প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেল!!!

ডেস্ক রিপোর্ট :  গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয় সহকারী অধ্যাপক ডা. জাবেদকে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিপ্তরের হাসপাতাল শাখার ডিপিএম হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিনেও ওই মেডিকেলে যোগদান করেননি। সরকার দলীয় চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচীপ) ও বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) প্রভাবশালী এই নেতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের হুংকার দিয়ে বলছেন- তিনি কখনোই শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজে যোগ দিবেন না।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয় নিউরোলজীর চিকিৎসক ডা. আব্দুল হাইকে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ডা. আব্দুল হাই বরিশাল মেডিকেলে যোগদান করেননি। স্বাচিপের পরিচয় দানকারী প্রভাবশালী এই চিকিৎসক বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় ইবনে সিনা মেডিকেলে কাজ করছেন।

শুধু ডা. আব্দুল হাই বা ডা. জাবেদই নন; দীর্ঘদিন থেকেই রেওয়াজ হিসেবে চালু আছে চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরের জেলায় থাকা সম্ভব নয়। আর সেটা যদিও হয় ক্ষমতাসীন দলের চিকিৎসকদের সংগঠনের কেউ, তাহলেতো কথাই নেই।

এদিকে অনেক সময় বাধ্য হয়ে ঢাকার বাাইরে থাকলেও অধিকাংশ চিকিৎসকই কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। তারা ঢাকাতে অবস্থান করে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে নিজস্ব চেম্বারে বড় অঙ্কের ‘ফি’ নিয়ে প্রেসক্রিপশনে বিভিন্ন ধরনের টেস্ট ও ওষুধ লিখে চিকিৎসা বাণিজ্য করছেন। আবার অনেক চিকিৎসক আছেন যারা সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করছেন। যদিও অনেক দক্ষ চিকিৎসক সরকার দলীয় চিকিৎসকদের যাতাকলে পড়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মত বিনিময়ের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় চিকিৎসক-নার্সদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই ক্ষোভ এবারই প্রথম নয়, এর আগেও তিনি বিভিন্ন সময়ে একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দেন, কর্মস্থলে না থাকলে এবং সেবা না দিলে চিকিৎসক ও নার্সদের ওএসডি করা হবে। প্রয়োজনে তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। একই সঙ্গে বদলি করা চিকিৎসক যদি কাজে যোগ না দেয়, তবে ওএসডি করে তাদের সরিয়ে দেওয়ারও কথা বলেছেন। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দায়িত্ব নিয়েও জেলা-উপজেলা চিকিৎসকদের রাখতে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলেছেন। সরকারের দিকে থেকে বিভিন্ন সময় এ নিয়ে কঠোর বার্তা দেয়া হলেও তাতে দৃশ্যমান কোন লাভ এখনো পর্যন্ত হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক স্বীকার করেছেন যে তাদের অনেক সহকর্মী বদলি ঠেকানোর জন্য রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন।

যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সেই দলের কারসাজি চলে সর্বত্র। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এর কথাই ধরুন, আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় এখন স্বাস্থ্য খাতের ভাগ্যবিধাতা তারাই। গত ১০ বছরে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পরে দেশের স্বাস্থ্য খাত। তবে গত ৫ বছরে তা ভয়াবহ রুপ ধারণ করে। সদ্য বিদায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ দায় এড়াতে পারেন না। প্রায়শই বক্তব্যে ন্যায়ের কথা বললেও তিনি স্বাস্থ্য খাতের প্রত্যেকটি স্থানে দলীয় লেজুড়বৃত্তি করেছেন। একই সঙ্গে তার দুই ছেলে ও স্ত্রীকে দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, দরপত্রের কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ চিকিৎসাখাত নিয়ে এক ধরণের বাণিজ্যে মেতে উঠেছিলেন। এক্ষেত্রে যোগ্য-অযোগ্য, ন্যয়-অন্যায় দেখেননি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এই নেতা। আর তাই প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগও বারবার ভেস্তে গেছে। যদিও ওই সময়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাহিদ মালেক বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও মোহাম্মদ নাসিমের প্রভাবে স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেননি।

রোগীদের সেবা দেয়া ডাক্তারদের পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য। অথচ অনেক ডাক্তারেরই এই দায়িত্ব-কর্তব্যে মনোযোগ নেই। এমনকি চিকিৎসক-নার্সদের দায়িত্ব ভালোভাবে পালনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরদিনই, গতকাল দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দেখা গেছে সেই পুরনো চিত্রই।

সুত্র মতে, সকাল ৯টার মধ্যে চিকিৎসকদের উপস্থিত থাকার কথা সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে। এখানে ১৩ জন চিকিৎসকের বদলে পাওয়া যায় মাত্র ৩ জনকে। চৌহালি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকাল ১০ টা পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র একজন চিকিৎসককে। কামারখন্দেও ৯ জনের পরিবর্তে ছিলেন মাত্র ২ জন। খাবার সরবরাহ ও ওষুধ সংকটের অভিযোগও করছেন রোগী ও স্বজনরা। নওগাঁর বদলগাছি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হননি চিকিৎসকরা। ৩ জন দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও আছেন ২ জন।

বরিশালে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। সকাল থেকে রোগীর দীর্ঘলাইন থাকলেও চিকিৎসকরা দেরিতে আসেন কর্মস্থলে।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে রয়েছেন ৫ জন, দাবি কর্তৃপক্ষের। তবে সকালে ৩ জনকে পাওয়া যায়। নেই আবাসিক চিকিৎসকও।

গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা সেবা নিয়ে যারা আন্দোলন করেন তাদের অভিযোগ হচ্ছে, বড় শহরগুলোর বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ কম থাকায় চিকিৎসকরা সেদিকে যেতে অনাগ্রহী।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি মনে করেন, ভালো আবাসন এবং সন্তানদের শিক্ষার কথা বলে অনেক ডাক্তার ‘অজুহাত’ তুলে ধরছেন। ডা. চৌধুরী বলেন, ঢাকা নগরী ডাক্তারদের যানজটে পরিনত হয়েছে। অন্য সরকারী অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ঢাকার বাইরে কাজ করতে পারেন তাহলে ডাক্তাররা পারবেন না কেন? তিনি বলেন, সে জন্য একটি সুনির্দ্দিষ্ট পদ্ধতি গড়ে তোলা দরকার যাতে একটি নির্দ্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ডাক্তারা গ্রামীণ এলাকায় কাজ করতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. মোহাম্মদ এহতেশামুল হক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সিভিল সার্জনদের অবহেলার কারণেই চিকিৎসকরা গ্রামে যাচ্ছেন না। তিনি বলেন, বিএমএ’র বিরুদ্ধে অভিযোগ অবান্তর। স্বাস্থ্য সেবা মানুষের নাগালে পৌঁছানোর জন্য আমরা সবসময় কাজ করে যাচ্ছি। যাদের দায়িত্ব পালন করার কথা তারা পালন না করে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। শহরের সুযোগ-সুবিধা গ্রামে না থাকার কারণে গ্রামে যেতে চায় না চিকিৎসকরা। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, গ্রাম হবে শহর। এটা বাস্তবায়ন হলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

সূত্র মতে, যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যায়, সেই দলই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাগ্যবিধাতা। স্বাচিপ ও বিএমএ’র ব্যনারে চলে তাদের সকল কর্মকান্ড। আর সেই সুযোগে ডাক্তাররা তাদের ইচ্ছেমাফিক সবকিছু পরিচালনা করেন। প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন রাজধানীতে অবস্থান করা থেকে শুরু করে নানা ধরনের অনিয়মে চিকিৎসকরা জড়িয়ে পড়ছেন। যদিও চিকিৎসকদের রাজনীতির মারাত্মক প্রভাবে প্রায়শই সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য, রোগী ভর্তি, চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা, নিয়োগ, বদলি-পদোন্নতি অনেককিছুতেই রাজনীতি সরকারি হাসপাতালে। এই রাজনীতি এমন পর্যায়ে গেছে যে, মাঝেমধ্যেই ডাক্তার-কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি পর্যন্ত করছেন। ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজন। তবে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে সরকারি দলের ডাক্তারদের মধ্যে। বিরোধী দলের ডাক্তাররা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সরকারি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে হাসপাতালগুলোতে। বিএনপির শাসনামলে এই কালচার ছিল ছাত্রদল করা ডাক্তারদের মধ্যে। রাজনীতির সাথে জড়িত ডাক্তাররা রোগী এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে প্রায়শই দুর্ব্যবহারও করেন।

ক্ষমতার দাপটে গ্রামের হাসপাতাগুলোতেও দিনের পর দিন চরম ডাক্তার সংকট থাকছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে গ্রামীণ চিকিৎসাব্যবস্থা। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে সেখানকার রোগীদের। গ্রামের হাসপাতালে শহর থেকে বদলি করলেই অনেক ডাক্তার স্বাচিপের প্রভাব খাটিয়ে বদলি ঠেকান অথবা মাসের পর মাস শহরে থাকেন আর বেতন নেন গ্রামের ওই হাসপাতাল থেকে। ফলে ছোটোখাটো অপারেশন হলেই ডাক্তার পান না রোগীরা। চলে আসতে হচ্ছে শহরের বড়ো হাসপাতালে। এতে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, তেমনি পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।

স্বাচিপের মহাসচিব প্রফেসর ডা. এমএ আজিজ বলেন, স্বাচিপের ডাক্তারদের কারণে হাসপাতালের রোগীদের ভোগান্তি বা ক্ষতি হচ্ছে না। বরং তারা নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা দিয়ে রোগীদের সুস্থ করার পাশাপাশি রোগীদের কল্যাণের কথাই সবসময় চিন্তা করেন।

ডাক্তারদের নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)-এর রেজিস্ট্রার ডা. জাহেদুল হক বসুনিয়া বলেন, রোগীদের ক্ষতি হয় এমন যে কোনো অপরাধের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে তারা সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।#  ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত