নি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে সুদ হারের যে তথ্য দিয়েছে ব্যাংকটি, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, বেসরকারি আরও কয়েকটি ব্যাংক এভাবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। বলা চলে এসব বেসরকারি ব্যাংকে সুদের হার নিয়ে এক ধরনের অরাজকতা চলছে।

ইসলামী ব্যাংকের একজন গ্রাহক জানান, গত বছরের মাঝামাঝিতে অনেক ব্যাংক সুদের হার কমালেও ইসলামী ব্যাংক কমায়নি। তারা বেশি সুদ আদায় করে বছর শেষে সর্বোচ্চ মুনাফার স্বীকৃতি পাচ্ছে। এটা দেশের শিল্প খাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এনআরবি গ্লোবালসহ বেশ কিছু ব্যাংক নভেম্বরে এক প্রতিবেদনে আমানতে ৬ শতাংশ এবং ঋণে ৯ শতাংশ সুদ নেয়ার তথ্য দেখিয়েছে। আবার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো একই মাসের অপর এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে আমানতে সুদ ৮ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশ এবং ঋণে কেটেছে ১২ থেকে প্রায় ১৪ শতাংশ সুদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক নভেম্বরে শিল্পঋণে সুদ কেটেছে ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ। একইভাবে ফারমার্স ব্যাংক ১৫ থেকে সাড়ে ১৫ শতাংশ, এবি ব্যাংক ৯ থেকে সাড়ে ১৫ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংক সাড়ে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ সুদ কেটেছে। বেসরকারি অন্যান্য ব্যাংকের চিত্রও প্রায় কাছাকাছি। এছাড়া বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকের বাণিজ্য ঋণে সুদ কেটেছে ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত